প্রায় পুরো পরিবারের সঙ্গে লড়াই করে ঢাকায় এসেছিলাম পড়তে। ভাইয়া কানের কাছে কী এক মন্ত্র দিয়েছিলেন কে জানে! যেনো ঢাকায় এলেই আমার মুক্তি। না এলে মরণ ছাড়া উপায় নাই!
যাক, ঢাকায় পড়তে চাওয়া মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাওয়া। এসএসসি এবং এইচএসসিতে গড়পড়তা রেজাল্ট। ও দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া খুব কঠিন। ভর্তি পরীক্ষায় খুব ভালো করতে হবে। যেহেতু মরিয়া, সেহেতু সুযোগ হয়ে গেলো।
শৈশব-কৈশোরকে পেছনে ফেলে এসে পড়লাম রাজধানীতে। কিন্তু থাকবো কোথায়? ঢাকায় থাকার মতো একমাত্র স্থান মামার বাসা। মামী এবং তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে তার দেড় রুমের বাসা। এই মামা আম্মার খালাতো ভাই। তবে আমাদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ। সেখানেই এসে উঠলাম। বাসা ছিলো আগারগাঁও এলাকায়।
ইউনিভার্সিটি থেকে যাতায়াত রিক্সায়। বাসে ওঠার কথা প্রথম কয়েক দিন ভাবিনি। ক্লাসে আসা-যাওয়া করি কিন্তু মনমরা থাকি। ভাইয়া জিজ্ঞেস করেন, সমস্যা কী? বলি, এভাবে কতদিন থাকবো? যদিও মামার বাসায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমার কথায় ভাইয়া তার বন্ধু-বান্ধবী, সহপাঠীদের কাছে খোঁজ খবর করেন, হলে সিট পাওয়া যায় কীভাবে।
ভর্তির সময় ভাইয়া চাচ্ছিলেন, রোকেয়া হলে যেন এটাচমেন্ট পাই। রোকেয়া হলে এটাচমেন্ট চাওয়ার কারণ হলো, তার পরিচিত বেশ কয়েকজন রোকেয়া হলে থাকেন। তাদের সুবাদে আমারও হলে ওঠা সুবিধা হতো।
আমার এটাচমেন্ট হলো শামসুন নাহার হলে। ভাই-বোন দুজনেরই মন খারাপ। যেহেতু হলের এটাচমেন্ট আমাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না সেহেতু মন খারাপ করা ছাড়া আমাদের কিছু করার ছিলো না।
কয়েকদিনের মধ্যে ভাইয়ার পরামর্শে ক্লাসের আগে-পরে হল অফিসে ঘুর ঘুর করা শুরু করলাম। যা জানলাম, কয়েক মাসের মধ্যে হলে থাকার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর সম্ভাবনা নেই। হলের দারোয়ান, কেরানি পর্যায়ের কর্মীদের কাছ থেকে এই তথ্য জেনেছি। হাউস টিউটরদের নাগাল পাওয়া আকাশের চাঁদ পাওয়ার সমান। তারা অনেক ব্যস্ত (!) থাকেন দিনভর। গাঁও গেরাম থেকে আসা আনস্মার্ট মেয়েদের কথা শোনার সময় নেই তাদের।
হলে সিট পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে কয়েক মাস লাগবে, তাহলে যারা ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে পড়তে, যাদের ঢাকায় বাসস্থান নেই, সেই ছেলেমেয়েরা ক্লাস করছে কীভাবে? আর হলে ওঠার দেরী হলে বাসস্থানের ব্যাবস্থা না করে আগেই ক্লাস শুরু কেন? আমার মনে ঘুরপাক খাওয়া এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য কেউ বসে নেই।
আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনো ছাত্রীদের বেসরকারি আবাসনগুলো অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করেনি। আমাকে বলেই দেয়া হয়েছে, কোন ছাত্রী হোস্টেলে থাকা যাবে না।
