জুমার নামাজে আমি সবার পরে যাই, সবার আগে চলে আসি। এই কৌশল চর্চা করে সেদিন যখন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে নামায আদায় করতে গেলাম, হুজুর তখন অলরেডি সূরা পাঠ শুরু করে দিয়েছেন। আমার হাতে জায়নামাজ ছিল, তাই রাস্তায় দাঁড়াতে কুণ্ঠাবোধ করলাম না। মার্কেটের এক দারোয়ান দৌঁড়ে এসে বলল, “ভাই, তাড়াতাড়ি বিছান,”। আমার এত ভালো লাগল! একজন দারোয়ান আমার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, ঘেঁষাঘেঁষি করে নামায আদায় করলেন।
দারোয়ান সাহেব আমাকে দূরের বা উচ্চের কেউ ভেবে আমতা আমতা করেন নি। আত্মবিশ্বাসের সাথে আমাকে তার সমান ভেবে পাশে ঘেঁষে দাড়িয়ে নামায পড়ে চলে গেলেন। আমার ধারণা এটাই আসল ইসলাম। ইসলামের একটা অর্থ হতে পারে সাধারণের ক্ষমতায়ন!
ভারতীয় উপমহাদেশে “উচ্চ বর্ণের” হিন্দুদের জাত-পাতের কদাকার চর্চা থেকে “নিম্নবর্ণের” হিন্দুদের মুক্তি দিয়েছিল যে দর্শন, সেটি ছিল ইসলাম। উপমহাদেশীয় পরিসরে সমাজের বঞ্চিত, নিগৃহীত মানুষদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিয়েছে যে দর্শন, সেটি হল ইসলাম। ইসলাম এ অঞ্চলে আগমন করেছে এবং প্রসারিত হয়েছে সুফি-দরবেশদের দ্বারা। বিশেষ করে গঙ্গা-বিধৌত পূর্ববঙ্গে বাঙ্গালিত্ব এবং ইসলামের সম্মিলনে যে সাম্য ও মানবতাবাদী সমাজ-দর্শনের আবির্ভাব ঘটেছিল তাতেই নিহিত আছে, এই বিশেষ দর্শনের আসল সৌন্দর্য!’
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’, ‘মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নাই’, ‘সকল মানুষ ভাই-ভাই’, দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’, এইসব মহানুভূতি আমাদের মগজে ও মননে প্রবেশ করিয়ে ‘দলিত’ থেকে শুরু করে ‘ব্রাহ্মণ’ সবাইকে এক বুকে জড়িয়ে ধরে দুঃখ ভাগাভাগি করার শিক্ষা আমাদের দিয়েছে ইসলাম। যে ইসলাম এ মুল্লুকে সামাজিক নানা বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সাম্যবাদের সূচনা করেছে সে ইসলাম নিয়ে আজ আমাদের মনে এত ভয়, সংশয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কেন?
কয়েকদিন ধরে একটা ‘রসিকতা’ শুনতে হচ্ছে যে, “কোথাও কোন উটকো ভীড় বা যানজট দেখলে যে কেউ জোরে ‘আল্লাহ আকবর’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠলেই সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে!” ঢাকার গুলশানে অনলাইনভিত্তিক ইহুদি সংগঠন “আইএস” এর দেশিয় এজেন্ট জামাতে ইসলামির মদদে আমাদেরই কিছু পথভ্রষ্ট অতি শিক্ষিত(?) যুবকের হাতে মেহমান বিদেশীদের নৃশংস ভাবে কতল হওয়ার পরে ঢাকার জনমানসে আমাদের ধর্ম নিয়ে যে আতঙ্ক প্রবেশ করেছে এবং তা থেকেই যে উপরোক্ত টাইপের রসিকতার জন্ম হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নাই। এখন কথা হল এ পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী?
