এরশাদের জাতীয় পার্টি বর্তমানে জাতীয় তামাশায় পরিণত হয়েছে। তারা সরকারে থেকেও বিরোধী দল, আবার বিরোধী দলে থেকেও সরকারি দল। আলোচিত এই দলটিতে চলছে এখন তামাশা। যার যখন খুশি, যাকে খুশি বহিষ্কার করছে। আবার পাল্টা বহিষ্কারও হচ্ছে। সর্বশেষ এইচ এম এরশাদ তার ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করার এক দিনের মাথায় দলের একটি অংশ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছে।
গত সোমবার রাতে গুলশানে রওশনের বাসায় জাপার মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলু এই ঘোষণা দেন। বাবলু দাবি করেন, দলের সভাপতিমণ্ডলী ও সাংসদদের যৌথ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওদিকে রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। তিনি বলেছেন, যারা এই কাজটি করেছেন, দলের শৃঙ্খলা ভেঙেছেন, তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমাদের বৈচিত্রহীন রাজনৈতিক জীবনে জাতীয় পার্টির এই তৎপরতা নিঃসন্দেহে বিশুদ্ধ বিনোদন! এ ব্যাপারে অবশ্য জাতীয় পার্টিই একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়। এক্য-শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির ধারক ছাত্র ইউনিয়ন নামক ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটিও সম্প্রতি নগর সম্মেলনে কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে!
আমাদের দেশের রাজনীতি বর্তমানে ঝগড়া-মারামারি, কলহ-কোন্দল নির্ভর হয়ে পড়েছে। সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে কেবলই দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর সংঘর্ষের খবর। দলে দলে ঝগড়া, মারামারি; নেতায় নেতায় রেষারেষি, মারামারি; উপদলীয় কোন্দল, এই কোন্দলকে ঘিরে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। শুধু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যেই নয়; বিভিন্ন পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে, এমনকি ব্যক্তির মধ্যেও কলহপ্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পুরো দেশটাই বর্তমানে কলহ-কোন্দলের দেশে পরিণত হয়েছে।
জাতি হিসেবে আমরা কতোটা শান্তিপ্রিয় আর কতোটা কলহপ্রিয়- তা নিয়ে প্রশ্ন দেখ দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, বাঙালি চিরকালই নিরীহ, শান্তিপ্রিয়। সহজে এদেশের মানুষ মুখও খোলে না। প্রতিবাদও করে না। মেনে নিয়ে এবং মানিয়ে নিয়ে এদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে ঝগড়া-কলহ এড়িয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করার বিদ্যায় পারদর্শিতা দেখিয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, বাঙালি আসলে ভীষণ কোন্দলপরায়ণ, ঝগড়াটে জাত। এদেশের অধিকাংশ মানুষের পেটভর্তি হিংসা, মাথা ভর্তি জিলেপির প্যাঁচ। আরেকজনের সর্বনাশ কামনা করা ছাড়া অনেকেরই কোনো ধ্যান নেই। অন্যেরটা মেরে, আরেকজনেরটা ঠকিয়ে ছলে-বলে-কৌশলে নিজের আখের গোছানোর চেষ্টা ছাড়া অধিকাংশ বাঙালির কোনো সংকল্প বা জ্ঞান নেই।