আমি টের পেতাম ভাইয়া তার পরিচিত, বন্ধু সাংবাদিক, ছাত্র নেতাদের মধ্যে বেশ খোঁজ খবর করছেন কীভাবে আমার থাকার ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু বিষয়টার সুরাহা হচ্ছিলো না।
ভাইয়ার এক ছাত্রনেতা বন্ধু একদিন আমাকে তার নাম বলে হাউস টিউটরের সঙ্গে কথা বলতে বললেন। সেই ছাত্রনেতার কথায় অনেক সাহস সঞ্চার করে একদিন হাউস টিউটরদের রুমে হাজির হলাম। কিন্তু উপস্থিত হাউস টিউটররা সেই বড়ভাইকে চিনলেনই না। সিটের বিষয় বুঝতে পেরে বললেন, নোটিশ বোর্ডে খেয়াল রাখবা। কবে সিট দেয়া হবে সে বিষয়ে নোটিশ দেয়া হবে। এখন নতুন ছাত্রীদের সিট দেয়া হচ্ছে না।
তবে সেই কথাগুলো আমি যেভাবে বললাম, তারা সেভাবে সোজা কথায় বলেননি। সেদিনের আগে কারো মুখের কথায় আমার চোখে পানি আসেনি। গোবেচারা আমি এর আগে ধারণা করতে পারিনি, মানুষের মুখের কথা এতো ধারালো হতে পারে! পরে জেনেছি, আমার কপাল আামকে ওই হাউস টিউটরের সামনে নিয়ে গিয়েছিলো, খারাপ আচরণের জন্য যিনি অনেক আগেই নামডাক অর্জন করেছেন।
হলের বাইরে আসার পর আমার চেহারা দেখে ভাইয়া হতাশ এবং চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ভাইয়ার এক বান্ধবী ছিলেন সঙ্গে, তিনি আমাদের কাণ্ড দেখে হতবাক। ভাইয়া বললেন, ও সহজে কান্নার মেয়ে না। এমন কিছু হয়েছে যেটা খুবই ভয়ানক।
এর কয়েকদিন পরে ছাত্রলীগের এক নেত্রীর কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন ভাইয়ার সাংবাদিক বন্ধু, যিনি ভাইয়ার কয়েক বছরের সিনিয়র। ছাত্রলীগের সেই নেত্রী বললেন, তিনি ওই হলের কোন ছাত্রীকে দিয়ে দ্বৈতাবাসের অনুমতিপত্র নিয়ে দিতে পারবেন। তবে ওই ছাত্রী যেহেতু অনার্স পরীক্ষার্থী, সে আমাকে তার সঙ্গে রাখতে রাজি হবে না।
হলে ওঠার তাগিদে তাতেই রাজি হলাম। পরদিন হলে গিয়ে ওই বড় আপার সঙ্গে দেখা করে চিঠি আনলাম। তাতে হলের ভেতরে যাতায়াতের পথ সুগম হলো। কিন্তু থাকার ব্যবস্থা হলো না। সে সময়ে ভাইয়াদের মাস্টার্স পরীক্ষা চলছে। আমার হলে ভাইয়ার যে বান্ধবী থাকতেন তিনি আশ্বাস দিলেন, পরীক্ষা শেষ হলেই তিনি সিট ছেড়ে দেবেন, তখন আমি সেখানে উঠতে পারবো। পরীক্ষা চলাকালে আমাকে নিতে পারছেন না কারণ তার সঙ্গে ছোট বোন থাকে।
এর মধ্যে ছাত্রদলের এক নেত্রীর সঙ্গে ভাইয়ার আরেক পরিচিতের মাধ্যমে যোগাযোগ হলো। তিনি আমাকে একটা ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাস দিলেন। আশ্বাসমতো, ক্লাস শুরুর তিন মাসের মাথায় হলে উঠলাম। মামার বাসা থেকে অল্প কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ৩০০৭ নাম্বার রুমে গেলাম। ওই রুমে সেই নেত্রী নিজেই থাকতেন। প্রথম বর্ষের আরেকজন ছাত্রীর সঙ্গে থাকতে দেয়া হলো। বললেন, কয়েক দিন এখানেই থাকো। পরে তোমাকে আরেক রুমে পাঠাবো।
