বরেণ্য সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রাণনাশের উদ্দেশে পরিচালিত হামলাও ধর্মের নামে পরিচালিত হয়েছে। প্রকাশ্যে, লোক সমাগম আছে এমন স্থানে হামলায় প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি। তাঁর মাথায়, পিঠ, কাঁধ উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে বিক্ষত হয়েছে। অন্তত ১৬টি সেলাই পড়েছে ওসব জায়গায়। ধর্মীয় দুষ্কৃতিকারীদের একজন সাথে সাথে আটক হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের হাতে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রাণনাশের হুমকিতে থাকা জাফর ইকবাল আক্রান্ত হলেন সেখানে যেখানে তিনি জীবনের সোনালী সময়টার অধিকাংশই ব্যয় করছেন শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে ব্যক্তিগত কোন লাভালাভের আশা না করেই। মার্কিনী চাকুরীর প্রস্তাব গ্রহণ না করে দেশে ফিরে এসেছিলেন তিনি। কেবল দেশে ফেরাই না এমন এক জায়গাকে নিজের কর্মক্ষেত্র করেছিলেন যা ছিল রাজধানীর বাইরে এক মফস্বল শহরেরও বাইরে। চাকুরী জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন এই সিলেটে, উদ্দেশ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে প্রান্তিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই আছেন তিনি। তাঁর কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশসেরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর শিক্ষার্থীরা নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে, কুড়াচ্ছে। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন তিনি থাকেন সিলেটে, বাকি দুই দিন রাজধানীতে পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাত সহ অন্যান্য কাজে যান। এই বয়সে এমন ভ্রমণ বিষয়ক কষ্টকেও তিনি সহ্য করে যাচ্ছেন কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দরদের কারণে। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, আততায়ীর ছুরির আঘাতে। প্রাণও যেতে বসেছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই।
অন্ধকার জগতের অন্ধ বিশ্বাসধারী আততায়ী যখন তাঁর প্রাণনাশ করতে একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছিল তখনও তিনি ওই মানুষরূপী হায়েনাকে মানুষ ভাবতে চেয়েছেন। বুঝতে পারছেন তাঁর প্রাণ হরণের উদ্দেশ্যে এই হামলা তবু তিনি মাটিতে পড়ে গিয়েও বলছিলেন ‘ছেলেটা কোথায়’। জানতেন তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীরা খুনে উদ্যত হায়েনাকে ছেড়ে দেবে না, তাই সবার উদ্দেশে বলছিলেন, “ওকে তোমরা মারধর করো না”। আক্রমণের শিকার হওয়া যে কারও পক্ষে এমন কথা বলাটা অবিশ্বাস্য, কিন্তু জাফর ইকবাল সেটাই করেছিলেন, কারণ তাঁর লেখালেখির সাদাসিধে ভাষার মত নিজেই সাদাসিধে; সাধারণ হয়েও আদতে অসাধারণ!
জাফর ইকবাল ইসলামিস্ট জঙ্গি ও ধর্মান্ধদের পরিস্কার শত্রু। সিলেটের রাস্তায় একাধিকবার জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে নেমেছে ইসলামিস্ট জঙ্গি ও মৌলবাদীরা। তাঁকে নাস্তিক, মুরতাদ আখ্যা দিয়ে সিলেট ছাড়া করারও হুমকি দিয়েছে। কেবল ইসলামিস্ট জঙ্গিরাই নয় বিএনপি-আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামি, হেফাজতে ইসলাম, বামপন্থী দলের কিছু অংশ, ছাত্রলীগ, সচেতন সিলেটবাসী, সিলেট-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী কয়েস সহ অনেকের তাঁর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল। আওয়ামী লীগের এমপি মাহমুদুস সামাদ চৌধুরী কয়েস তো জাফর ইকবালকে প্রকাশ্যে ‘দোররা মারার’ ঘোষণাও দিয়েছিলেন। টাকা দিয়ে লোক জড়ো করে সিলেটে মিছিল-সমাবেশও করিয়েছিলেন। হেফাজতে ইসলাম জঙ্গি মিছিলও করেছে।

জাফর ইকবালকে ‘ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া নতুন কিছু নয়। একাধিকবার তাঁকে এমন আখ্যা দিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে। উপর্যুপরি হুমকির কারণে তাঁকে পুলিশ প্রহরা নিয়ে চলাফেরা করতে হত। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও তাঁর সঙ্গে পুলিশ থাকত। এত পুলিশ প্রহরার পরেও তাঁর ওপর হামলা করতে পেরেছে ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা। হামলায় অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। এই হামলা কি পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণ করে না?
হামলার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হওয়া কিছু আলোকচিত্রে দেখা যায়, হামলাকারী দীর্ঘ সময় তাঁকে অনুসরণ করছিল। এমনকি যে অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে হামলার ঘটনা ঘটে সে অনুষ্ঠানের সময়ে জাফর ইকবালের ঠিক পেছনে দণ্ডায়মান ছিল ধৃত হামলাকারী। আরও কিছু আলোকচিত্রে দেখা যায়, জাফর ইকবালের সাথে পুলিশ না থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থান করছিল। হতে পারে, তিনি হয়ত চাইছিলেন না অনুষ্ঠানের সময়ে ঠিক পেছনে পুলিশ থাকুক। তাঁর সাদামাটা জীবনযাপনের দিক খেয়াল করলে এটা হয়ত স্বাভাবিক, কিন্তু ফেরার পথে ঠিক পেছন থেকে হামলার ঘটনা যখন ঘটল তখন পুলিশের কি কিছু করার ছিল না?
