পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু নিহত হওয়ার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি’র বিরুদ্ধে ‘ক্র্যাকডাউন’ শুরু করেছে পুলিশ। প্রথম রাতের অভিযানে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ঢাকা ও রাজশাহীতে তিন জেএমবি সদস্য নিহত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাবুল আক্তারের জঙ্গিবিরোধী অভিযানগুলো মাথায় রেখে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে মিতু হত্যাকাণ্ডের পেছনে জেএমবি থাকতে পারে।
‘আমরা জেএমবিসহ অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোকে এই বার্তাটা দিতে চাই যে একজন
কর্মকর্তার স্ত্রীকে হত্যা করে তারা যদি মনে করে পুলিশ সদস্যদেরকে ভয় পাইয়ে
দেয়া যাবে তাহলে তারা ভুল করবে,’ এমন মন্তব্য করে গোয়েন্দা পুলিশের এক
শীর্ষ কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বরং তাদের বিরুদ্ধে অভিযান আরো
জোরদার হবে এবং প্রথম রাতের অপারেশনের পর তারা সেটা আরো ভালো করেই বুঝতে
পারছে।
তবে, জেএমবির ভেতরে এখন জামায়াত-শিবিরও সক্রিয় বলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন।
রাজশাহীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে জেএমবি সদস্য জামালউদ্দিনের গ্রেফতারের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পেরেছে, ছয় মাস আগে আত্মঘাতী হামলা পরিচালনা করা জামালের সহযোগী তারেক আজিজ ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত ছিল। পুলিশের হাতে আটক তারেকের মা তসলিমা বেগম জানিয়েছেন, তারেকের বাবা আবু সালেকও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
‘মিতু হত্যাকাণ্ডে জেএমবি জড়িত কিনা’ এমন প্রশ্নের উত্তরে জেএমবিবিরোধী অভিযান শুরুর আগে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার গণমাধ্যমকে বলেন: শিবিরের একটি অংশ পর্যায়ক্রমিকভাবে জেএমবিতে যোগদান করে, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা খতিয়ে দেখছি। সবকিছু সন্দেহের তালিকায় আছে।
জঙ্গিবিরোধী অভিযানের একরাত
এরপর রাতেই বিভিন্ন জায়গায় জেএমবিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। রাজধানীর পল্লবী এলাকার কালশীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় তারেক হোসেন মিলু ওরফে উসমান ও সুলতান মাহমুদ ওরফে রানা ওরফে কামাল, আর রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর চাপড়া এলাকায় নিহত হয় জামালউদ্দিন।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযানে যারা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে তারা সকলেই নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি’র সদস্য।
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, অভিযানে নিহতরা বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ করেছে। সংখ্যালঘুদের জীবন রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণ করতেই টার্গেট কিলিং-এর পথ বেছে নিয়েছে জঙ্গিরা।
সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিতরাও জঙ্গিদের টার্গেট হচ্ছেন।
ঢাকায় নিহতদের পরিচয় জানিয়ে মনিরুল ইসলাম দাবি করেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিম হত্যা ও দিনাজপুরের কাহারোলে জঙ্গি হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিল জয়পুরহাটের জেএমবি নেতা তারেক হোসেন মিলু ওরফে উসমান। আর বগুড়ায় শিয়া মসজিদের হামলায় নেতৃত্ব দেয় দিনাজপুরের ভয়ংকর জঙ্গী সুলতান মাহমুদ ওরফে রানা ওরফে কামাল।
তবে, এসপির স্ত্রী হত্যাকাণ্ড এবং জঙ্গিবিরোধী নতুন অভিযানের মধ্যে কোনো সম্পর্কের কথা উল্লেখ না করে তিনি বলেন, চট্রগ্রামে এসপির স্ত্রী হত্যার তদন্তেও সহায়তা করছে কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট।
জেএমবির পেছনে জামায়াত-শিবির
একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পেছনে জঙ্গিদের বিশেষ মোটিভ রয়েছে উল্লেখ করে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট প্রধান এও বলেন, দেশে জঙ্গি তৎপরতার পেছনে জামায়াত-শিবিরের সরাসরি হাত রয়েছে।
একইরকম ইঙ্গিত দিয়েছে রাজশাহীর পুলিশ।
প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাগমারার আহমদিয়া মসজিদে জুমার নামাজের সময়
আত্মঘাতি বোমা হামলায় তারেক আজিজ নামে এক জঙ্গি নিহত হয়। পরে তারেকের সহযোগী
জামালকে ধরিয়ে দিতে ১ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে রাজশাহী জেলা পুলিশ।
সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজশাহী পুলিশের একটি
দল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাবুডাইং এলাকা থেকে জামালকে গ্রেফতার করে।
তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গোদাগাড়ীর ফরাদপুরে অভিযান চালানোর জন্য যাওয়ার
সময় বন্দুকযুদ্ধে জামাল নিহত হয়।
এর আগে বাগমারার মসজিদে আত্মঘাতি বোমা হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জামাল পুলিশকে জানায়, আত্মঘাতী তারেক চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রূপনগর গ্রামের আবু সালেকের ছেলে। সে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলো।
তার বক্তব্যের সূত্র ধরে রাতেই অভিযান চালিয়ে পুলিশ তারেকের মা তসলিমা বেগমকে আটক করে। তসলিমা বেগম দাবি করেন, তার ছেলে শিবির এবং স্বামী জামায়াতের সঙ্গে জড়িত ছিল, জেএমবির কথা তিনি জানতেন না। তার ধারণা, ছেলের কিডনির চিকিৎসার জন্য টাকা দেওয়ার কথা বলে হয়তো তারেককে দলে ভিড়িয়েছিল জেএমবি।