অন্যের সঙ্গে তো বটেই, বাঙালি চিরকাল স্বজনদের সঙ্গেও পায়ে-পা দিয়ে ঝগড়া করে। কলহ-কোন্দল ছাড়া বাঙালির পেটের ভাত হজম হয় না, বাঁচতেও পারে না। আমাদের দেশের মানুষ সম্পর্কে এই উভয় ধরনের মত-ই সত্যি। এখানে নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ যেমন আছে, তেমনি আছে কলহপরায়ণ ঝগড়াটেও। তবে দিন দিন কী এক অজ্ঞাত কারণে এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকের সংখ্যাই বাড়ছে। স্বার্থপর, ঝগড়াটে হিংসুটে মানুষগুলো ক্রমেই সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে, ছাত্রসংগঠনে, পেশাজীবী সংগঠনে, প্রশাসনে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি মন্ত্রিপরিষদেও এখন কোন্দলপ্রিয় স্বার্থপর হিংসুটেদের ভিড়। এই মানুষগুলো কেউ কাউকে দেখতে পারে না, পছন্দ করে না। কেবলই একে-অপরকে ল্যাং মারার চেষ্টা, পারস্পরিক ধস্তাধস্তি। একে-অপরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা। বর্তমানে সবাই সবার প্রতিদ্বন্দ্বী। আওয়ামী লীগ-বিএনপি, ছাত্রদল-ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ-শিবিরের মধ্যেই শুধু নয়-আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রদল, বিএনপির সঙ্গে বিএনপিরও কলহ বাধছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন দল ও সংগঠনের মধ্যে ঝগড়া-কলহ তো রয়েছেই, দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বর্তমানে তীব্র হয়ে উঠেছে। অন্য দলগুলোর তুলনায় উপদলীয় কোন্দল প্রকট হয়ে উঠেছে জাতীয় পার্টিতে। তবে সরকারি দলেও কোন্দল কিছু কম নেই। প্রশাসন থেকে ব্যবসা, রাজনীতি-সবক্ষেত্রেই সরকার দলীয় নেতাকর্মী বা সমর্থকরা নিজেদের সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। সারা দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় সাংগঠনিকভাবে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরোধিতা করছে।
এমনকি এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিরুদ্ধে হামলা করতেও পিছপা হচ্ছে না। একই দলের রাজনীতি করা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। ক্ষমতার কেক-পিৎজার ভাগাভাগি নিয়েই এই কোন্দল বেশি হচ্ছে। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন, যতো মত ততো পথ। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে, যতো মাথা ততো মত। আর মত মানেই হচ্ছে মতপার্থক্য বা কোন্দল। আমাদের দেশে এখন কোনো বিষয়েই দুজন মানুষও একমত হতে পারে না।
সবারই আলাদা আলাদা মত বা মতাদর্শ আছে। একজনের মতের সঙ্গে আরেকজন কেবল দ্বিমত পোষণই করে না; নিজের মতকে যদি কেউ গ্রহণ করতে না চায় তবে তাকে খুন করতে পর্যন্ত উদ্যত হয়। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের বর্তমান বাংলাদেশে অসংখ্য মত, আর বিভিন্ন মতের অনুসারী অসংখ্য দল রয়েছে। এই দলগুলোর মধ্যে দলাদলি, ঝগড়া, গুঁতোগুঁতি লেগেই আছে।
এমনকি এক দলের মধ্যেও ঐক্য নেই। সেখানেও ঝগড়া-ফ্যাসাদ-কোন্দল। আমাদের দেশে এখন যতো মাথা ততো মত, ততো দল। আর দল মানেই হচ্ছে কোন্দল। দেশে বর্তমানে মত ছাড়া মানুষ নেই; কোন্দল ছাড়া দল নেই। কেউ কাউকে মানে না। সবাই সবার প্রতিযোগী, প্রতিদ্বন্দ্বী। আমরা সবাই রাজা- এই আদর্শ বর্তমানে আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
