ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রথমদিনের উপসংহার: পারস্পরিক সহযোগিতার ২২ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই এবং সাত প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপন।
দু’ দেশের প্রধানমন্ত্রীই বলেছেন, সহযোগিতার নতুন হাতছানি দু’ দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তাদের আশাবাদে দূরের অনেক যোগ-বিয়োগ থাকলেও সীমান্ত সমস্যার সমাধান করে এরইমধ্যে ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
দিনশেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, আমরা শুধু একটি সীমান্ত সমস্যারই সমাধান করি নি। বছরের পর বছর ঝুলে থাকা একটি সমস্যার প্রায়োগিক সমাধানে নতুন ইতিহাসও রচিত হয়েছে।
আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একে উল্লেখ করেছেন, একটি মানবিক সমস্যার মানবিক সমাধানে। তবে এজন্য তিনি দিল্লীর মসনদে আসীন নরেন্দ্র মোদির পূর্বসূরীদের কথাও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন।
বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৪ সালে যে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়ে চুক্তি করেছিলেন, ৬৮ বছর পর ছিটমহলের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে ঢাকায় তার উপসংহার টানলেন মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা এবং ইন্দিরা গান্ধীর পরিবার ও দলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদি।
সীমান্ত সমস্যা সমাধানের চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দু’ দেশের মধ্যে প্রটোকল সই ও বিনিময় প্রত্যক্ষ করে আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে মোদি বলেছেন, শুধু যে একটি সীমান্ত সমস্যারই সমাধান হলো এমন নয়; আমরা আমাদের সীমান্তকে আরো বেশি নিরাপদ করলাম, আমাদের জনগণের জীবন আরো বেশি স্থিতিশীলও করলাম।
তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টনেও আশ্বাসের কথা শুনিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। বলেছেন, রাজ্য সরকারগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশের সঙ্গে পানি বণ্টনে উদ্যোগী ভূমিকা নেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।
যে মমতা ব্যানার্জীর আপত্তির কারণে শেষ মুহূর্তে এসে মোদির পূর্বসূরী ড. মনমোহন সিং তিস্তা চুক্তি সই করতে পারেন নি, পশ্চিমবঙ্গের সেই মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন ‘সামনে তাকানো’ নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। এমনকি শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্ত বৈঠকের আগে মমতার সঙ্গে ১০ মিনিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান মোদি।
দু’ প্রধানমন্ত্রী যখন দুটি বাস সার্ভিসের উদ্বোধনের সময় সবুজ পতাকা উড়ান, মমতাও যোগ দেন আরেকটি সবুজ পতাকা হাতে যার সঙ্গে দিল্লীর কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক টানাপোড়েন থাকলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আছে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।
শুধু বাস সার্ভিসেই যে মোদি সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন তাই নয়, জাতীয় স্মৃতিসৌধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সফর শুরু করে বাংলাদেশের জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা মোদি বর্তমান সরকারের ভিশন-২০২১ এবং ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়সে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন।
এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ও যৌথ বৈঠক শেষে বাণিজ্য এবং যোগাযোগসহ ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়।
চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে-দ্বি-পক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌ ট্রানজিট প্রটোকল, কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং ঢাকা-শিলং-গোয়াহাটি বাস চলাচল।
সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে- ভারত-বাংলাদেশের কোস্ট গার্ডের সহযোগিতা, মুদ্রা জালিয়াতি প্রতিরোধ সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সার্কের জন্য ভারতের অনুদান, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার, শিক্ষা ও ইকোনোমিক জোন এবং মানবপাচার রোধবিষয়ক সমঝোতা স্মারক।
সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য বাণিজ্য ও যোগাযোগে সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এর অংশ হিসেবে ২০০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে।
তার প্রমাণও তিনি রেখেছেন যেটা ফুটে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ কথায়: প্রধানমন্ত্রী মোদি আমাদের দু’ দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন এবং এ বিষয়ে তার সরকারের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। দু’ দেশের মধ্যে বাণিজ্য সমতা আনার জন্য বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য মংলা এবং ভেড়ামারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমরা সম্মত হয়েছি।
‘আমরা আশা করছি এর ফলে বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে,’ বলেছেন আরো দূরে চোখ রাখা শেখ হাসিনা।
নরেন্দ্র মোদিও মনে করছেন, যে ২২টি চুক্তি সই হয়েছে তার মধ্য দিয়ে নতুন মাত্রা পাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। যে সম্পর্কের শুরু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একটি জাতির জন্মের সময়।