হামলার পরে জানা গেছে এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন ওই সময়ে। ঘটনা সত্য হতে পারে। তবে হামলাকে পুলিশ প্রশাসন প্রতিরোধ করতে পারেনি এটাই বাস্তবতা। এবং নিশ্চিতভাবেই এটা দায়িত্বে অবহেলা পুলিশের, কারণ তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল তারা। পুলিশ পারেনি জাফর ইকবালের নিরাপত্তা দিতে। তাদের দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নিয়েছে হামলাকারী। পুলিশের এই দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টিকে ছোট ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
জাফর ইকবালের ওপর হামলার পর ধৃত হামলাকারী জানিয়েছে ধর্মের কারণেই হামলা করেছে সে। ধর্মের নামে এই হামলা ও প্রাণনাশের চেষ্টা, প্রাণনাশ বাংলাদেশের জন্যে নতুন কিছু নয়। এরআগে একাধিক প্রগতিশীল লেখক, ব্যক্তিত্ব এর শিকার হয়েছেন। লম্বা তালিকা উপস্থাপন না করে কেবল কয়েকজনের কথাই বলি- হুমায়ুন আজাদকে হত্যাচেষ্টা, অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয় দাশ সহ প্রগতিশীল অনেক শিক্ষক, লেখক, ব্লগার, এক্টিভিস্ট ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের চাপাতি ও ছুরির আঘাতে নিহত হয়েছেন।
এই হামলাকারীদের অধিকাংশই ছিল মাদরাসার ছাত্র, একইভাবে ইসলামিস্ট সন্ত্রাসী। জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারীও নিজেকে মাদরাসার ছাত্র বলে পরিচয় দিত। তাঁর বাবাও একজন মাদরাসা শিক্ষক। মাদরাসায় শিক্ষা নেওয়া এসব সন্ত্রাসী একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটালেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাদরাসা ঠিকই পরম আতিথেয়তায় গ্রহণীয়। শিক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ সরকারের অনেকেই প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন ‘মাদরাসা থেকে কোন জঙ্গি বের হয় না’। অবাক লাগে, এত এত জঙ্গি, খুনি, ধর্মীয় সন্ত্রাসীর পরিচিতি মাদরাসাকেন্দ্রিক হওয়ার পরেও তারা কেন এটাকে স্বীকার করছেন না।
আমাদের সৌভাগ্য যে জাফর ইকবাল বেঁচে গেছেন। বাংলাদেশের এই মুহূর্তের প্রগতির সবচেয়ে বড় কণ্ঠস্বর ফিরেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। কিন্তু ফের যে তিনি হামলার শিকার হবেন না সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। ফের যে অন্য কেউ হামলার শিকার হবে না সে নিশ্চয়তাও কেউ দিতে পারে না।
জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টাকারী ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের একজন শিক্ষার্থীদের তড়িৎ তৎপরতায় ধরা পড়েছে। অন্যেরা পালিয়ে গেছে। এনিয়ে থানায় মামলা হয়েছে। তবে এই মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া কতদূর এগোবে এনিয়ে কিছু বলা যায় না। এই হামলাকারী একা একা নিজেদের সিদ্ধান্তে জাফর ইকবালের মত দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বকে যে হত্যা করতে আসেনি সেটা ত পরিস্কার, এর সঙ্গে আরও অনেকেই জড়িত থাকাটাই স্বাভাবিক।
হত্যাচেষ্টাকারী যে ছেলেটা ধরা পড়েছে সে কতদিন জেলে থাকবে সে কথাও বলা যায় না। কিছুদিন পর হয়ত সেও জেল থেকে ছাড়া পাবে। যেমনটা অভিজিৎ রায় হত্যার অভিযোগে আটকদের একজন বাদে সকলেই ছাড়া পেয়ে গেছে। বিচার কতখানি হবে সেটাও বলা যায় না, কারণ ধর্মের নামে চালানো যেকোনো সন্ত্রাসের পর আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবেই সেই সন্ত্রাসীর প্রতি নমনীয় হয়ে পড়ি। রাষ্ট্রের সব অর্গান থেকে জানানো হয় ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা ‘ধর্ম বিচ্যুত’। অথচ যাকে ‘ধর্মবিচ্যুত’ বলা হয় সে একমাত্র নিজেকে এবং নিজেদের গোত্রভুক্ত বাদে আর কাউকেই ইসলাম ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে রাখতে রাজি থাকে না। পরস্পরবিরোধী এই অবস্থানের কারণে রাষ্ট্রই নিচ্ছে না কঠোর কোন পদক্ষেপ, ফলে আমরা লাশ গুণার দলে নাম লিখাই; আর অনেকেই থাকে লাশ হয়ে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যে।
ধর্মের নামে বাংলাদেশে যেসব হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটল সেগুলোর বিচারে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। অথবা আমরা বিচারেই আগ্রহী নই। ফলে লাশ গোনা ও রক্তের লাল ফোয়ারা দেখা ছাড়া আমাদের যেন করার কিছু নাই। আমরা রক্ত দেখছি ধর্মের নামে; আর ওদিকে বলছি এমন রক্তপাত ‘আমাদের ধর্ম সমর্থন করে না’!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







