আর মাত্র তিন ধাপ পেছালেই র্যাঙ্কিংয়ে ‘ডাবল সেঞ্চুরি’! ক্রিকেটে দ্বিশতক এক বিশেষ মর্যাদা বহন করে। বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশন এবং ফুটবলারদের চাইলে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন, খেলাটায় র্যাঙ্কিংয়ের ডাবল সেঞ্চুরির হাতছানিতে অনুভূতি কী! উত্তর না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পেলেও সেটি হবে চরম হতাশার। যে দল আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেই দীর্ঘসময়, ভেঙে পড়েছে ফুটবল কাঠামো, অধঃপতনের চোরাবালিতে খাবি খাচ্ছে, এমনকি উত্তরণের দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপও নেই; সেই দলকে র্যাঙ্কিং নিয়ে প্রশ্ন করাই অবান্তর। বিশ্বফুটবলে বাংলাদেশের পুরুষ দলটার অবস্থান যে ১৯৭তে। আশার আলোও আছে, সেটি লাল-সবুজদের কিশোরীদের নিয়ে। প্রজাপতি হয়ে যারা মাঠে প্রদর্শন করে যাচ্ছে নয়নকাড়া ফুটবল!
গত বছর এএফসি এশিয়া কাপ ২০১৯-এর বাছাইপর্বের প্লে-অফ ম্যাচে ভুটানের কাছে ৩-১ গোলে হারার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরে যেতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালের আগে সম্ভাবনা নেই প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার। নিচু সারির দলগুলোকে নিয়ে ফিফা আয়োজিত সলিডারিটি কাপে নাম লিখিয়েও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল বাফুফে। তাতে গুণতে হয়েছে জরিমানা। যে দল খেলারই সুযোগ পায় না, তারাই না খেলার জন্য জরিমানা গুনছে! রূপকথা নয়, এমন কাহিনীর জন্ম দেয়া ফেডারেশন বাফুফের হাতেই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ!
২০১৭ সালে কেমন ছিল বাংলাদেশের ফুটবল? এমন প্রশ্ন নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় দেশিয় ফুটবলের অন্যতম সেরা এবং সাউথ এশিয়ার একমাত্র উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচ মারুফুল হকের সঙ্গে। জবাবে মারুফুলের কণ্ঠে ঝরা হতাশা যেন বয়ান করল দেশের বর্তমান ফুটবলের বাস্তব পরিস্থিতিই, ‘বাংলাদেশের ফুটবল পাঁচ বছর আগেও যেমন ছিল, এখনও তাই আছে। উন্নতির কিছু তো নেই-ই, বরং পেছানোর বাকি আছে অনেক। এ দেশের ফুটবল নিয়ে বলার কিছু নেই!’
শুনতে কঠিন হলেও কথাটা সত্যি। প্রতিযোগিতামূলক আসর না থাকতে পারে, তাই বলে প্রীতি ম্যাচও খেলা যায় না? মারুফুল হকও ইঙ্গিত করলেন সেদিকেই, ‘একটা ম্যাচও হয়নি। আর কী বলবো ফুটবল নিয়ে?’

