কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপসাংবাদিকতার অভিযোগ এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধন থেকে বক্তারা দাবি করেছেন; বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ফের উপাচার্য না হলে তার ব্যক্তিগত কোন ক্ষতি নেই, ক্ষতি বিশ্ববিদ্যালয়েরই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থেই তাকে প্রয়োজন।
ওই মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করতে পারলে দেশকে অস্থিতিশীল করা যাবে। তাই গত সাড়ে আট বছর যাবত উপাচার্য হিসেবে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রেখে আসা আরেফিন সিদ্দিককে সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন গুটিকয়েক শিক্ষক। আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিও কিছু সংবাদমাধ্যমের সহায়তায় সে সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।
বুধবার দুপুরে অপরাজেয় বাংলার সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এ মানববন্ধনে অংশ নেন বিপুল সংখ্যক সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহিদ খানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক মফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ মানবববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ, আওয়ামী লীগ এবং বাম দল সমর্থিত নীল দলের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয় কারিগরী সমিতির নেতৃবৃন্দ।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোঃ রহমত উল্লাহ বলেন: বিশ্ববিদ্যালয় যখন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা একটি গোষ্ঠীর সহ্য হচ্ছে না। তাই তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।কয়েকটি মিডিয়াকে ব্যবহার করে উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ ছাপিয়েই তারা ক্ষান্ত থাকেনি, আদালত পর্যন্ত গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বর্তমানের উপাচার্যের আমলে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছেন তাদের প্রতি প্রশ্ন রেখে আইন অনুষদের এ ডিন বলেন: যারা শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রশ্ন তুলছেন, আমি জানতে চাই আপনাদের যোগ্যতা কী? কোন যোগ্যতায় আপনার নিয়োগ পেয়েছিলেন তা জাতির সামনে প্রকাশ করুন।
‘‘একজন শিক্ষক শুরুতেই অধ্যাপক হয়ে যান না। তাকে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে, যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই প্রমোশন পান। আপনারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাদেরকে নিরুৎসাহী করতে।’’
একাধিক গণমাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের প্রতি ইঙ্গিত করে শিক্ষক সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক এজেএম শফিউল আলম ভূইয়া বলেন: আপনারা শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু একবারও বলছেন না যে বিগত আট বছরে কতজন শিক্ষক অবসরে গিয়েছেন? যুগের চাহিদা অনুযায়ী চালু হওয়া নতুন নতুন বিভাগগুলোর জন্য শিক্ষকের প্রয়োজন ছিল কি না। তা না করে আপনারা ‘সরবারহ করা’ দিয়ে একপেশে সংবাদ পরিবেশন করছেন; যেখানে অভিযুক্তের বক্তব্য পর্যন্ত নেই।
‘‘রিপোর্টগুলো পড়ে মনে হচ্ছে রিপোর্টারকে চোথা সরবারহ করা হয়েছে এবং বাসায় ডেকে এনে তাকে দিয়ে লেখানো হয়েছে।’’
এই ধরনের অপসাংবাদিকতায় কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সাংবাদিকতাও আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং ফটোগ্রাফি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শফিউল আলম ভূইয়া।
বর্তমান সিনেটের অন্যতম এ সদস্য দাবি করেন, অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক কখনওই ফের উপাচার্য হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেননি। সিনেটররাই সর্বসম্মতিক্রমে তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন।
‘‘সিনেট অধিবেশনের আগ পর্যন্ত অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক কখনও পুনরায় উপাচার্য হওয়ার ইচ্ছা পর্যন্ত প্রকাশ করেননি। সিনেটরদের মনে হয়েছে তিনি বিগত বছর যেভাবে দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছেন, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থেই তাকে উপাচার্য হিসেবে রাখা দরকার। তাই তাকেসহ তিনজনকে মনোনয়ন দিয়েছে সিনেট।’’
নীল দলের সাবেক আহ্বায়ক এবং রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক নাজমা শাহীন বলেন: আমি যখন ছাত্রী ছিলাম তখন ক্যাম্পাসে দেখেছি অস্ত্রের ঝনঝনানি, দেখেছি চার বছরের সম্মান শেষ করতে ৭-৮ বছরও লেগে যেত। বর্তমান উপাচার্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেগুলো মোকাবেলা করে ক্যাম্পাসের সুষ্টু পরিবেশ বজায় রেখেছেন। কিন্তু কিছু মিডিয়া ক্যাম্পাসের ইস্যুগুলোকে আংশিক বা ভুলভাবে উপস্থাপণ করে তাকে হেয় করতে চাইছে।
তিনি বলেন, অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক শুধু একজন ব্যক্তিই নন একটি প্রতিষ্ঠান। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মানে পুরো দেশের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র।
বিশ্ববিদ্যালয়কে সন্ত্রাস ও সেশনজটমুক্ত রেখে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার কৃতিত্ব বর্তমান উপাচার্যকে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জন কর্মকার বলেন: ৮০’র দশকে আমরা যখন ছাত্র ছিলাম আমাদের প্রত্যাশা ছিল সন্ত্রাস ও সেশনজট মুক্ত একটি ক্যাম্পাস। অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক যখন ক্যাম্পাসকে আমাদের সেই কল্পনার জায়গায় এনে পুরোপুরি সন্ত্রাস ও সেশনজট মুক্ত করে সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে চলেছেন তখন তাকে সরানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে একটি গোষ্ঠী। তারা জানে আরেফিন সিদ্দিককে সরানো গেলে বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশকে অস্থিতিশীল করা যাবে।
সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। 
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিকের ব্যক্তিগত সততা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দক্ষতার প্রশংসা করে মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক অসীম সরকার, মুহসীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া, স্যার এএফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ আফতাব উদ্দিন খান, কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাবিতা রিজওয়ানা রহমান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাদির জুনাইদ, সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস ও সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান প্রমুখ।
প্রতিবাদে সংহতি সাংবাদিকদেরও:
‘অপসাংবাদিকতার’ প্রতিবাদে আয়োজিত এ মানববন্ধনে সংহতি জানান বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরাও। বক্তব্য দেন এনটিভির বিশেষ প্রতিনিধি আহমেদ পিপুল, দ্য ডেইলি স্টার’র সিনিয়র রিপোর্টার হাসান জাহিদ তুষার, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সংবাদ পাঠক এবং উপস্থাপক ফারাবী হাফিজ, যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেন প্রমুখ।








