সবকিছু হুটহাট করতে হয়। কাজ আসলো মানেই তা শেষ করতে হবে। এই শেষ তো, এবার ফেরা যাক। সময় কই বসে থাকার? একটা ব্যাপার আমার কাছে স্পষ্ট, আলাপ-আলোচনা, পরিকল্পনা করতে করতে সময় ব্যয় হয় বেশি। পরিকল্পনা প্রয়োজন, তবে তার জন্য সময় ব্যয় করা যাবে না। কাজ শুরু করে দিতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
ঠিক ট্রেনের মতো। ট্রেন প্লাটফর্মে এসেই যাত্রী তুলে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। যেতে যেতে ছুটে চলে দুরন্ত গতিতে। কাজ করতে হবে এভাবেই, দুরন্ত গতিতে…
২৬ জুন ঈদ শেষ করে পরদিনই যে দেশে ফিরতে পারবো তা ভাবিনি। কিন্তু ঈদের সময় দিল্লী যে কারণে আসা তা ঈদের পরদিনই শেষ হওয়ায় সম্ভব হলো। কাজ শেষ তো বসে থাকার মানে নেই। ফিরতে হবে। অন্য কাজ সারতে হবে। সফর সঙ্গী মীর লোকমানকে এটাই বলেছি। তো যে কথা সেই কাজ। গতকাল ২৭জুন তথা ঈদের পরদিনই নয়াদিল্লী স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে পড়লাম। গন্তব্য কলকাতা। কলকাতা থেকে বাসে সোজা বাংলাদেশ।
সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ট্রেন। ১০ নাম্বার প্লাটফর্ম থেকে ঠিক ৭টা ৪০ মিনিটের এক মিনিটও দেরি করেনি। যাত্রী তুলেই যাত্রা করলো। আমরা থ্রি এসি, স্লিপিং সিট পেয়েছি। তাও তাৎক্ষণিক একটি ট্রাভেল এজেন্সি থেকে। ভাড়া ২৭৫০ রূপি! সঙ্গে খাবার-দাবার আছে, তা নিশ্চিত হয়েছি। ট্রেনে উঠে আমাদের কামরার সবগুলো সিট দেখি ফাঁকা। ফলে একেবারে কমফর্টেবল যাত্রা বলতে যা বুঝায় তার পুরোপুরিই পাচ্ছি এবার।
ট্রেন চলছে। আর একটু পর পর নাস্তা আসছে। প্রথমে এসেই বেয়ারা দিয়ে গেলেন গরম গরম স্যুপ, ব্রেড স্টিক, মিক্সড পিকল এবং সস। একটু পর এলো লেমন জুস। ব্যাপক খেলাম। খানিক পরেই এলো ডিনার। মেন্যুটা ভালোই। শুরুতেই আমরা নন-ভেজ বলে দিয়েছিলাম। সে অনুযায়ীই খাবার দেয়া হয়েছে। মুরগি, ঘন ডাল, সঙ্গে তিন পিস আমার পছন্দের চালের রুটি। ডিনার শেষে দিলো টক দই।
লোকমান খুব ধীরে খায়। সে খেয়ে শেষ করতে পারছে না। আমার কোন সমস্যা নেই। সবকিছু ধুমধাম সেরে নিই। খাবারের বেলাতেও তার ব্যত্যয় ঘটছে না। সব খেয়ে নিলাম। লোকমানকে বললাম, তাহলে এবারের ট্রেন যাত্রা ব্যর্থ হচ্ছে না। এতো বিমানের চেয়ে দ্বিগুণ সুবিধা সবকিছুতে। ঠিকই। বিমানে তো শুয়ে শুয়ে, ঘুমিয়ে যাওয়া যায় না। বেডশিট, বালিশ, বেড, তোষক থাকে না। ট্রেনে সব আছে। অসম্ভব মজাদার ভ্রমণ বলতে যা বুঝায়, একদম তাই।
সব খাবার-দাবার নিমিষেই শেষ করে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ট্রেন চলছে। মাঝে মধ্যে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। ঝকঝক শব্দ শুনতে পাচ্ছি। রাতের ট্রেন। জানালার ফাঁক দিয়ে সুন্দর আকাশ দেখছি। মনে হচ্ছে ট্রেনের সঙ্গে আকাশসহ তারাগুলো সঙ্গে চলছে। দুদিন আগেই নতুন চাঁদ পেয়েছি আমরা। সঙ্গে পেয়েছি অগণিত তারকারাজি। আকাশে তার দেখা মিলছে। ভালো লাগছে। তারার গন্ধ পাচ্ছি। তারার গন্ধ শুকতে শুকতে কোন সময় যে ঘুমে এলিয়ে গেলাম টের পাইনি। ভোরে যখন ঘুম ভাঙে তখন বেয়ারা চায়ের ডিব্বা এনে টেবিলে রেখে গেছেন।

বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দুরন্ত এক্সপ্রেসের দুরন্ত ছুটে চলা দেখছি। আহা কি সবুজ চারিদিকে। সারি সারি ফসলের মাঠ, দেখতে কি সুন্দর লাগছে, কি মোহনীয় লাগছে! বারবার বাংলার গন্ধ পাচ্ছি হঠাৎ! কি ব্যাপার এমন লাগছে কেন? সোনার বাংলার স্পর্শ পাচ্ছি কেন? হাজারও প্রশ্ন মনে। উত্তর পেলাম লোকমানের কথায়। আমরা এখন বিহার অতিক্রম করছি।
বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা; এভাবেই হতে পারতো একটি সোনার বাংলাদেশ। কিন্তু ব্রিটিশ, পাকিস্তানি আর ভারতীয় কিছু মোড়ল এবং বাংলার কতিপয় মীর জাফরদের ধূর্তামিতে আমরা হারিয়েছি একটি বিস্তৃত বাংলা। এখন ইচ্ছে হচ্ছে বিহার প্রদেশটি ট্রেনে তুলে সঙ্গে নিয়ে যাই।







