গত ২৯ এপ্রিল সকালে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্তটি দিনমজুর হযরত আলী হ্নদয়ে পোষণ করলেও বিষয়টি ছোট্ট মেয়ে আয়েশার জানা বা অনুমান করার কোনো কারণ ছিল না। হয়ত পিতা মেয়েকে বলেছিল তাকে ট্রেন দেখাতে অথবা অন্য কোথায় বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে। সকালের নাস্তা শেষে মেয়েকে নিয়ে বের হয়েছিল পিতা হযরত। নিশ্চিত ছোট্ট আয়েশা বাবার কথামতো তার হাত ধরে বা পিছে পিছে হাঁটছিল। হয়ত বাবার নির্দেশে সে বাবার সাথেই ট্রেন লাইনে ঠাঁই দাঁড়িয়েছিল। এরপরের ঘটনা যা হবার তাই হয়। দ্রুতগামী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে দুটি অসহায় তাজা প্রাণ।
সকালেই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এ ঘটনার খবর। তবে গণমাধ্যমের কারণেই সবাই জানতে পারে এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। আর সেই ঘটনার পেছনে রয়েছে ন্যায়বিচার না পাওয়া, ক্ষোভ, অভিমান আর নিরাপত্তাহীনতা। গণমাধ্যমের নিবিড় অনুসন্ধানে আরও তথ্য দ্রুত সব তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। দিনমজুর হযতর তার মেয়ের অপমানের বিচার পাননি। তার সম্পদ চুরি হলেও বিচার পাননি। উল্টো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ যেখানে গিয়েছেন সেখানেই পেয়েছেন অবজ্ঞা, অপমান, গালমন্দ। দৃশ্যত এ সব কারণেই সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতি তীব্র ক্ষোভ সঞ্চারিত হওয়ায় প্রথম শ্রেণীতে পড়া মেয়েটিকে নিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি। আর এই আত্মহননে প্রধান মদদদাতা বলে চিহ্নিত হয়েছেন ফারুক নামের স্থানীয় এক বখাটে। যে বখাটে হযরতের মেয়ে আয়েশাকে কয়েক দফায় শ্লীলতাহনির চেষ্টা করে।
দুদিন আগে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনিও সাংবাদিকদের কাছে বলেন, এটি দুর্ঘটনা বলার কোনো কারণ নেই। ন্যায়বিচার না পাওয়ার কারণেই হয়েছে। তিনি আরও বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল যারা দীর্ঘদিন ধরে হযরত আলীর জমি দখলের চেষ্টা করেছিল, এবং যারা তার মেয়েকে লাঞ্ছিত করেছে তারা এ আত্মহত্যার জন্য দায়ী। জনপ্রতিনিধিদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, যাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। ফলে জনপ্রতিনিধিরা এ দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। আমি বলবো তাঁর পর্যবেক্ষণ যথার্থ।
আসলে যে ঘটনা ঘটেছে সেটি আমাদের গ্রামীণ সমাজের ভেতরের মুখোশ এবং অন্তর্গত যে দৈন্যতা রয়েছে সেটা খুব ভালোভাবে উন্মোচন করেছে। শ্রীপুরের গোসীঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুরের এই ঘটনাটিকে কোনোভাবেই ছোট করে, বাঁকা চোখে বা দেখেও না দেখার ভান করার অবকাশ নেই। গ্রামীণ সমাজে এ ধরনের দুরবস্থা, দুর্গতি অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান। শুধু সময়ের সাথে সাথে এর রূপ, চরিত্র পাল্টেছে। আর এই দুরবস্থা থেকে আমরা আজ পর্যন্ত বের হতে পারেনি। দিনমজুর হযরত আত্মহত্যা করে নিজে সমাজ সংসার থেকে পালিয়েছেন বা ক্রোধ মিটিয়েছেন তা নয়, প্রমাণ হয়েছে। একজন সমাজ অনুসন্ধিৎসুক হিসেবে মনে করি হযরত অপমান হতে হতে নিজেকে নিজেই হত্যার মধ্যে দিয়ে সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে তার প্রতিবাদটুকু জানিয়ে গেছেন। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি অনেক উন্নত দেশে আন্দোলকারীরা নিজেরাই গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে আত্মাহুতি দিয়ে রাষ্ট্রের সমাজের বড় ধরনের অন্যায়, অনাচারের প্রতিবাদ করে থাকে। ঠিক এমনটিই করেছেন দিনমজুর হযরত।