আমার এক বন্ধু দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় বাহাদুরি দেখিয়ে এখন রেস্টুরেন্ট বিজনেস করছেন এবং যথারীতি তিনি সেখানেও বেশ তাকত অর্জন করেছেন। তিনি কয়েকদিন আগে বদন-কিতাবে (ফেসবুকে) পোস্ট দিয়ে দেশের বর্তমান সংকট নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। যতটুকু তাকে চিনি, তিনি বেশ সাহসী এবং উদার একজন মানুষ। উনি জানতে চেয়েছেন, মসজিদের শহর ঢাকায় এই অনাচার কেন? প্রশ্নটা খুবই প্রাসঙ্গিক এবং সময়-সৃষ্ট।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির দুইটা দিক আছে। একটা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতা-রাজনীতির দিক, আরেকটা আমাদের নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৈন্যতার দিক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামাতে ইসলাম, পাকিস্তান এবং মার্কিন ব্লক কোণঠাসা হওয়াতে “আই এস” জাতীয় সমস্যার উদ্ভব ঘটবে সেটা আমরা ইতিহাসের আলোকে আগেই রাষ্ট্রকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি। ৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যারা আমাদের ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করেছে, ৭৫ এ যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, সেই সাম্রাজ্যবাদী আন্তর্জাতিক চক্রই যে এখন ‘আইএস’ নামের উৎপাত সৃষ্টি করেছে, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।
দেশে দুর্নীতি আর জনসংখ্যার মত দানবীয় সমস্যা থাকতে ধর্মীয় উন্মাদনার বিষয়টি প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর ভয়াবহতার জন্যই। “আল্লাহ আকবর” বলে যারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন, তাদের কে নিয়ে ঘরের বাইরে, ভেতরে আলোচনা, আতঙ্ক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সরকার, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ যেভাবে জঙ্গিবাদকে একটা এলিট ডিসকোর্সের রুপ দেয়ার চেষ্টা করছে, তাতে সমস্যা আরও গভীর হবে এতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। জঙ্গি/সন্ত্রাসী যে কেউ হতে পারে; আলালের ঘরের দুলাল যেমন হতে পারে, আবার মাদ্রাসার এতিমও হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যারা প্রায়শঃ স্কুল-কলেজে গুলি করে ছাত্র-শিক্ষক মারে তারাতো আমার দেশের মাদ্রাসায় পড়ে যায়নি! সমস্যা ছনের বেড়ার মাদ্রাসার নয়, উচ্চবিত্তের ‘হাভেলি’রও নয়। সমস্যা তৈরি করে ব্যক্তি, পরিবার, রাষ্ট্র। মাদ্রাসা থেকে আমরা তারেক মাসুদকে পেয়েছি, আবার নর্থ-সাউথ থেকে একদল জঙ্গিও পেয়েছি। কথা হল, আপনি কী শেখাচ্ছেন ছাত্রদের, কী নসিহত করছেন তাদের। টিচার স্টুডেন্টকে জঙ্গি বানাতে পারে, আবার শিল্পীও বানাতে পারে। মূল বিষয় হল চেতনা। পরিবারে আমরা কোরআন তেলাওয়াত যেমন শুনেছি, আবার মুক্তিযুদ্ধের গানও শুনেছি। আমাদের মা-খালারা শুনতেন আব্বাস উদ্দিন, আমরা শুনতাম নচিকেতা। এখন খোঁজ নিয়ে দেখেন, মা-খালারা সারাদিন (পারলে সারারাত) আজব সব সিরিয়াল দেখে সময় কাটায়।
অনেকে আছেন যারা দিনে একবার মার্কেটে না গেলে বিলাপ শুরু করেন। আর শিশু দেখে বিদেশী কার্টুন, আর কিশোর-কিশোরী, তরুণতরুণীরা শুনে নানাবিধ গরম গান। পড়ালেখা করে আমরা কেউ আর সৎ হতে/থাকতে চাইনা, জান বাজি রেখে কোনো মতে দুর্নীতির আমলাতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারলেই নিজেকে সফল ভাবা শুরু করি। শিক্ষার সাথে এখন আর নৈতিকতা কিংবা শান্তিপ্রিয়তার সম্পর্ক নাই। শিক্ষিত লোক সৎ, নৈতিকতা সম্পন্ন হবে এমন গ্যারান্টি বোধকরি আমাদের মহাশক্তিমান মহাজ্ঞানী শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ও দিতে পারবেন না। একটা স্বাধীনতা যুদ্ধ করে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। অথচ আমাদের দেশে দেখুন কত ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা।
