তুরস্কে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় আবারও রক্তগঙ্গা বয়ে গেল। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ এরদোগানের ১৩ বছরের শাসনে এতো রক্তাক্ত চ্যালেঞ্জ আগে হয়নি। মার্কিন-মিত্র কিন্তু ক্রমেই ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে মৌলবাদের দিকে ঝুঁকতে থাকা এরদোগান এই সেনা বিদ্রোহের জন্য দায়ী করেছেন মার্কিন প্রবাসী ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লা গুলেনকে।
যদিও জোরের সঙ্গে এই অভিযোগ অস্বীকার করে গুলেন বলেছেন, অতীতে আমি নিজেই সামরিক অভ্যুত্থানের শিকার হয়েছি। এই অভ্যুত্থানের নিন্দা করে তিনি উল্টো এরদোগানের বিরুদ্ধেই এই ‘সেনা-অভ্যুত্থান নাটক’ সাজানোর অভিযোগ এনেছেন।
তুরস্কে এই ব্যর্থ রক্তক্ষয়ী সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় অন্তত ২৭০ জনের প্রাণহানি ও প্রায় দেড় হাজার আহত হওয়ার পরে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে এরদোগান সরকারের প্রতি আক্রমণ। দুই শীর্ষ সেনা কর্তা আদেম হুদুতি ও অভনি আনগুনসহ ছয় হাজারের বেশি সেনাকে গ্রেপ্তার হয়েছে। শুধু সেনাবাহিনীই নয়, বিচারবিভাগেও গণহারে বরখাস্ত করা হচ্ছে। সেনা অভ্যুত্থানে টালমাটাল হয়ে ওঠা দেশকে সামলে নিয়েই বিচার বিভাগ থেকে গুলেনের সব অনুগামীকে রাতারাতি সরিয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান।
এ পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৭৪৫ জন বিচারককে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারও করে নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর যে কর্তারা অভ্যুত্থানের চেষ্টায় যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ, তাদেরও বরখাস্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বরখাস্ত এবং গ্রেপ্তার হওয়া উচ্চ পদাধিকারীদের মধ্যে তুরস্কের সর্বোচ্চ বিচারবিভাগীয় কর্তৃপক্ষ হাই কাউন্সিল অফ জাজেস অ্যান্ড প্রসিকিউটরস-এর পাঁচ সদস্যও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
কিন্তু কারা এই অভ্যুত্থান ঘটালো, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। ধারণা করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে পুঞ্জীভূত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বিদ্রোহে। বিদ্রোহীরা শুক্রবার রাতে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। তখন ‘ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ, মানবাধিকার, আইনের শাসন’ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল তারা। তুরস্কের সেনাবাহিনীর অতীত ঐতিহ্যে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য তৎপরতা এমনকি অভ্যুত্থানের ইতিহাসও রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে তা সত্য কিনা, তা নিয়ে সংশয় যথেষ্টই।
তুরস্কের সেনা অভ্যুত্থান নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা বিভ্রান্তি। দেশে দেশে ক্যু হয় সাধারণত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের জন্য। তুরস্কে সেই চেনা ছবিটা যেন কিছুটা অন্যরকম। ইতিহাস বলে, এখানে সেনাবাহিনী গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী। রাষ্ট্রের জনক মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক ১৯২৩ সালে যে আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন, সেই আদর্শের অভিভাবক বলে মনে করে নিজেদের। আতাতুর্কের আদর্শ এবং গণতন্ত্রের বিচ্যুতি ঘটছে বলে এর আগে সেনাবাহিনী ৪টি সফল ক্যু করেছে।
শুধু তাই নয়, অভ্যুত্থান না ঘটিয়েও বিভিন্ন সময়ে কলকাঠি নেড়ে শাসনক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে অনেক রাজনৈতিক নেতাকে। এবারও সেনাবাহিনী দাবি করেছে, দেশে গণতন্ত্র, শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করতেই এই অভ্যুত্থান। প্রেসিডেন্ট এরদোগান কট্টর ইসলামপন্থী বলে পরিচিত। তুরস্কের গোড়া মুসলিমদের পছন্দের নেতা। এই জনপ্রিয়তার জোরে প্রথম থেকেই তিনি সেনাবাহিনীকে আদর্শগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছেন।
‘ব্যর্থ অভ্যুত্থানের’ নেপথ্যে ঠিক কারা রয়েছেন তা নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে। কেউ বলছেন, আরও ক্ষমতা পেতে প্রেসিডেন্ট এরদোগান গোপন অভিযান চালিয়েছেন। অনেকের অভিমত, চতুর এরদোগান সেনাবাহিনীর অনুগত অংশকে ব্যবহার করে কৌশলে গুলেনবাদীদেরকে দিয়ে এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ঘটনা সাজিয়েছে। তারা জানতো এ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। মূলত সেনাবাহিনী থেকে গুলেনবাদীদের নির্মূল করাই ছিল এ প্রচেষ্টার লক্ষ্য।
শুক্রবার রাতেই তুর্কি প্রেসিডেন্ট তার সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘This uprising is a gift from God to us because this will be a reason to cleanse our army’ অর্থাৎ, ‘এই অভ্যুত্থান হচ্ছে আমাদের ওপর আল্লাহর দান, কারণ এটি হবে আমাদের সেনাবাহিনীকে পরিষ্কার করার একটি সুযোগ’।