শ্রীপুরের গোসীঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুরের এই ঘটনাটিকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। পত্র-পত্রিকায় যে-সব অনুসন্ধানী রিপোর্ট ছাপা হয়েছে তাতে করে এটি স্পষ্ট যে, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজ কর্তৃক সঠিক বিচার এবং নিরাপত্তা না পাওয়ার কারণেই হযরত আলী ছোট মেয়ে আয়েশাকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন। চ্যানেল আই অনলাইনে ১ মে রিপোর্টার আরেফিন তানজীব তার অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলেছেন, স্থানীয় বখাটে ফারুক একাধিক বার শিশু আয়েশার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। ফারুকের চরিত্র ভালো না। নেশাখোর। শুধু কর্ণপুর বলে কথা নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব গ্রামেই ফারুকদের মতো নিকৃষ্টরা কমবেশি রয়েছে। যারা রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে দুনিয়ার কুকর্ম করে থাকে। যাদের কারণে দরিদ্র পরিবারের শিশু মেয়েদের বেড়ে ওঠাটা ভীষণরকম ভীতিকর অবস্থার মধ্যে ঘুরতে থাকে।
আসলে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই দরিদ্র, হতদরিদ্র, বিধবা পরিবারগুলো ফারুক নামের কীটদের দ্বারা আক্রান্ত। পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ফারুকরা যেমন বাড়িঘর দখল করতে চায়, তেমনি বিভিন্নভাবে তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয় পরিবারের মেয়ে শিশুরা। ছ্ট্টো আয়েশাকে যখন ফারুক নামের অমানুষেরা শ্লীলতাহানির পরিকল্পনা করে তখন আমাদের রাষ্ট্র, সমাজের বিকাশ কতোটা হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমাদেও উন্নয়নের বড়াইগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আবার বলি, কর্ণপুরে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি নতুন নয়। এর আগেও এরকম একাধিক ঘটনা অসংখ্য জায়গাতে ঘটেছে। কেউ প্রতিবাদ করেছে, কেউ করেনি। কেউ আবার নিরবে সহ্য করেছে। অনেকেই থানায় যাওয়ার সাহস পাননি। অনেক সময় থানা, চেয়ারম্যান, মেম্বররাও এসব ঘটনার মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আসলে আমরা অনেক কিছুতেই এগিয়ে গেলেও সমাজের দরিদ্র, সাধারণ মানুষের প্রতি অবজ্ঞা, অপমান- যেনো সেই আগের মতোই বিদ্যমান আছে। দৃষ্টিভঙ্গীর খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আসলেইতো দিনের পর দিন দ্বারে দ্বারে ঘুরেও অসহায় সাধারণ মানুষেরা ন্যায় বিচার পান না। নিরাপত্তা পান না। সংঘবদ্ধ হতে পারেন না। এ কারণেই দিনমজুর হযরত আলী নিজে নিজেই সেই প্রতিবাদটুকই করে গেছেন। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানও বলেছেন বিচার না পাওয়ার বেদনা থেকে হযরত মেয়েকে নিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন।

ধন্যবাদ যে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান সরিজমিনে গিয়ে বিষয়টি অনুসন্ধান করেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো বড় মাপের রাজনীতিবিদকে আমরা কর্ণপুরে যেতে দেখেনি। স্থানীয় সংসদ সদস্যরা গিয়েছেন বলে জানা নেই। তবে দাফনের দিন হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিল সেখানে, শেষবারের মতো হযরত আর তার মেয়ে আয়েশাকে এক নজর দেখার জন্যে। কিন্তু দুজনের শরীর ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে মরদেহ কাউকে দেখানো হয়নি।
এটি সত্য যে, আরেকটি বড় ধরনের ঘটনার পরই হয়ত আড়ালে চলে যাবে কর্ণপুরের ঘটনা। তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের উচিত হবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা, কেননা দিনমজুরের রক্তেরও দাম আছে। দিনমজুর হযরতের প্রতিবাদটা যেনো আমরা কোনোভাবেই ভুলে না যাই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








