সাতসকালে পত্রিকা হাতে পাওয়ার পর চোখে পড়ল ‘গৃহবধূ মেহবুবার আর কেউ রইল না’- শিরোনামে খবর। খবরটি পড়ে নিজেকে স্থির রাখতে ভীষণ কষ্ট হলো। উত্তরার গৃহবধূ মেহবুবা হাসান লিফ্ট দুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণে নিহত স্বামী মাহমুদুল হাসান আর প্রিয় কন্যা মাইশাকে হারানোর পর চেয়েছিলেন অগ্নিদগ্ধ হয়ে বেঁচে থাকা শেষ প্রদীপ আট মাসের শিশুসন্তানকে সুস্থ করে হাসপাতাল থেকে ঘরে ফিরবেন। ছোট্ট শিশুকে আগলে রেখে ভুলে যাবেন স্বামী আর মেয়েকে হারানোর সব ক্ষত আর বেদনা। কিন্তু না ঈশ্বর সেটা তার কপালে লিখে রাখেনি। আর তাই ১৬ জুলাই সকালে মাকে একা ফেলে রেখে বাবা আর বোনের পথ ধরে শিশু মুত্তাকীনও চলে যায়।
মুত্তাকীনের মা মেহেবুবা এখন একা। শুধু একা বললে ভুল হবে। এই পৃথিবীতে সত্যিই যেনো তার আর কেউ নেই। ২৪ জুন চোখের সামনে তিনি প্রথম দেখেন অগ্নিদগ্ধ স্বামীকে চলে যেতে। আর এই দুঃসহ বেদনার দাগ না মুছতেই ১৩ দিনের মাথায় অগ্নিদগ্ধ মেয়ে মাইশাও তাকে ছেড়ে চলে যায়। সর্বশেষ আটমাস বয়সী মুত্তাকীন, সেও চলে গেল। সরকারের পক্ষ থেকে মাইশা ও মুত্তকীনের চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি। কিন্তু শেষপর্যন্ত কাউকেই বাঁচানো গেল না।
২৪ জুন রাজধানীর উত্তরায় ট্রপিক্যাল আলাউদ্দিন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্সে আকস্মিক লিফ্ট দুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণে নগরবাসী চমকে উঠেছিল। ঐ ঘটনায় মারা যায় ৬ জন। কিন্তু ডেভলপার প্রতিষ্ঠান ট্রপিক্যাল হোমসের শীর্ষ কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুল হাসানের পরিবারটির উপর যেনো নেমে আসে সবচেয়ে করুণ পরিণতি। রোজার মাসে ইফতারের জন্য অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ভবনের বেজমেন্টে আট বছর বয়সী মেয়ে মেহনাজ হাসান মাইশা ও আটমাসের ছেলে মুত্তাকীনকে নিয়ে তিনি মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হন। দুর্ঘটনায় পরপরই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুল হাসান। ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে ভবনের বেজমেন্টের অফিসে এসেছিলেন। দেরীতে আসার কারণে স্ত্রী মেহবুবা হাসান দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যান।
স্বামীকে হারিয়ে মেহবুবা দুসন্তানকে বাঁচাতে ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু ১৩ দিনের মাথায় বাবার পথ ধরে তার মেয়ে মাইশাও চলে যায়। শেষমেশ বেঁচে থাকে কেবলই ছোট্ট মুত্তাকীন। এই শিশুটিরও দেহের বড় অংশ অগ্নিদগ্ধ হয়, ক্ষতিগ্রস্থ হয় শ্বাসনালী। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকে মুত্তাকীন। চিকিৎসকরা নিরবিচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। স্বামী আর প্রিয় মেয়ে মাইশাকে হারিয়ে মা মেহবুবা শিশু সন্তান মুত্তাকীনের সুস্থতার জন্যে কেবলই প্রার্থনা করতে থাকেন। আশায় বুক বাঁধতে থাকেন এই বলে যে, তার নিঃস্ব রিক্ত বুকের মাঝে থাকবেন মুত্তাকীন। সেই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। কিন্তু নিয়তি এত নিষ্ঠুর হবে সেটা হয়ত কোনোদিন ভাবেননি মেহবুবা।
১৬ জুলাই ডাক্তারদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মুত্তাকীনও না ফেরার দেশে চলে গেলে মেহেবুবা নির্বাক হয়ে যান। অতঃপর ছেলের লাশ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে রওনা দেন। একটি দুর্ঘটনা মেহবুবা হাসানের সুখী সুন্দর পরিবারকে কীভাবে নি:শেষ করে দিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। স্বামী সন্তান হারানোর পাহাড়সম বেদনা তিনি কীভাবে সামলাবেন তা এখন আর কারোর পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। সারাজীবনই যে তাকে এখন চোখের জলে ভাসাতে হবে। আসলেই এই মুহূর্তে মা মেহবুবার জন্যে পৃথিবীতে আর কোনো সান্ত্বনা নেই। চোখের সামনে স্বামীকে হারানো, পর পর দু’দুটি সন্তানকে হারানো এই শোক এই মাকে বইতে হবে সারাজীবন।