কয়েকধরনের মাদ্রাসা ব্যবস্থা, ইংলিশ মিডিয়াম, ইংলিশ ভার্সন, গাও-গেরামের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থাসহ আরও কত কী! জন্মের সময় শিশু শিল্পী বা জঙ্গি হয়ে আসেনা। এই নিদারুণ বাস্তবতার দায় আমাদের বাবা-মা, পরিবার, সরকার এবং চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রের, সকলের। দক্ষ পুলিশ, র্যাব, আর্মি দিয়ে আপনি তাৎক্ষণিক হামলা শামলাতে পারেবন। কিন্তু স্থায়ী শান্তি কামনা করতে পারেন না। দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ে জিততে হলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই লড়তে হবে। একটা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই লড়তে হলে সবার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরকারকে শতভাগ সততা আর আন্তরিকতা দিয়ে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। সঠিক কর্মপন্থা ঠিক করতে হলে জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস কিংবা সময়কে অনুধাবন করে তার আলোকে আমাদের তৈরি হতে হবে।
আমাদের বাংলাদেশের জন্য এমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এবং ইতিহাস হল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এবং সেই মুক্তিযুদ্ধে বাঙ্গালি জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দিন আহমেদসহ তার সহকর্মীরা। আমরা যে ভারত ও পাকিস্তানের মানুষ এবং সংস্কৃতি থেকে আলাদা সেটা ৪৭, ৭১ দিয়ে অনুধাবন করেছি। এখন নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাজানো হয়েছে? জাতির জনকের আদর্শ কি আমাদের ভেতরে আছে? জাতির জনকের আদর্শ কী ছিল সেটাই তো আমরা সবাই জানিনা; আর যারা জানে, তারা কয়জন সেই আদর্শ মেনে চলেন? দেশের সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কি জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়? সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কি সঙ্গীত চর্চা হয়? থিয়েটার চর্চা করা হয়? যদি না হয়, তাহলে আপনি কীভাবে আশা করেন, এদেশের সবাই শান্তি, সৌম্যের চেতনা অর্জন করবে?
গুলশানের সন্ত্রাসী হামলা যে আমাদের আমলাতন্ত্রে কোন আছর ফেলতে পারেনি তার প্রমাণ আমরা হরহামেশাই পাই। কয়দিন আগে বদন কিতাবে দেখলাম ডিজিটাল ক্যামেরা কিনতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তিন কর্মকর্তা নাকি জার্মানি যাচ্ছেন! এমন কর্মকর্তা শুধু তারা তিনজন নন, খুঁজলে হয়তো আরও পাওয়া যাবে। এমন স্বার্থপর এবং লজ্জাহীন আমলাতন্ত্র দিয়ে আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করবেন আর দেশ থেকে সন্ত্রাস দূর করবেন, সেটা আশা করি বেশী বাড়াবাড়ি হয়ে যায়না?
ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, খেলার মাঠ অনেক ক্ষেত্রে আদর্শ নাগরিক তৈরিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আমাদের সন্তানদের আমরা কি পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ করে দিচ্ছি?। ঢাকার অধিকাংশ খেলার মাঠ, বাচ্চাদের খেলা-ধুলার অনুপযোগী। কারও এদিকে নজর নেই। যেদেশে গান, নাটক, সিনেমা, খেলাধুলা গুরুত্ব না পেয়ে ‘এ প্লাস’ হয়ে উঠে উন্নয়নের প্রধান সূচক সে দেশে অরাজকতা হবে, এটাই নিয়তি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







