তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের হাল ধরতে আবারও নতুন নেতৃত্ব খোঁজার কথা বলেছেন। যদিও এ সময় দলের নেতাকর্মীরা জানান, শেখ হাসিনার বাইরে তারা নতুন নেতৃত্ব চান না।
গত ১৭ মে ৩৭তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে গণভবনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় দলের নতুন নেতৃত্ব দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বটে, কিন্তু সত্যিই কি আমাদের দেশে তেমন যোগ্য বিকল্প নেতৃত্ব আছে? খুঁজলেই কি পাওয়া যাবে তেমন নেতৃত্ব? আর শুধু আওয়ামী লীগই, কেন, বিএনপিতেই কি আছে খালেদা জিয়ার বিকল্প? তেমন বিকল্প নেতৃত্ব সৃষ্টির সুযোগ কি দেয়া হয়েছে?
হ্যাঁ, দল পরিচালনা, কিংবা দেশ পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতার প্রয়োজন হয়। শুধু দল বা দেশ কেন, যে কোনো উদ্যোগ বা কর্মে, যে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গেলেই নেতা দরকার হয়। নেতা ছাড়া কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে করা যায় না। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে না। যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া কোনো কাজ করা মানে হচ্ছে: ছাগল দিয়ে ধান পাড়ানো। এতে কাজের কাজ কিছু হয় না। আমাদের দেশে অন্য অনেক ক্ষেত্রে নেতার অভাব না থাকলেও রাজনীতিতে যোগ্য নেতার অভাব লক্ষ করা যায়।
আমরা জানি যে, রাষ্ট্রপরিচালনার নীতিই হচ্ছে রাজনীতি। এক সময় বলা হতো, রাজনীতি হচ্ছে রাজার নীতি। রাজা কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন, সেটাই রাজনীতির মূল কথা। রাজনীতির সঙ্গে ‘নীতি’ কথাটা যুক্ত আছে। নীতি হলো কিছু আদর্শ নিয়ম-কানুন। অতীতে আমরা দেখেছি যারা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, তারা নীতি-নৈতিকতার চর্চা করেছেন। রাজনীতিবিদদের মানুষ শ্রদ্ধা করত। তাদের কথায় জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা বোধ করত না। রাজনীতি ছিল এক সময় দেশ ও মানুষের সেবা করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা। যারা রাজনীতির খাতায় নাম লেখাতেন তারা আত্মস্বার্থ কখনো বিবেচনায় রাখতেন না। দেশ-জাতি, মানুষের কল্যাণই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা জাতির কল্যাণ সাধনায় ব্রতী হয়ে নিজেদের দিকে তাকানোর সময় পেতেন না। জনগণের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে চলতেন সব ধরনের ভয়-ভীতি, লোভ-লালসাকে উপেক্ষা করে। আর এখন? সব কথা খুলে বললে চারদিকে হৈ চৈ পড়ে যেতে পারে! দেশ-জাতি এসব শব্দ আজকের রাজনৈতিক নেতাদের ক’জনের মস্তিষ্কে বাসা বাঁধতে পেরেছে তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। উপর থেকে শুরু করে নিচ পর্যন্ত-সবখানে একই ধারা চলছে বছরের পর বছর ধরে। দলগুলো ব্যস্ত রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখতে, কিংবা দখল করতে। আর নিচু পর্যায়ে ‘নেতারা’ ব্যস্ত হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তার সবটা উদরস্থ করে ফুলে-ফেঁপে পাটখড়ি থেকে হাতি হতে। আর যারা রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে, তারা অপেক্ষায় থাকে কবে সে সোনার হরিণ ধরা দেবে, যা তাদের ভাগ্য খুলে দেবে। এ জন্য তাদের ছল-বল-কৌশল প্রয়োগের কোনো শেষ নেই।