সবাই সবার রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। কেউ কাউকে কোনো বিষয়েই ছাড় দিতে চায় না। ফলে ঝগড়া-বিবাদ-মতানৈক্য, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে মতপার্থক্য বাড়ছে। দলে দলে শত্রুতা বাড়ছে। দলের মধ্যেও উপদলীয় কোন্দল বাড়ছে। হানাহানি বাড়ছে। বৃহৎ ঐক্য, জাতীয় ঐক্য তো দূরের কথা, বর্তমানে কোনো দলেই ঐক্য নেই। সবার সঙ্গে সবার অলিখিত শত্রুতা, ঝগড়া। মন্ত্রীতে মন্ত্রীতে দ্বন্দ্ব। এক মন্ত্রী আরেক মন্ত্রীকে সহ্য করতে পারছেন না। সুযোগ পেলেই একে অপরকে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন।
নেতায় নেতায়ও বিরোধ চলছে। দলের জুনিয়র নেতা সিনিয়র নেতাকে ল্যাং মারতে চাইছেন। আবার সিনিয়র নেতা জুনিয়রের গলায় পা রেখে চলতে চাইছেন। শুধু সিনিয়র-জুনিয়রই নয়, সিনিয়রের সঙ্গে সিনিয়রের, জুনিয়রের সঙ্গে জুনিয়রেরও লড়াই বাধছে। মন্ত্রী-মন্ত্রী সংঘাত, এমপি-মন্ত্রী সংঘাত, নেতায় নেতায় সংঘাত, নেতাকর্মীতে সংঘাত, এমনকি কর্মীতে কর্মীতেও সংঘাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বর্তমানে দলে দ্বন্দ্ব, মন্ত্রীপরিষদে দ্বন্দ্ব, প্রশাসনে দ্বন্দ্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বন্দ্ব, জোটে দ্বন্দ্ব, ছাত্রসংগঠনে দ্বন্দ্ব, আইনজীবী সংয়গঠনে দ্বন্দ্ব- সবখানে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। কারো মধ্যে সহিষ্ণুতা নেই, ধৈর্য নেই, নেই কোনো আদর্শ। সবাই শ্রেষ্ঠত্ব চায়, অর্থ চায়, ক্ষমতা চায়, নিরঙ্কুশ প্রভাব-প্রতিপত্তি চায়। এসব ক্ষেত্রে কেউ কোনো রকম ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে সবাই সবাইকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে। সুস্থ প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দেয়ার মানসিকতা কারো মধ্যে নেই।
এখন সবাই জয় চায়, কিন্তু কোনো রকম প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা চায় না। উন্নতি ও কল্যাণের জন্য দলের নেতাকর্মী তো বটেই, এমনকি বাপকেও গলা ধাক্কা দিতেও কেউ আর কসুর করছে না। নিজের আখের গোছানোর ক্ষেত্রে যে যাকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা পথের কাঁটা মনে করছে, সে তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাই তো ঝগড়া-বিবাদ, কলহ-কোন্দল ক্রমেই বাড়ছে।
নীতি-আদর্শহীন জীবন ও রাজনীতির চর্চা মানুষকে ক্রমেই পশুতে পরিণত করছে। অর্থ-ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার জন্য যে কেউ যে কারো প্রতিদ্বন্দ্ব এবং শত্রুতে পরিণত হচ্ছে। এক্ষেত্রে সতীর্থ, সহকর্মী এমনকি আত্মীয়তার বন্ধন পর্যন্ত মানুষকে মানবিক ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না। নিজের বৈষয়িক উন্নতির জন্য খুনি হতেও কেউ আর দ্বিধা বোধ করছে না। প্রত্যেকেই যেনো প্রত্যেকের অঘোষিত শত্রু। আর শত্রুর প্রতি বৈরিতা, তার অকল্যাণ বা সর্বনাশ কামনা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত দু-তিন দশক ধরে এদেশের মানুষগুলোকে যেভাবে লোভ আর হিংসার মন্ত্রে দীক্ষিত করা হয়েছে, যেভাবে ভোগবাদী ও স্বার্থপর হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে, তাতে করে আর যা-ই হোক, এদেশের মানুষের মধ্যে শান্তি, সহিষ্ণুতা, সহাবস্থান কিংবা সম্প্রীতি আশা করা যায় কি? আর তা যদি না যায়, তাহলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-কোন্দল নিরসনের উপায় কী? এ ব্যাপারে দেশের বুদ্ধিজীবীরা কী বলেন? দল-উপদল-কোন্দলই কি তবে আমাদের অনিবার্য নিয়তি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







