উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনের দিনে সিনেট ভবনের বাইরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। কেবলমাত্র শিক্ষক প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত এ কমিটির প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ নানা শাস্তির খড়গ নেমে আসতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
একই সঙ্গে অবিলম্বে ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন এবং সহকারী প্রক্টর রবিউল ইসলামের পদত্যাগসহ চার দফা দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে ‘ডাকসুর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের’ ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এ দাবিসহ বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরেন তারা।
তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আন্দোলনকারীদের সমন্বয়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মাসুদ আল মাহদী লিখিত বক্তব্যে বলেন: যেহেতু হামলাকারী শিক্ষরা প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আগে থেকে থেকেই শিক্ষার্থীদের দোষী করে বক্তব্য দিয়ে আসছেন এবং তদন্তের আগেই শিক্ষার্থীদের দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেছেন; তাই স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এটি একটি প্রহসনের তদন্ত হবে।
‘ফলে এই কমিটি থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন আশা করা বাতুলতা।’
আন্দোলনকারীরা প্রথমে গেটের বাইরে অবস্থান নিলে আগে থেকেই গেটের ভেতরে অবস্থান নেওয়া শিক্ষকরা আন্দোলনকে ‘পাগলামি’ আখ্যায়িত করে গেটের বাইরে থেকে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেন দাবি করে তিনি বলেন: আমাদের ইচ্ছা ছিল, বিশেষ অধিবেশন চলাকালীন সিনেটের সামনে দাঁড়িয়ে মুখে কালো কাপড় বেঁধে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করা।
‘কিন্তু তারা কোনভাবেই আমাদের কথায় কর্ণপাত না করায় আমরা গেটের তালা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করি। তখন সহকারী প্রক্টর রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে, মাহমুদুর রহমান বাহলুল, মিনা মাহবুব, এমআইএস বিভাগের প্রভাষক রাকিবুল হাসানসহ উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা আমাদের ওপর হামলা করেন।’
তবে শিক্ষকরা দাবি করেছেন কোন হামলার ঘটনা ঘটেনি। আন্দোলনকারীরা গেট ভেঙে তাদের ঠেলে ভেতরে যেতে চাইলে তারা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন।
আন্দোলন কি কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই?
আন্দোলনকারীদের মধ্যে বহিরাগতসহ সাবেক অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন এবং অনেকেই বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী-এমন অভিযোগ রয়েছে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে। এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা জানতে চাইলে আন্দোলনের সমন্বয়কারী বলেন: যারা আন্দোলনে গিয়েছিলেন তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারেই গিয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকে হয়তো বিভিন্ন ছাত্র-সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তারাও তো শিক্ষার্থীই। আর সাবেক যদি কেই আমাদের সঙ্গে গিয়েও থাকেন যেতে পারেন। কারণ সাবেকদের যে ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি না থাকার প্রতিবাদ তারাও করতে পারেন।
শুধুমাত্র উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের সময়ই আন্দোলন কেন?
শুধুমাত্র উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের সময়ই তাদের আন্দোলন। কিন্তু একই সংখ্যক সিনেট সদস্য নিয়ে বাজেট অধিবেশনও হয়েছে। তার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের দেখা যায়নি কেন?
এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ আল মাহদী বলেন: আমরা বাজেট অধিবেশনেও প্রতিবাদ করতে চেয়েছি। কিন্তু তখন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় আমরা তাদের সংগঠিত করতে পারিনি।
তাদের এ আন্দোলন চলমান জানিয়ে তিনি বলেন: শিক্ষার্থী অধিকার মঞ্চ নামে আগেও একটি প্লাটফর্ম ছিল ডাকসুর দাবিতে। তারা ডাকসু নির্বাচন চায় এমন ১২ হাজার শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করে প্রশাসনকে দিলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। সুতরাং আমাদের আন্দোলন আগেও ছিল, এখনও চলমান।
চার দফা দাবি:
সংবাদ সম্মেলন থেকে চার দফা দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দাবিগুলো হচ্ছে ১. অবিলম্বে ডাকসু নির্বাচন, ২. শিক্ষার্থী প্রতিনিধিসহ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন, ৩. হামলায় নেতৃত্ব প্রদানকারী সহকারী প্রক্টর রবিউল ইসলামের পদত্যাগ এবং ৪. সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনা।
কর্মসূচী:
‘হামলার প্রতিবাদে’ এবং ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে ২ আগস্ট অপরাজেয় বাংলার সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডাকসু নির্বাচন কার্যকর করার লক্ষে আগামী ১০ আগস্ট মধুর ক্যান্টিনে একটি উন্মুক্ত আলোচনার উদ্যোগ গ্রহনের কথা বলেছেন আন্দোলনকারীরা। যেখানে স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠনগুলো ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনকে আমন্ত্রণ জানাবেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী।
শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নির্বাচনের লক্ষ্যে সিনেট সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে শিক্ষার্থী এবং গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি না থাকার প্রতিবাদে এবং ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে সিনেট ভবনের বাইরের ফটকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়। এক পর্যায়ে তারা সিনেট ভবনের বাইরের ফটক ভেঙে ভেতরের ঢুকতে চাইলে এবং কিছু শিক্ষক তাদের বাধা দিতে গেলে হাতাহাতি এবং ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
রোববার ওই ঘটনা তদন্তে কমিটি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তিন সহকারী প্রক্টরের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ফজলুর রহমানকে। কমিটির অপর দুই সদস্য হচ্ছেন রসায়নের অধ্যাপক আফতাব আলী শেখ এবং ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মাকসুদুর রহমান।