খেলা নেই। তাই বসে বসে বেতন নিতে হচ্ছে বলে বিরক্ত জাতীয় দলের কোচ অ্যান্ড্রু অর্ড। কয়েকদিন আগে সংবাদ মাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, তাকে দল দেয়া হচ্ছে না। ক্লাবগুলো তাকে খেলোয়াড় ছাড়ছে না! এ যেন ভীষণ দুর্বিপাক।
মূল দলের না থাকলেও বছর শেষে ছেলেদের ফুটবলে বাংলাদেশকে সান্ত্বনা দিচ্ছে বয়সভিত্তিক দল। দেশে প্রতিভা আছে, সম্ভাবনা আছে, সেটাই যেন জানান দিচ্ছেন তরুণরা। দরকার কেবল পরিচর্যা, দিকনির্দেশনা। জাফর ইকবালই তার সবেধন নীলমণির উদাহরণ! ডুবন্ত বছরে জ্বলছেন পুরুষদের ফুটবলে। যখন যে দলে ডাক পড়ছে, সেখানে খেলেই জ্বলেছেন জাফর। এবছর সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে রানার্সআপ করার পাশাপাশি ৫ গোল করে হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ভারত এবং ভুটানের বিপক্ষে পেয়েছেন জোড়া গোল। বাকি গোলটি মালদ্বীপের বিপক্ষে।
জাফরের মত বাংলাদেশের ফুটবলে আরেক উঠতি তারকা ফয়সাল আহমেদ ফাহিম। তার চোখ ধাঁধানো দুই গোলে কাতারকে হারিয়ে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশিপের টিকিট প্রায় কেটেই ফেলেছিল লাল-সবুজ বাহিনী। গত আগস্টে নেপালের কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে চার ম্যাচে হ্যাটট্রিকসহ ৭ গোল করেছিলেন ফাহিম।
বড়দের একের পর এক হারে ত্যক্ত-বিরক্ত বাংলাদেশি দর্শকদের কাছে রীতিমত তারকায় পরিণত হয়েছেন জাফর এবং ফাহিম। কিন্তু তারকাখ্যাতির আবার বিপদও আছে। জাতীয় দলের হয়ে জ্বলে ওঠার আগেই না হারিয়ে যান। বাংলাদেশের জাতীয় দলটাইবা কই? খেলা কই? তারা অমিত সম্ভাবনা জাগালেও তাই নিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে আরও উচ্চ শিখরে ওঠার, দেশকে ফুটবল-অন্ধকার থেকে বের করে আনার। তবে মশালটা জ্বালিয়ে রাখছেন। হয়ত অন্ধকার তিমির কাটিয়ে জাফর-ফাহিমদের পা ঘুরেই পুনর্জাগরণ হবে বাংলাদেশের ফুটবলের!
ছেলেদের ফুটবল যখন খুঁড়িয়ে চলছে, তখন উল্টোরথে চেপে আলোর মশালটা জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব পড়েছে মেয়েদের কাঁধে। খুব একটা হতাশ করেননি কৃষ্ণা-মারিয়া-তহুরারা। গোলাম রব্বানী ছোটন নামের জাদুরকাঠিতে নারীদের ফুটবল এখন অন্যতম ভরসার নাম।

চলতি বছর তিনটি বড় টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে কিশোরী ফুটবলাররা। বছরের শুরুতে প্রথমবারের মত সাফের ফাইনালে উঠে ভারতের কাছে হারলেও মেয়েদের চোখে দেখা মিলেছে লড়াইয়ের মানসিকতা। এই ২০১৭তেই এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের মূলপর্বে প্রথমবারের মত জায়গা করে নিয়ে এক জমজমাট লড়াই উপহার দিয়েছে কৃষ্ণা-মার্জিয়ারা। নর্থ কোরিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হারলেও জাপানের বিপক্ষে ভাল খেলেছে। আরেক পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের বিপক্ষে জিততে জিততে শেষ পর্যন্ত লড়ে হার। দেখা মিলেছে লড়াকু নারী ফুটবলারদের। যার ফলটাও মিলেছে হাতেনাতে। র্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবারের মত সেরা ১০০তে পা পড়েছে লাল-সবুজ বাঘিনীদের।
র্যাঙ্কিংয়ের পাশাপাশি বছর শেষে বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য সবচেয়ে বড় উপহারটা এসেছে কিশোরীদের হাত ধরেই। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাটা এখন বাফুফের ট্রফি কেসে। যার মূল কারিগর দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ই। তবে বিশেষ করে বলতে হয়ে মনিকা চাকমা, শামসুন নাহার, আঁখি খাতুনদের নাম। আগামীর পথে দেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার পথে তারা আবিষ্কৃত হয়েছেন নতুন করে, সাফের লড়াইয়ের মাধ্যমেই।
বাফুফে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন লক্ষ্য ঠিক করেছেন, ২০২২ সালে খেলা চাই কাতার বিশ্বকাপে। বাস্তবতার নিরিখে এখন সত্যি কথাটি হচ্ছে, ‘স্বপ্ন বহুদূর’! তবে সেটা ছেলেদের ক্ষেত্রে। চাইলেই স্বপ্ন ছোঁয়াও সম্ভব, উপায়টা দেখাচ্ছেন এই কিশোরীরাই। ২০০৯ সালে যে দলের দায়িত্ব নিয়ে একটা সময় মনে মনে দোয়া পড়তে পড়তে মাঠে নামতেন কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন, এখন সেই দলকে গড়েপিঠে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে সাউথ এশিয়ার সেরা বানিয়েছেন। স্বপ্ন ২০২০ সালের মধ্যে মেয়েদের সিনিয়র দলকে সাফ জয়ী করা। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে খেলারও স্বপ্ন বোনা শুরু হয়েছে। মশাটা জ্বলছে।
দেশের ফুটবল অধঃপতনের কারণ হিসেবে ক্লাবগুলোকে ছাড় দেয়া চলে না মোটেও। রাজধানীর বাইরে ফুটবলকে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না বড়-বড় ক্লাবগুলোর কারণেই। সঙ্গে আছে একাধিক বিতর্ক। এবছর, গত বছর, চলছেই এসব!