রাজনীতির সঙ্গে নেতা ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। নেতা ছাড়া রাজনীতি কল্পনাই করা যায় নায়। যাদের হাত ধরে নীতি প্রণয়ন হয়, প্রতিষ্ঠিত হয়, নীতির প্রচার-ও প্রসার হয়, তাদের মধ্যেই আজ নীতি-নৈতিকতা নির্বাসিত প্রায়। আজকে রাজনীতির মাঠে নীতিহীন নেতার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। তারা বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজীসহ নানা ধরনের অপকর্মের মহোৎসব পালন করে। সমাজসেবার নামে ফটোবাজি করে সমাজের বারোটা বাজায় এসব রাজনীতির নামে ঘৃন দালালরা। এমপি মন্ত্রীদের ছবির সঙ্গে রঙচটা পোষ্টার ছাপিয়ে তারা বড় নেতা বনে যায়। অনুষ্ঠানের নামে চলে চাঁদা তোলার মহড়া। এসব নেতা স্বার্থের জন্য কারো পায়ে মাথা ঠেকাতেও দ্বিধা করে না। আবার স্বার্থের জন্য কারো কপাল ফাটাতেও দ্বিধা করে না।
আজকের নেতারা নীতির চর্চা করেন না তাইতো জাতি আজ নৈতিকতাহীন ও মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। তারা তাদের লাভের আশায় দেশের বারোটা বাজাতে একটুও চিন্তা করেন না। চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, খুনি, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ীরা যখন সমাজের নেতৃত্বে আসে তখন তারা মানুষের জন্য কি করবে? ধান্দাবাজদের নেতৃত্বে সমাজ কখনোই এগিয়ে যাবে না। তাইতো আমরা বার বার এগিয়ে চলার পথে হোঁচট খাচ্ছি।
অনেকে জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মেডেলের সোনা মেরে, রাজউকের প্লট গ্রাস করে, বনের গাছ কেটে, বনের ভূমি নিজের নামে লিখিয়ে, চুক্তিবদ্ধ খুন অথবা গুম করিয়ে, মাদক ও সোনার চোরাচালানি করে, চাঁদাবাজির মাধ্যমে জোঁকের মতো রক্ত শোষণ করে কেউ রক্ষা পেয়ে যাবে-এটা কি কোনো সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে? দেশের স্বার্থে, জনগণের মঙ্গলে, মানবতার স্বার্থে সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা ও আইনের শাসন বজায় রাখার জন্য কোনটি উচিত আর কোনটি অনুচিত-এ সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব কার?
একথা ঠিক যে আমাদের দেশে অনেক নেতা আছে। কিন্তু যোগ্য নেতা কি আছে? যারা লড়তে জানে, জনকল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত, যারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যারা ঘুষ-দুর্নীতি-লোভ-মোহের ঊর্ধ্বে উঠে সকল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। তেমন নেতা কি সত্যিই আমাদের সমাজে আছে? তৈরি হচ্ছে? আমাদের পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে সমাজে, রাজনৈতিক দলে তেমন নেতৃত্ব বিকাশের পথ কি আছে? নাকি ধান্দাবাজ-স্বার্থান্ধদেরই কেবল সামনে চলার পথ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে?
বিখ্যাত নাট্যকার ব্রেটল্ট ব্রেশট-এর ‘গ্যালিওর জীবনী’ নাটকে গ্যালিলিওর এক শিক্ষার্থী আন্দ্রিয়া বলেছেন, ‘দুর্ভাগা সেই দেশ যাদের কোনো নেতা নেই।’ উত্তরে গ্যালিলিও বলেন, ‘না, দুর্ভাগা সেই দেশ যারা কেবল নেতারই প্রয়োজন অনুভব করে (Galileo’s students, Andrea, says: ‘Unhappy the land that has no heroes.’ Galileo replies: ‘No, unhappy the land that needs heroes.’)।
হ্যাঁ, আমরা আমরা সত্যিই দুর্ভাগা যে আমাদের দেশে যোগ্য নেতার অভাব রয়েছে। আমরা আরও বেশি দুর্ভাগা যে আমরা কেবল নেতারই প্রয়োজন অনুভব করি!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









