২২ মে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং করণীয় নির্ধারণে দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৩ সালের শেষদিকে ২৯ ডিসেম্বর নির্ধারণ করলেও পৃথিবীর অনেক দেশে ঐ সময়ে সরকারি বন্ধ থাকায় ২০০০ সালে ২২ মে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস হিসাবে পুননির্ধারণ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। মূলত; ১৯৯২ সালের ২২ মে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত জীববৈচিত্র্য বিষয়ক কনভেনশন-এর দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে নির্বাচন করা হয়।
পৃথিবীতে অসংখ্য জীব রয়েছে, সকল জীবের সম্মিলনই জীববৈচিত্র্য, মানুষও এর বাইরে নয়। তবে গ্রামীণ বিভিন্ন পেশার মানুষ ও তাদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে জাতিসংঘ এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘মূলধারায় জীববৈচিত্র্য, মানুষ ও তাদের জীবিকা’।
প্রাণ ও প্রকৃতির ভিত্তি হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। মানুষ, কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সবক্ষেত্র, যেমন কৃষিকাজ, বনায়ন, মৎস্য সম্পদ, পর্যটনের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি রোধ করার অর্থ হচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষা ও ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিনিয়োগ করা।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ২০১৬ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত ১৫ বছর মেয়াদী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নামে বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ। এসজিডি’র ১৫নং উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃতি ব্যবস্থাপনার টেকসই ব্যবহারকে উৎসাহ ও সুরক্ষা প্রদান, বনসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও মরুময়তা প্রতিরোধ, বনজ সম্পদের সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বন্ধ করা’। এ লক্ষ্যমাত্রার অধীনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির আলোকে ২০২০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য বেশ কয়েকটি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন:
– বন, নিম্নাঞ্চল, মরু অঞ্চল ও পাহাড়সহ ভূ-উপরিভাগের সুপেয় পানির আঁধারগুলোকে সংরক্ষণ; ক্ষতিগ্রস্তগুলোকে পুনর্প্রতিষ্ঠা ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা,
– সব ধরণের বন উজার প্রতিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত বন পূনর্বনায়নসহ বনাঞ্চল বৃদ্ধি করতে টেকসই ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন করা
– জাতীয়-আঞ্চলিক সব উন্নয়ন পরিকল্পনা ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে অন্তর্ভূক্ত করা এবং
– ঝুঁকিপূর্ণ ও বিলুপ্তির শিকার প্রাণী রক্ষা ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ
পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য কয়েকটি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন:
– মরুকরণ, খরা, বন্যা ও ভূমি ক্ষয় রোধ করাসহ মরুকরণ প্রতিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি পুনরুদ্ধার এবং
– টেকসই উন্নয়ন ও সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে পর্বতের প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ
এসডিজিতে আরও কয়েকটি লক্ষ্যমাত্রায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। যেমন: ২ নং লক্ষ্যমাত্রায় টেকসই কৃষি, ৬ নং লক্ষ্যমাত্রায় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা, ৭ নং লক্ষ্যমাত্রায় টেকসই আধুনিক জ্বালানি ও শক্তি, ৮ নং লক্ষ্যমাত্রায় টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ৯নং লক্ষ্যমাত্রায় টেকসই শিল্পায়ন ইত্যাদি।
টেকসই কৃষি মানে ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিকমুক্ত প্রাকৃতিক কৃষি ব্যবস্থা, যা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জরুরি। পানি জীববৈচিত্র্যের প্রধান উপাদান। সুতরাং, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা করবে। টেকসই জ্বালানি মানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। এক্ষেত্রে পানি ও বায়ুনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত এবং কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ পরিবেশবিধ্বংসী কার্যকলাপকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়ন মানে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও শিল্পায়ন।
জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার অর্থ সব প্রাণীর বেঁচে থাকার নিরাপদ পরিবেশ। জীববৈচিত্র্য পানি, মাটি, বনজ সম্পদের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। পানি ছাড়া সব প্রাণই অচল। পানি মানে ভূ-উপরিভাগ (পুকুর, লেক, খালবিল, নদীনালা, সাগর ও মহাসাগর), ভূগর্ভ ও বৃষ্টির পানি। এর মধ্যে ভূ-উপরিভাগের সব পানিতেই মাছসহ নানারকম জীব বাস করে। পানি পুষ্টির অন্যতম প্রধান উপাদান মাছেরও বিচরণক্ষেত্র এবং ৩০০ কোটি মানুষের ২০ ভাগ প্রোটিন মাছ থেকে পাওয়া যায়। পানি দূষিত হওয়া মানে মাছসহ পানিনির্ভর জীবের বাসস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। কারণ, দূষিত পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে কোনো জীবের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হয় না। যেমন: দূষণের শিকার বুড়িগঙ্গায় কোনো মাছ বা জলজ প্রাণী নাই।