বকেয়া বেতনের দাবিতে মোহামেডানকে ফিফার আদালতে তুলেছেন নাইজেরিয়ান সাবেক কোচ এমেকা ইউজিগো। ফিফার পক্ষ থেকে রায় আসে ২০ হাজার ডলারের জরিমানার পাশাপাশি আরও ২ হাজার ডলার সুদ দেয়ার। সঙ্গে লিগে তিন পয়েন্ট কেটে রাখার। তাতে মোহামেডানের গড়িমসিতে বিপদেই পড়তে বসেছিল বাফুফে। শেষপর্যন্ত জরিমানা দিয়েই বাফুফের সঙ্গে নিজেও বেঁচেছে মোহামেডান। কোচ কাণ্ডে জরিমানা গুনতে হয়েছে ঢাকার মাঠের আরেক জায়ান্ট শেখ রাসেলকেও।
২০১৬ সালে এএফসি কাপে ঢাকার মাটিতে দর্শকের বোতল ছোড়ার কাণ্ডের জরিমানা ৫ হাজার ডলারে এ বছরই শোধ করতে হয়েছে ঢাকা আবাহনীকে। সঙ্গে ঘরোয়া লিগের মান উন্নয়ন না করা, ফুটবল ব্যবস্থাপনায় দূর পরিকল্পনার ছাপ না থাকা, এমন আরও দৃশ্যমান দুর্গতিতেই তাই বছরটা পেরিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবলের।
অন্যদিকে, এবছর মেয়েদের ফুটবলে আনন্দের পাশাপাশি বেজেছে হারানোর সুরও। মাত্র তিনদিনের জ্বরে ভুগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে বিদায় নিয়েছে কলসিন্দুরের কৃতি ফুটবলার সাবিনা ইয়াসমিন। বেঁচে থাকলে হতে পারতেন সাফজয়ী দলটির গর্বিত সদস্য। ২০১৫ এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ গার্লস রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলে জয়ী বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় ছিলেন সাবিনা।
হারানোর শোক আছে আরও। মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ে আগস্টে মারা যান স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য আইনুল হক। আর সেপ্টেম্বরে আরেক খ্যাতিমান ফুটবলারকে হারায় বাংলাদেশ। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও গোলকিপার মোতালেব হোসেন মারা যান।
সবমিলিয়ে ২০১৭ সাল দেশিয় ফুটবল থেকে কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছুই। যার দায়ের বেশিটাই দেশের ফুটবল প্রশাসকদের, খেলোয়াড়-ক্লাবগুলোই একেবারে দায়মুক্ত নয়। দুদিন বাদে দুয়ারে নতুন বছর, ২০১৮। নতুন অনেক কিছু দেখার পালা, নিজেদের ভুল শুধরে নতুন করে হাঁটার সুবর্ণ সুযোগ লাল-সবুজের ফুটবলেরও। তাতে মেয়েদের এগিয়ে চলার আশা নিরন্তর। আর সেটা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন পথ খুঁজে পাবার স্বপ্ন ছেলেদের ফুটবলকে ঘিরেও।








