ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ আঘাত হেনেছে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম সহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে দেখানো হয়েছে ১০ নং মহাবিপদ সংকেত। এছাড়া মংলা ও পায়রা বন্দরের জন্য ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেয়া হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে, ইতোমধ্যে ঘুর্ণিঝড় মোরার আঘাতে শ্রীলংকায় ২০১ নিহত, ১ লাখ গৃহহীন, ১০০ জনের অধিক নিঁখোজ। এখন বাংলাদেশের দিকে আরো শক্তি সঞ্চয় করে ধেয়ে আসছে। এতে করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সহ উপকূলবাসীর মনে বিরাজ করছে চরম শঙ্কা, ভয়। উপকূলবাসীদের মধ্যে যারা ঢাকায় অবস্থান করছেন তাদের মাঝেও বিরাজ করছে সীমাহীন শঙ্কা, অজানা আতঙ্ক।
এমনই একজন হলেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার বাসিন্দা মো: শাহজাহান কুতুবী। ব্যবসার খাতিরে এখন ঢাকায় থাকলেও তার মন পড়ে আছে নিজ এলাকায়। মহাবিপদ সংকেতের খবর শোনার পর থেকে তীব্র অস্থিরতার মধ্যে আছেন বলেই জানালেন শাহজাহান। বলছেন- “১৯৯১ এর ভয়াবহতার চিত্র চোখে ভেসে উঠছে বারবার। খুব ভয় হচ্ছে! আল্লাহ সবাইকে রক্ষা করুন।”
বিগত বছরগুলোতে বড় বড় সংকেত দিলেও ১০ নং মহাবিপদ সংকেত দেয়নি। এবার তা আসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগে অধ্যয়নরত কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা আফসানার মনে ভীষণ ভয় কাজ করছে। বলছেন, “পরিবারের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। আল্লাহকে ডাকছি সবসময়। সবাইকে তিনিই নিরাপদ রাখতে পারেন!”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মায়ক্রোবায়োলজি বিভাগের ছাত্র সাকিবুর রাহাতও সদরের বাসিন্দা। তিনি বলছেন, “বড় হয়েছি কক্সবাজারে। আত্মীয়, এলাকাবাসী মানুষের সাথে, অজস্র আবেগ জড়িয়ে আছে।”
“আজকে যখন বিপদ সংকেতের কথা শুনলাম, চমকে উঠলাম। কেমন আছে সবাই? এখন কী অবস্থা আবহাওয়ার? তীব্র উদ্বেগ নিয়ে প্রতিটি মুহূর্তের খোঁজ নিতে মন চাচ্ছে । এতো দূরে আছি, কিছু করারও নেই!”
মহাবিপদ সংকেতে মনের কি অবস্থা জানতে চাইলে আশঙ্কার কথাই জানালেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী কক্সবাজারের ছেলে রুকুনুজ্জামান সায়ীদ। বলছেন, “অবশ্যই অনেক চিন্তা হচ্ছে কারণ আগে কখনও এরকম অবস্থায় পরিবারের বাইরে থাকা হয় নি। একটু পর পর বাসায় ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছি সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা, কিন্তু তারপরেও তো নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। এখন এটুকুই প্রার্থনা যেনো কোন ক্ষতি না হয়, আল্লাহ সবাইকে নিরাপদে রাখুন।”
ঢাবির মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ছাত্র মহেশখালীর বেলাল সজীব বলছিলেন, “কখনো কোন ঘূর্ণিঝড়ের কবলে না পড়লেও আব্বুর মুখ থেকে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সেই ভয়াবহতা, লাশের পর লাশ পড়ে থাকা সবই শুনেছি। আজ সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেল। জানি না কি ঘটে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা ব্যতিত কিছু করতে পারছি না এই মুহুর্তে!”
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা আব্দুর রহমান। পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে। প্রকৃতির আক্রমণের ভয়াবহতার কথা ভেবে তিনি চমকে উঠছেন। দ্বীপা এলাকায় হওয়ায় তার মধ্যে ভয়টা বেশি। “প্রতিমুহুর্তে খবর নিচ্ছি কি অবস্থা। বাড়িতে অনেক শিশুরা আছে। বৃদ্ধ বাবা-মা। সবাইকে নিয়ে ভীষণ শঙ্কিত আমি!”
কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী উম্মে কুলসুম শম্পা তার ফেসবুকে কক্সবাজারের অবস্থা লিখেছেন,“শহরে নীরব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে বারবার। তবে এখনো খুব সিরিয়াস কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না!”
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শামিম হোসেন মিজি তার ফেসবুকে একটি সতর্কতামূলক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “বঙ্গোপসাগরের সাইক্লোন পর্যবেক্ষণ করে storm2k নামক একটি সাইট, যেটি পরিচালিত হয় শীর্ষ আবহাওয়াবিদ ও সাইক্লোন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা। তারা বিশ্বের সব বড় সাইক্লোনগুলোই পর্যবেক্ষণ করেন। বলতেই হবে যে এই ঘূর্ণিঝড়কে তারা যতটা গুরুত্বের সাথে দেখছে দীর্ঘদিন বঙ্গোপসাগরের অন্য কোন ঘূর্ণিঝড়কে এতোটা গুরুত্বের সাথে দেখেননি।”
তিনি লিখেছেন, গত ছয় ঘন্টা যাবত বাংলাদেশের জন্য যতোটুকু খারাপ হতে পারতো ততোটুকুই হয়েছে। এর কেন্দ্র ৯১ পশ্চিম এর কাছে, মায়ানমারে আঘাত হানার মত যথেষ্ট পূর্বে নেই। অবস্থা ক্রমশ গুরুতর হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যতোটা বলা হয়েছে এটা তার চেয়েও অনেক বড়। এই তৃতীয় ফ্যাক্টরই ব্যাপক পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতির কারণ হবে। যদি এর তীব্রতা না কমে যায় তবে এর ভয়াবহতা কমপক্ষে ১৯৮৫ এর ঘূর্ণিঝড় এর মতো হবে। পানির উচ্চতা ১০ ফুট হতে পারে যার কারণে ব্যাপক প্রাণক্ষয়ের আশঙ্কা রয়েছে যদি না এখানকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদস্থলে সরিয়ে নেয়া হয়।
শামিম মিজি স্ট্যাটাসে বলছেন, আমরা অনেকেই ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছি এই ভেবে যেহেতু বিগত কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি তাই এটাতেও হবে না। কিন্তু এমনটি ভেবে নিলে মারাত্মক ভুল হবে বলছেন তিনি। তিনি এব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে বলছেন।
কক্সবাজারের বাসিন্দা কিন্তু চাকরির সুবাদে চট্টগ্রামে থাকেন খালেদ শোয়াইব। তিনি ফেসবুকে সর্বশেষ খবর লিখেছেন, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বৃষ্টি হচ্ছে না বললেই চলে। ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর। বৃষ্টি সাধারণত ঘূর্ণিঝড়কে দুর্বল করে দেয়। সিডরের সময়ও ১০ নম্বর বিপদ সংকেত দেখানো হয় নি। কাজেই বুঝাই যাচ্ছে বেশ বড়সড় একটা কিছুই আঘাত হানতে যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় আপনার পরিবারের সদস্য বা চেনা কেউ যদি শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে বসবাস করে না, তাহলে তাদের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়ের জন্য দ্রুত চলে যেতে বলুন।








