গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে অবকাঠামো গড়ে উঠেছে তা প্রশংসনীয়। কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফলাফল মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করতে পারলে সেখানেই ৬০ থেকে ৭০ ভাগ রোগীর মানসম্মত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব।
এজন্য উপজেলা, ইউনিয়ন এবং কমিউনিটি ক্লিনিক গুলোতে রোগীর সেবার মানের মৌলিক পরিবর্তন আনা সুপারিশ করা হয়েছে।’বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ নির্ণয়ে করা গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
রোববার বিকেলে রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও ‘ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে গবেষণার উপস্থাপনের সঙ্গে ছয়টি সুপারিশ তুলে ধরেন আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক উপ-কমিটির সভাপতি ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডাঃ আ ফ ম রুহুল হক।
তিনি বলেন, ‘উপজেলা হাসপাতালের পদ থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগ পদগুলো খালি থাকে। স্থানীয়ভাবে শুন্য পদগুলোতে সাথে সাথে নিয়োগ দেয়া সম্ভব, অনেক দেশেই এই ব্যবস্থা আছে। আমাদের জন্য কোন ব্যবস্থাটি সঠিক তা নির্ধারণ করতে হবে। হাসপাতালের ভর্তি রোগীরা প্রায় সকল ঔষধ বিনা পয়সায় পেয়ে থাকে কিন্তু বর্হিবিভাগ রোগীদের জন্য ঔষধ বরাদ্দ খুব কম এ বিষয়ে পরির্বতন আনতে হবে।

এছাড়া নানাবিধি অসুবিধার কারণে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালে অনেক বেশি রোগীর ভিড় থাকায় রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না। উপজেলা হাসপাতালে রোগীরা ডাক্তার পায়না, ঠিকমত ওষুধ পায়না, ফলে তারা জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করে। যে কারণে এসব হাসপাতালে এক সাথে অনেক রোগী থাকায় আমরা মানসম্মত চিকিৎসা সেবা দিতে পারছে না।
জনগনের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুণর্গঠন জরুরী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে উন্নয়ন হয়েছে তা একটি মাইল ফলক। অর্থনৈতিক সু-ব্যবস্থাপনা দ্বারা দেশ এগিয়ে গেছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেড়েছে, কৃষিতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের সাথে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অনেক উন্নতি সাধিত হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে আমাদের স্বাস্থ্য সেবা সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছে না। তাই স্বাস্থ্য সেবার মান নিয়ে জনগনের অভিযোগ থেকেই যাচ্ছে।
এসময় স্বাস্থ্য ব্যবস্বাপনার পূণর্গঠনের ছয়টি সুপারিশ তুলে ধরেন আ ফ ম রুহুল হক।
১. আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় পদ সৃষ্টি করা হলেও সে অনুযায়ী জনবল নেই, অব্যবস্থ্যাপনা শুরু হয়েছে এখানেই। জনবলের নিয়োগের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সঠিক সময়ে নিয়োগ দেওয়া হয় না। জনবল (ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিকস, ল্যাব-টেকনিশিয়ান) নিয়োগের ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণ না করলে এই অব্যবস্থাপনার সমাধান হবে না। বিকেন্দ্রীকরণের ধাপ নিয়ে আলোচনা ও গবেষণা করে নির্ধারিত করতে হবে।
২. চিকিৎসা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নবীন চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার তৈরী করার জন্য চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে চার ভাগে বিন্যাস করতে হবে। যেমন: চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্যবিদ বা রোগ প্রতিরোধক। এই চার ভাগের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে সে তার ভবিষ্যৎ কার্যপরিধি নির্ধারণ করবে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অংশ গ্রহন করবে।
৩. চিকিৎসা সেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়ে রোগীরা উপজেলা ও জেলা ভিত্তিক ইনডোর স্বাস্থ্যসেবা পেতে ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম চালু করতে হবে এবং অপেক্ষাকৃত জটিল রোগের জন্য উপজেলা থেকেই জেলা, বিভাগীয় ও বিশেষায়িত হাসপাতাল গুলোতে রেফারেল সিস্টেমের মাধ্যমে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয় ব্যবস্থাপনা ও মেরামতের জন্য রোগীর সেবা ব্যাহত হয়। এই ব্যবস্থার সুষ্ঠুপরিচালনা করতে হলে মেরামতের ব্যবস্থার জন্য অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করে দ্রুত সময়ে সকল যন্ত্রপাতি মেরামত করতে হবে এবং এই ব্যবস্থাকে মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। এর জন্য বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে।
৫. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা হাসপাতালের পরিবেশ উন্নতির জন্য অপরিহার্য। বাস্তব রোগী এবং রোগীদের সাথে আত্মীয় স্বজনের কথা চিন্তা করে সে অনুযায়ী টয়লেট ও পরিচ্ছন্ন কর্মী নিয়োগ ও তদারকির জন্য জনবল জরুরী।
৬. হাসপাতালের সেবা সর্ম্পকে তথ্য প্রদানের এবং তত্বাবধায়নের জন্য মানবিক জ্ঞান সম্পপূর্ণ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। এরা রোগীদের সাথে ‘পাবলিক রিলেশন’ এর ভুমিকা পালন করবে।
দেশের সকল জনগণের জন্য সর্বজনীন চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করণের জন্য এবং একই সাথে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চিহ্নিত ত্রুটি সমূহ বিজ্ঞান সম্মত ও আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণে যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে আমাদের দেশের জনগনের উপযোগী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুর্ণগঠনের জন্য একটি কমিটি গঠন করে সকলের অংশগ্রহনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী।সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী বলেন, আমাদের সামগ্রিক যে সক্ষমতা আছে, তাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যন্ত ভালোভাবে চলছে।
বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।








