ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত রোববার রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকার ঘটে যাওয়া সেই ধর্ষণের ঘটনায় তিনদিন পর বুধবার সেই ধর্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাবের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে মজনু নামের সেই ধর্ষক ‘সিরিয়াল রেপিস্ট’। এর আগেও সে একাধিক ধর্ষণ করেছে। আগে তার অমানবিক কাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী নারীরা। এবার ঢাবির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর তাকে হয়ত বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী ধর্ষক মজনু ‘সিরিয়াল রেপিস্ট’। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নারীরা তার শিকার হতে থাকলেও তাকে কখনও আইন কিংবা বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। ধারাবাহিক সেই সব অপরাধগুলো তাকে ক্রমে হিংস্র করেছে। প্রতিকারহীন সেই সকল অপরাধ তাকে আরও আগ্রাসী করেছে সন্দেহ নেই। একের পর এক অপরাধ তার মধ্যে বেপরোয়া ভাব এনেছে। ফলে সন্ধ্যা রাতে বিশ্ববিদ্যালয় এক শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে অপহরণ করে ধর্ষণে সাহস জুগিয়েছে। এটা একদিকে যেমন ব্যক্তির নৈতিক স্খলনের চূড়ান্ত রূপ, অন্যদিকে দেশের আইন-আদালত-প্রশাসনের দুর্বল দিক। ধর্ষণের মত অপরাধ যে দেশে ক্রমে প্রতিকারহীন হয়ে ওঠেছে এটা তারও ইঙ্গিত। অন্য অনেক ধর্ষকের মত এই ধর্ষকেরও হয়ত বিচারের ভয় ছিল না। ফলে একের পর এক ধর্ষণ তার মধ্যে কোন ধরনের প্রভাব ফেলেনি। উপরন্তু সাহস জুগিয়েছে আরও অপরাধের।
ভিক্ষুক কিংবা প্রতিবন্ধী নারীরা এমনিতেই সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর। তাদের বিচারের আকুতি সভ্য সমাজে পৌঁছার মত হয়ে ওঠে না। তাদের জন্যে শাহবাগ কিংবা কোনো জেলা শহরেও ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ানোর লোক কমই থাকে। তাদের হাহাকারের বাণীগুলো দৃশ্যমান সভ্যতার দেয়াল ডিঙিয়ে রাষ্ট্রকে বিচারে বাধ্য করার মত অবস্থায় পৌঁছায় না বলে মজনু কিংবা অপরাপর ধর্ষকেরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এইধরনের কোনো ধর্ষণের ঘটনা পুলিশি রেকর্ডে যুক্ত হয় কিনা কে জানে! যদি হয়ও তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্তে আগ্রহ দেখায় না, পুলিশি তদন্ত শেষ না হলে মামলার পথ ধরে আদালতে পৌঁছায় না, মিডিয়ায় স্থান পায় না, কখনও মিডিয়ায় স্থান পেলেও এনিয়ে আন্দোলন হওয়ার মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় না, প্রশাসনের টনক নড়ে না, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে না, মন্ত্রী পরিষদের কোন সদস্য আক্রান্তের বাড়িতে গিয়ে সহানুভূতি দেখিয়ে আসেন না, প্রতিবাদে জনমানস জেগে ওঠে না, আলোচনা হয় না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ফল্গুধারা বয় না, এই আমরাও বিভিন্ন জায়গায় লেখালেখি করি না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গুরুত্বও দেই না। এটা মূলত সামাজিক শ্রেণিবিভাজনের যে সূত্র তার বিকাশ, তার প্রভাব; অস্বীকার করলেও এটাই বাস্তবতা।
এসব কারণে সমাজের এথায়-সেথায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সকল ধর্ষক আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ধর্ষণের শিকার নারীরা ব্যক্তি পর্যায়ে ও সামাজিক ভাবে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একবার ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর বারবার ধর্ষণের মত পরিস্থিতির মুখে পড়তে চায় না, কেউবা আবার বিচার পাবে না এ বিশ্বাসে বুকে পাথর বেঁধে মুখ বুজে সহ্য করে যায়। আর এতে করে ধর্ষক সমাজের বিস্তৃতি ঘটছে। এক শিকারের পর আরেক শিকারের নেশায় মত্ত হয়ে পড়ছে অনেকেই। এতে করে প্রতিকারহীন ধর্ষকামী একটা জনগোষ্ঠীর বিস্তার ঘটছে। এই ধর্ষক সমাজ আইন-আদালতকে পরোয়া করেনা। যা কিনা সভ্য সমাজের সভ্যতা পরিপন্থী, যদিও সভ্য সমাজের বাসিন্দাদের অনেকেই আবার নিজেরাই একেকজন ধর্ষক যারা জানে যত ধর্ষণ হয় তার বিচার হয় সামান্যই। বাকিগুলো বিচারিক আদালত পর্যন্তও পৌঁছায় না।
