একটা অদ্ভুত খবর চোখে পড়লো। সেটি হলো, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যে অপরাধ, তা জানে না বনানীতে দুই ছাত্রী ধর্ষণের আসামি সাফাত আহমেদ। তার ভাষ্য, তারা ‘মেয়ে বন্ধুদের’ সঙ্গে প্রায়ই পার্টিতে ‘এমনটা’ করে থাকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে অকপটে দুই তরুণীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কথা স্বীকার করে পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে। জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হিসেবে সাফাত উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করতো। অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তার স্বাভাবিক বলেই মনে হতো।
পুলিশের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, সাফাত ও সাদমানরা এমন পরিবেশে বড় হয়েছে যে, তাদের কাছে ‘ধর্ষণ’ কোনো বড় বিষয় নয়। তাদের অনেক মেয়েবন্ধু রয়েছে এবং তাদের ভাষায় মাঝেমধ্যেই মেয়েবন্ধুদের সঙ্গে তারা ‘আনন্দ-ফূর্তি’ করে।
প্রশ্ন হলো, কী ধরনের সমাজ আমরা নির্মাণ করেছি এই তরুণদের জন্য? কী ধরনের পারিবারিক কাঠামোর ভেতরে তারা বেড়ে উঠেছে? কী ধরনের মূল্যবোধ তারা পরিবার থেকে শিখেছে? সুতরাং সাফাত যে কথা জিজ্ঞাসাবাদে বললো, এই অপরাধে কেবল তার একার নয়, শাস্তি হওয়া উচিত তার অভিভাবকরদেরও, যারা ধর্ষণের মতো একটা গুরুতর অপরাধকেও অপরাধ বলে তাদের সন্তানদের শেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন, যারা তাদের সন্তানকে কোনো ধরনের মূল্যবোধ শেখাননি, যাদের কাছ থেকে তাদের সন্তানরা শিখেছে ‘দুনিয়াটা মস্তবড় খাওদাও ফূর্তি করো’, যারা মনে করে বান্ধবীর সঙ্গে ফূর্তি করা এবং তাদের সম্মতি এমনকি অসম্মতিতেও তাদের সাথে যৌনসম্পর্ক করা অন্যায় নয়।
শুধু সাফাত নয়, এরকম হাজার হাজার তরুণ বেড়ে উঠেছে আমাদের তথাকথিত আধুনিক, ফার্স্ট আর বিলাসবহুল দুনিয়ায়। প্রাচুর্যের ভেতরে বেড়ে ওঠা এইসব বখাটে তরুণ শুধু নিজের কিংবা পরিবারের জন্যই নয়, বরং পুরো দেশের জন্যই ক্ষতিকর এবং হুমকি। গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবল চাপ ছিল বলে সাফাত ও সাদমান ধরা পড়েছে। দ্রুতই বাকি আসামিরাও ধরা পড়বে বলে আশা করা যায়। এরইমধ্যে যেহেতু সাফাত ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে, ফলে আশা করা যায় তার শাস্তিও হবে। কিন্তু এই একজন সাফাত বা সাদমানের বিচারই যথেষ্ট নয়।
আমরা মনে করতে পারি রাজধানীর উত্তরায় বখে যাওয়া তরুণদের গ্যাং কালচারের শিকার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরের কথা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যে কিশোর-তরুণদের এরকম গ্যাং সক্রিয়, তা এরইমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আমরা মনে করতে পারি ফরিদপুরের স্কুলছাত্র ফারদিন হুদা মুগ্ধর কথা, নতুন মোটরসাইকেল না পেয়ে যে তার বাবাকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে।
আমরা স্মরণ করতে পারি, ভোগবিলাশ আর প্রাচুর্যের ভেতরে বেড়ে ওঠা পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের মেয়ে ঐশীর কথা, যে তার বাবা মাকে হত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ড পেয়েছে।
রাজধানীর এজিবি কলোনির বাসিন্দা গণপূর্ত বিভাগের হিসাব সহকারী রুনা আক্তারের কথাও আমরা ভুলিনি, যিনি স্থানীয় কিছু বখাটে যারা মোটারসাইকেল নিয়ে ওই এলাকা বাইকসন্ত্রাস চালাতো, তাদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। এরকম আরও বহু ঘটনা আছে শুধু রাজধানীতেই। এইসব তারুণ্যের বখে যাওয়ার পেছনে প্রথমত রয়েছে তাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন, পারিবারিক শিক্ষা না থাকা, মানুষকে মানুষ ভাবতে না শেখা, অভিভাবকের অবৈধ সম্পদ, মাদকের ছোবল, সঙ্গ দোষ ইত্যাদি।
সুতরাং সাফাতের মতো আরও যেসব ধনীর দুলাল মনে করে ধর্ষণ অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়-তাদের চিহ্নিত করা জরুরি এবং তারও চেয়ে বেশি জরুরি তাদের অভিভাবকদের চিহ্নিত করা। তাদের আয়ের উৎস চিহ্নিত করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারলে সামাজিক চাপে এরকম দুচারজন সাফাতের বিচার হবে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পুরো সমাজ যে একটা বিশাল ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়েছে, সেই ব্যাধি সারবে না।
অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে যাবে, শিক্ষার হার বাড়বে, বেকারত্ব কমবে ঠিকই-সমাজটা মানবিক হয়ে উঠবে না। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি এক বখে যাওয়া প্রজন্মের ভার বইতে হবে আমাদের বাকি জনগোষ্ঠীকে। এই বিপদ থেকে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষকে বাঁচানোর পথ বের করতে হবে এখনই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