বৃষ্টির পানি ভূ-উপরিভাগের জলাশয় ধারণ করে, তার কিছু অংশ ভূগর্ভে যায় – যা উত্তোলন করে মানুষ পানযোগ্য পানি পায়। জলাশয় ভরাট হয়ে গেলে ভূগর্ভে পানি যেতে পারে না। ফলে প্রতিবছর পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে দেশের অনেক জেলায় পানীয় জলের সঙ্কট দেখা দেয়। পানি, বায়ু ও খাদ্যের উপর নির্ভরশীল পৃথিবীর সব মানুষ। কিন্তু জীবিকা নির্বাহের হিসাব ধরলে মৎস্য আহরণ ও কৃষিজ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে প্রায় ২৬০ কোটি মানুষ জড়িত। আমরা যা খাই, তার ৮০ ভাগ কৃষিজ পণ্য থেকে আসে।
জীববৈচিত্র্যের আরেকটি প্রধান ক্ষেত্র বন। ৮০% স্থল প্রজাতির প্রাণী বনে বসবাস করে। ৮৩০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ৮% বিলুপ্ত এবং ২২% বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ৭ কোটি আদিবাসীসহ প্রায় ১৬০ কোটি মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল। তবে গাছ থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেন বিবেচনায় নিলে পৃথিবীর সব মানুষই গাছ তথা বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল। জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন রোধেও গাছের ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীতে ৮০ হাজার প্রজাতির গাছের মধ্যে মাত্র ১ ভাগ গাছের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে গবেষণা রয়েছে। এছাড়া বর্তমান বিশ্বে গ্রামে যারা বসবাস করে, তাদের প্রায় ৮০ ভাগ ভেষজ ঔষুধ ব্যবহার করে, যার উৎস মূলত বনজ সম্পদ।
বাংলাদেশে নানা কারণে জীববৈচিত্র্য হুমকিগ্রস্ত। আগ্রাসী ও ভুল উন্নয়ন নীতি যেমন দায়ী, তেমনি মানুষের লোভনীয় দৃষ্টিভঙ্গিও দায়ী। ভুল নীতির কারণে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ঢাকার পাশ্ববর্তী নদীগুলোর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাশয়গুলো দখল ও ভরাট হয়ে ভবন বা সড়কে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক প্রজাতির দেশি মাছ দ্রুত কমছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি আটকে রাখায় বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী, খালবিল শুকিয়ে যায়। যা শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ও পানিনির্ভর জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্যের প্রধান স্থান সুন্দরবন, যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বনের অভ্যন্তরে নানারকম জীবের (পশু-পাখি ও সরিসৃপ) বসবাস। সুন্দরবনে এমন অনেক মাছ পাওয়া যায়; যা দেশের অন্যত্র পাওয়া যায় না। অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সুন্দরবন রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। কিন্তু সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপাল-এ সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকার যদিও বলছে, সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায়ভার কে নেবে? বিদ্যুৎ আমাদের দরকার; কিন্তু সেটা পরিবেশ, জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নয়। সুন্দরবন বাংলাদেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যার দ্বিতীয়টি তৈরি করা যাবে না। তাই এটি রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পরিবেশ, জনস্বাস্থ্যের উপর জন্য মারাত্মক হুমকি তামাক চাষের প্রভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত। তামাক চাষে কীটনাশক ও সার প্রয়োগ করতে হয় বেশি। এসব কীটনাশক পানির সঙ্গে মিশে নদীতে পড়ছে ও মাটির নীচে যাচ্ছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের নদীগুলোতে মাছসহ জলজ প্রাণী ও কেঁচোসহ মাটির প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নির্বিচারে বৃক্ষনিধন হচ্ছে।
এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে প্রতিবছর যে হারে বনজ সম্পদ কমছে তার ৩০ ভাগ তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তামাক কোম্পানিগুলো তাদের অপকর্ম আড়াল করতে ইপিল ইপিল, ইউক্যালিপটাস বা একাশিয়া জাতীয় দ্রুতবর্ধনশীল ও ভিনদেশী গাছ লাগায়। এসব গাছ মাটি থেকে বেশি পানি শোষণ করে এবং এগুলো বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব গাছ নয়।
জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় দেশের সব জলাশয়কে দখল ও দূষণের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি নদীসহ জলাশয়গুলোর পানিধারণ ক্ষমতা বাড়াতে ড্রেজিংসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ সবরকম প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার পরিমিত করতে হবে। কারণ, এসব সম্পদের উৎপাদনে পানি ব্যবহৃত হয়। টিস্যু ও কাগজের পরিমিত ব্যবহার করতে হবে। বর্ষায় দেশজ (ফলজ, বনজ ও ঔষধী) গাছ লাগাতে হবে। পলিথিন-প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার বর্জন এবং পাট-বাঁশ-বেতজাতীয় পণ্য ব্যবহারে মনোযোগী হতে হবে।
জীববৈচিত্র্য বলতে সবরকম জীব অর্থাৎ উদ্ভিদ, প্রাণী ও অনুজীবের সমষ্টি এবং সম্মিলিতভাবে এদের সৃষ্ট প্রতিবেশকে বোঝানো হয়। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের জীবনযাপনে বিলাসিতার আধিক্য ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে। পরিবেশবান্ধব বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ে তুলতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা জরুরি। এজন্য সবাইকে দায়িত্বসচেতন হবে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