ধর্ষণ বিষয়টি প্রতিকারহীন বলা যায় মূলত সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধর্ষণের পরিসংখ্যানের আলোকে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও নারীআন্দোলন কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বিচারহীনতা ধর্ষণের কারণ। তারা বলছেন, ধর্ষণের বিচার না হওয়ার কারণে দেশে পাশবিকতা দিন দিন বাড়ছে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে এই ধরনের অপরাধ বাড়ছে। বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষের এক কেইস স্টাডি থেকে জানা যায়- ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা, ঝিনাইদহ, জামালপুর, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ ও নোয়াখালী জেলায় ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৪৩৭২টি। অথচ এসব মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র ৫ জনের। আর সারাদেশে এমন কয়েক লক্ষ মামলা নিষ্পত্তিহীন রয়ে গেছে। অথচ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে করতে হবে, কিন্তু এই মামলাগুলো নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হলে, অথবা আরও দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি হলে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বাড়ত না। দুর্বৃত্তরা নারীর প্রতি এমন পাশবিক নির্যাতনে প্রবৃত্ত হত না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচারগুলো সম্পন্ন না হওয়ার কারণে ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলার বিচার আইনে নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হাই কোর্ট সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, আইনসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে বলা হয়েছে। তারপরেও এনিয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। চাঞ্চল্যকর কিছু ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার বিচার বিচারিক আদালতে সম্পন্ন হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে থমকে আছে। ফলে এই ধরনের অপরাধ করলে যে শাস্তি পেতেই হবে এমন ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সাম্প্রতিক ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রীকে নির্যাতনের ঘটনায় বিচারিক আদালতে ১৬ আসামির ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ছাড়া আর কোনো সুখবর নেই। আছে উদ্বেগের কিছু চিত্র যা মূলত ধর্ষণের পরিসংখ্যানগত দিক। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হন ৭৩২ জন নারী। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১৪১৩ জনে গিয়ে পৌঁছেছে। এর বাইরে আছে নারীকে উত্যক্তের ঘটনা, যৌন হয়রানি, নির্যাতন, অপহরণ। বেসরকারি সংস্থাগুলো মূলত এইধরনের তথ্য সংগ্রহ করে থাকে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কিন্তু প্রকাশিত প্রতিবেদনের বাইরে আরও অনেক ঘটনা আলোর মুখ দেখে না, কোথাও লিপিবদ্ধ হয় না বলে সভ্য সমাজের সভ্য পরিসংখ্যানেও উঠে আসে না। কুর্মিটোলার ধর্ষক মজনুর ভিক্ষুক-প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতিও পাশবিকতার সেই ঘটনাগুলোও প্রতিবেদনের বাইরে নিশ্চিতভাবেই।
কুর্মিটোলার ধর্ষক মজনুকে র্যা ব সংবাদ সম্মেলনে হাজির করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের একটা হাওয়া বইছে। অনেকেই চেহারা দেখে ধর্ষককে ধর্ষক হিসেবে মানতে নারাজ। বিষয়টি বিস্ময়কর! সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেছেন: ‘মজনু একজন বিকৃত মানসিকতার লোক। তাকে শনাক্ত করেছেন ধর্ষণের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মেয়েটির সঙ্গে আমি কয়েকবার কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, আমি দুনিয়া সমস্ত মানুষের চেহারা ভুলব। কিন্তু এর চেহারা ভুলব না।’ র্যাব যখন বলছে আক্রান্ত নারী ধর্ষককে সনাক্ত করছেন তখন ধর্ষকের চেহারা নিয়ে অবিশ্বাসের কিছু আছে বলে মনে হয় না। এখানে ভিক্টিম নারীর প্রকাশ্যে আসার সুযোগ কম বলে র্যাবের কথাকে তাই বিশ্বাস করতে হচ্ছে।
ধর্ষক চেহারা ‘নায়কোচিত’ নয় বলে যারা হতাশ হচ্ছেন তাদের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন নাই, তারা যুক্তিহীন পৃথিবীর বাসিন্দা। তাদের বোঝানোর ক্ষমতা কারও নাই। তাদের বুঝানো যাবে না যে, ধর্ষণ চেহারা দিয়ে হয় না, ধর্ষণের কারণ মানসিক বিকৃতি। আর এই বিকৃতির প্রকাশ যেকোনো চেহারার মানুষের দ্বারাই সম্ভব। কুর্মিটোলার ধর্ষক মজনুর চেহারা ভালো নয়, তার শারীরিক শক্তি কম মনে হলেও ধর্ষণ-প্রবৃত্তি তার মধ্যে থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
এখানে ভাঙা চেহারা, লিকলিকে দৈহিক গঠন মুখ্য নয়; মুখ্য তার মানসিক বিকৃতি। তাই আক্রান্ত শিক্ষার্থীর শনাক্ত করার খবর র্যাব কর্মকর্তার মুখ থেকে শুনেও স্রেফ চেহারা দেখে এখানে সন্দেহ প্রকাশ করা ঠিক হবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