এই সুযোগ ব্যবহার করে কতোজন সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে এবং কতোজনকে চাকরিচ্যুত করা হবে, তার প্রকৃত হিসেব আদৌ কখনও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এরদোগানের কথা ও কাজ থেকে তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে উঠছে, আর সেটি হচ্ছে তুর্কি রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষেত্র থেকে রিপাবলিকানদের সরিয়ে তার অনুগত ইসলামিস্ট লয়ালিস্টদের বসানো। তিনি আসলে মুস্তাফা কামালের প্রতিষ্ঠিত রিপাবলিক অফ টার্কিকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ টার্কি’তে পরিণত করতে চান।
কিন্তু ইসলামিক রিপাবলিকও হয়তো তার শেষ লক্ষ্য নয়। হয়তো তিনি শেষ পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের মতো একটি খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন।
তুরস্কে এরদোগানের একনায়কতন্ত্রী চেহারা মাঝে মাঝেই বড় হয়ে উঠেছে। গণআন্দোলনও সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু শক্তি দিয়ে তিনি তা দমন করেছেন। সেনাবাহিনীকে অনুগত বানানোর কাজে তিনি গত কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৩ সালে তার পার্টির বিরোধিতা করার জন্য তিনি ১৭ জন বর্ষীয়ান সেনা কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন জেলে পাঠিয়েছেন। এছাড়াও কয়েকশো সরকারি অফিসার, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক নেতা তার রোষের শিকার হয়েছেন। গেজি পার্কে সবুজ ধ্বংস করে নির্মাণকাজের বিরোধিতাকে কড়া হাতে দমন করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছেন, শপথ করেছেন টুইটারকে মুছে দেবেন। তার জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে বিলাস-আয়োজনও।
রাজধানী আঙ্কারায় বানিয়েছেন হাজার ঘরের প্রেসিডেন্ট–প্রাসাদ। আকারে আয়তনে যা হোয়াইট হাউস বা ক্রেমলিনকেও ছাপিয়ে যায়। দেখেশুনে অনেকে সমর্থক তাকে সুলতান নামে ডাকতে শুরু করেছিলেন। ফের তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের গৌরব নাকি ফিরিয়ে আনবেন, একথাও শোনা গেছে। ২০১৪ থেকে কমতে থাকে দেশের বৃদ্ধির হার, বাড়তে থাকে বেকারি। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দুর্নীতি। জড়িয়ে পড়েন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠরা। সঙ্কট বাড়ছে দেখেই কী তিনি এমন একটা ‘সাজানো নাটকের’ আশ্রয় নিলেন?
তুর্কি সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টিতেও এরদোগানেরও দায় আছে। সিরিয়ার লড়াইয়ে দ্বৈতনীতি তার অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রম তৈরি করেছে। সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে তিনি বাসার আল-আসাদ বিরোধী শক্তিকে সমর্থন করেন। এই সময়ে তুরস্ক জিহাদিদের প্রিয় গন্তব্য হয়ে ওঠে। তখন আইএসে যোগ দেওয়ার প্রধান রাস্তা হয়ে যায় তুরস্ক। আইএস অর্থ সংগ্রহের প্রধান হাতিয়ার তেল বিক্রি করতো তুরস্কের মাধ্যমে।
আবার আমেরিকা জোটের চাপে নিজের বিমানঘাঁটি আমেরিকাকে ব্যবহারের অনুমতি দেয় আইএসের বিরুদ্ধে। আইএস বিরোধী লড়াইয়ে কুর্দি যোদ্ধাদের কোবানেতে যাওয়ার অনুমতি দেয় তুরস্ক। আবার তুর্কি সরকারের বিরুদ্ধে কুর্দিদের রয়েছে ৩০ বছরের অবিরাম যুদ্ধ। সেই সূত্রে মিশরে মুরসির ক্ষমতাচ্যূতি এবং রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে কুর্দিদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়। তার জেরে দক্ষিণ-পশ্চিমের কুর্দি বিছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন এরদোগান। কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আঙ্কারা, ইস্তাম্বুলে পাল্টা হামলা চালায়। অন্য দিকে আইএসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় তারাও ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে হামলা করে ৪২ জনকে হত্যা করে।
এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থায় এরদোগান আবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল-আসাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হয়। পাশাপাশি রাশিয়া ও মিশরের দিকেও বন্ধুত্বের হাত বাড়াবেন বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এ রকম পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর ভিতরে হতাশা তৈরি হয়। আর হতাশ সেনাবাহিনী সব সময় বিপদজনক। তবে অভ্যুত্থানটি ব্যর্থ হওয়ার এও একটি কারণ যে, সংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বিশাল তুর্কি সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যের সমর্থন এই অভ্যুত্থানে ছিল না। ছিল না বলেই এই অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। আর তুরস্কের সাধারণ মানুষ প্রবল সেনা-বিরোধী। তাদের সেই সেনাবিরোধী মনোভাবই শেষ পর্যন্ত এরদোগানকে আপাতত ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখল।
প্রশ্ন হলো, এত কিছুর পরও এরদোগান এত জনপ্রিয় কেন? কেন রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ তার পক্ষে জীবন বাজি রেখে লড়ছে? তারা কী এরদোগানকে চেনেন না? জানেন না?
পৃথিবীর ইতিহাস লিখে জয়ীরা, তবে পৃথিবীর বেশির ভাগ ইতিহাসের আসল জন্মদাতা পরাজিতেরা। ১৯৩৮ সালে টাইম ম্যাগাজিন অ্যাডলফ হিটলারকে ‘ম্যান অফ দা ইয়ার’ নির্বাচন করে। সেই হিটলারকে আজ ইতিহাস মনে করে খলনায়ক। যে এরদোগানের পক্ষে তুরস্কের মানুষ জয়ধ্বনি দিচ্ছে, তুর্কি গণতন্ত্রের ‘ত্রাতা’ মনে করছেন, সেনা ট্যাংকের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে, তিনি ইতিহাসের নায়ক না খলনায়ক, তা ইতিহাসই বিচার করবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