সপ্তাহখানেক পর তিনি আমাকে ১১১১ নাম্বার রুমে নিয়ে গেলেন। রুমের অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আবিষ্কার করলাম, আমিসহ ৭ বাসিন্দা প্রথম বর্ষে পড়ে। একজন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সিট সংখ্যা সেখানে ৪। প্রতি সিটে দুজন থাকার ব্যবস্থা। আমাকে দেয়া হলো দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীর সঙ্গে দ্বৈতাবাসের সুযোগ।
হলে তো উঠলাম, এখন আমার শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা! আমাকে দ্বৈতাবাসের অনুমোদন দিলো ছাত্রলীগ আর সিট বরাদ্দ দিলো ছাত্রদল। ছাত্রলীগের নেত্রীর সঙ্গে হাই হ্যালো করতে হয়। আবার ছাত্রদলের জুনিয়র নেত্রীরা আমাকে মিছিলে ডাকে। আর আমি কোনমতেই মিছিলে যাবো না।
ওই সময়ের মানসিক অবস্থা বর্ণনা করার মতো নয়। সকাল সকাল ক্লাসের জন্য বেরিয়ে যাই, ফিরি সন্ধ্যা করে। ছাত্রদলের নেত্রী নোট দিয়ে যান। পরদিন মিছিলে যেতে হবে। আমি করিডোরে সামনে পড়ে গেলে বলি, বাড়ী থেকে আত্মীয় এসেছিলেন, তার সঙ্গে বাসায় গিয়েছিলাম। একেক দিন একেক অজুহাত।
কয়েক মাস এভাবে যেতে যেতে সিট বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে বলা হলো হল অফিস থেকে। আবেদন করলাম। যাদের দ্বৈতাবাস অনুমোদন আছে তারা আগে বরাদ্দ পাবে। আর নাম্বারের দিক দিয়ে যারা এগিয়ে তারা সিট পাবে সবার আগে।
সিট বরাদ্দের জন্য দিন নির্ধারণ করে নোটিশ বোর্ডে তালিকা টানানো হলো। আমার জন্য নির্ধারিত দিনে হাউস টিউটরদের সেই কক্ষে হাজির হলাম। ওই সাক্ষাতের পর আর ওমুখো হইনি। আমার আবেদনপত্র দেখে হাউস টিউটর অবাক! তুমি অনার্স বিল্ডিং এ থাকো? তার প্রশ্ন অমূলক নয়। অনার্স বিল্ডিং এ প্রতি কক্ষে একজন ছাত্রী থাকার নিয়ম। সেখানে দ্বৈতাবাসের অনুমতি নেই।
পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। অনুরোধ করলাম ৪০১২ নাম্বার কক্ষে থাকার অনুমোতি দিতে। কারণ ততোদিনে ভাইয়ার বান্ধবীর পরীক্ষা শেষ। চোখ বড় বড় করে তারা সব শুনলেন। আমাকে কিছু বললেন না। নতুন করে সিট বরাদ্দ দিলেন। সিট বরাদ্দ মানে হলো ওই আপুর ছোট বোনের সঙ্গে থাকার অনুমতি।
পরের বছর হল থেকে নিয়ম করা হলো, ভর্তি পরীক্ষার স্কোরের ভিত্তিতে সিট বরাদ্দ দেয়া হবে। দ্বৈতাবাসের অনুমোদন প্রথা বাতিল করা হলো।
হল ছাড়ার দুই দশক হতে বছর দুই বাকি। হলের সিট পাওয়া নিয়ে এই দীর্ঘ আলাপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরুণের মৃত্যুর সূত্র ধরে। যে দীর্ঘদিন ধরে গণরুম নামক যন্ত্রণার মধ্যে বাস করতো।
ভর্তির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো অচেনা জগতে কখনো অসহায় বোধ করিনি, বড় ভাইয়ের ভরসায়। কিন্তু বেশীরভাগ ছাত্রছাত্রীর তো ভরসার সেই জায়গা নাও থাকতে পারে। তাহলে এসব শিক্ষার্থীদের ভরসা দেবে কে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