এর আগে এ বছরের শুরুতে নগরীর উত্তরার আরেকটি পরিবারের উপরও এরকম নির্মম ঘটনা ঘটে যায়। সেটি ঘটেছিল- ২৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের একটি ফ্ল্যাটে গ্যাসের চুলার লাইন লিক করে ফ্ল্যাটে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে পরিবারের সবাই অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল। ঐদিন ভোরে চায়ের পানি গরম করার জন্য চুলা জ্বালাতে গেলে পুরো পরিবার মুহুর্তেই অগ্নিদগ্ধ হয়। গৃহকর্তা ইঞ্জিনিয়ার শাহনেওয়াজ, তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার তিন ছেলে শাহলিন বিন শাহনেওয়াজ, জারিদ বিন শাহনেওয়াজ ও জারিফ বিন শাহনেওয়াজ-এর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের স্তব্ধ না করে পারেনি। সেদিন প্রথমে একে একে অগ্নিদগ্ধ বাবা ও দুই ছেলে মারা যায়। এরপর ৬ মার্চ অগ্নিদগ্ধ মা সুমাইয়া বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোহাম্মদপুর সিটি হাসপাতালে মারা যান। এই পরিবারের এখন শুধুই বেঁচে আছে মেজ ছেলে জারিফ বিন শাহনেওয়াজ। সেদিনের ঘটনায় তুলনামূলক কম অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কারণে এগারো বছর বয়সী জারিফ মা, বাবা আর দুই প্রিয় ভাইকে হারিয়ে ভয়ংকর এক স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে।
আসলে মেহবুবা হাসান আর শিশু জারিফ বিন শাহনেওয়াজ-এর গল্প একই রকমই। ঐ দুজনের পৃথিবীতে এখন আর কিছুই নেই। মেহবুবা হাসান হারিয়েছে স্বামী আর দুই সন্তানকে। ছোট্ট জারিফ হারিয়েছে বাবা, মা আর দুই ভাইকে। খুব কাছাকাছি সময়ে দুটি দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কারণে দুটি পরিবারের সাজানো-গোছানো সংসার যেভাবে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
দুটি ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলারও অবকাশ নেই। দুটি ঘটনাতেই অবশ্য চরম গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা চোখে পড়ে। উত্তরায় ইঞ্জিনিয়ার শাহনেওয়াজের ফ্লাটে গ্যাস লিকের যে ঘটনা ঘটেছিল সেখানে বাড়িওয়ালা সতর্ক হলে বা অভিযোগটা কানে নিলে হয়তো এতবড় দুর্ঘটনা ঘটতো না। গ্যাস লিকের বিষয়টি ফ্লাট মালিককে ইঞ্জিনিয়ার শাহনেওয়াজ আগেভাগে বলার পরও ফ্ল্যাট মালিক সেটা রি-চেক করা বা তদারকি করা থেকে বিরত থাকেন। আবার উত্তরায় ট্রপিক্যাল আলাউদ্দিন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্সে লিফট দুর্ঘটনা থেকে একটি পরিবার যেভাবে নিঃস্ব হলো সেখানেও কর্তৃপক্ষের গাফিলতির খবর উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। আসলেই অবহেলা আর গফিলতির জন্যেই যে কেবল দুটি পরিবার পুড়ে ছাড়খার হয়ে গেল এটিই সত্যি। উন্নত দেশ হলে এ দুটি পরিবারকে ভবনের মালিক নয়তো খোদ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বড় ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। কিন্তু আমাদের দেশে তো আর সেই ব্যবস্থা নেই। যে মরবে সব দোষই তার। 
ঢাকা শহরে এখন হাজার হাজার, লাখ লাখ বাড়িঘর, শপিং মল, মাল্টি স্টোরেড বিল্ডি, হাইরাইজ বিল্ডিং। কিন্তু এইসব ভবনগুলো ব্যবহারের নিয়মনীতি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মনিটরিং-এর কোনো আদর্শ ব্যবস্থা কী আজও গড়ে উঠেছে? একটুও গড়ে উঠেনি বলেই প্রতীয়মান। আবার ফ্ল্যাট মালিক, ভাড়াটিয়া বা কমিউনিটি থেকেও এ ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। অনেক জায়গাতে ফ্ল্যাট মালিক সমিতি থাকলেও ভাড়াটিয়াদের অধিকার ও দায়-দায়িত্বসমূহ তারা একেবারেই পাত্তা দিতে চান না।
খুব দ্রুত সময়ে উত্তরার দুটি পরিবারের সর্বশান্ত হয়ে যাওয়ার যে ঘটনা আমরা দেখতে পেলাম এটি আমাদের বহুদিন ধরে চলমান গাফিলতি সংস্কৃতির কারণেই হয়েছে। আর আমরা কোনো কিছুতেই সতর্ক নই, সবকিছুকেই দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাচ্ছি। অথচ দুটি পরিবারের আর কিছুই থাকল না। দুটি ঘটনা থেকে আমাদের অনেক কিছুর শেখার থাকলেও সত্যটা হলো সেই শিক্ষা নেওয়ার লোকও নেই। আমরা বোধ হয় কিছুই শিখলাম না, শিখবও না। অনুমিত হচ্ছে নগরীর হাজার ঘটনার ভীড়ে মেহবুবা হাসানের বুকফাটা আর্তনাদ, শিশু জারিফ শাহনেওয়াজের অভিমান আর কান্নাও তেমন কাউকে স্পর্শ করছে না। সত্যিইতো এই শহর কেবলই ইট আর কীটের শহরে পরিণত হচ্ছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)










