১৯৭৫ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শোকাবহ-মর্মান্তিক এই দিনে জাতীয় চার নেতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা কাউসার চৌধুরী।
নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী সেই ঢাকা কারাগারের সামনে দাড়ানো একই ধরনের তিনটি ছবিও পোস্ট করেন তিনি। সাথে ‘জাতীয় চার নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা’ শিরোনামে কাউসার চৌধুরী লিখেন,
“৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কারাগারের অভ্যন্তরে একটি সুনির্দিষ্ট সেল-এ
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরই এক-গোত্রীয় পাষণ্ডরা আমাদের জাতীয় চার নেতাকে কাপু্রুষোচিতভাবে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ধ্বিক জানানোর মতো ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি।
জাতীয় চার নেতার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
১৯৯৭ সালে (সম্ভবত) আমরা গিয়েছিলাম ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে। এই বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য একটি প্রামাণ্য-অনুষ্ঠান নির্মাণের চিত্র ধারণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। আমি ছিলাম ওই অনুষ্ঠানের ক্যামেরাম্যান। খ ম হারূন ছিলেন অনুষ্ঠান প্রযোজক এবং আবেদ খান ছিলেন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। সুপন রায় ছিলেন এই অনুষ্ঠানের অন্যতম গবেষক।
“ঘটনার আড়ালে” নামের এই অনুষ্ঠানের চিত্রধারণের জন্য আমরা গিয়েছিলাম সেই কামরায়, যেখানে আমাদের জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আমিই প্রথমে ওই কামরায় প্রবেশ করি শুন্য-কামরাটির একটি আবহ তৈরীর নিমিত্তে শট নেবার জন্য।
তখন দুপুর প্রায় ১২-টা।
চারিদিকে কেমন জানি শুনসান নিরবতা! লোহার গরাদের বাইরে সবাই তখন অপেক্ষা করছে। আমি ওঁদের দিকে পিঠ রেখে শট নিচ্ছি। শট শেষে কায়দা করে সবার দৃষ্টির আড়ালে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দম নিয়ে পঁচাত্তরের সেই রাতের আবহটি উপলব্ধি করার চেষ্টা করলাম। বিশ্বাস করবেন কীনা জানিনা; স্পষ্ট ‘হেলোসিনেশনের’ মত আমি চারজন মহান মানুষের বিরুদ্ধে অসভ্য বুলেটের চীৎকার শুনতে পেলাম। কল্পনায় দেখি, রক্তের ধারা চুইয়ে পড়ছে ফ্লোরের এপাশ থেকে ওপাশে। কাপুরুষেরা আরো এক দফা ব্রাশ ফায়ার করলো চার নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করতে। তারপর এক অদ্ভুত নিরবতা। এরপর বুটে শব্দ তুলে কাপুরুষেরা চলে গেল দূরে।
হয়তো ঠিক এভাবেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল সেদিন; কিংবা অন্যকোনভাবে।
কিন্তু ঘটেছিল ঠিকই! বড়ো বেদনা হয় বুকের বাম পাশে। ফুসফুসের খুব গভীর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
……… ‘ওদের’ ষড়যন্ত্র কিন্তু থামেনি আজও!
১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পনের পর; রাত ৮-টার দিকে বিবিসি কিংবা সংবাদ সংস্থা সিবিএস পাকি-জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে জিজ্ঞেস করেছিল- “তোমার সৈনিকেরা তো আত্মসমর্পন করলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলো। কেমন লাগছে তোমার”? খুব শীতল কন্ঠে ইয়াহিয়া জবাব দিয়েছিলেন, “জং জারী রহেগা………”!
আমরা একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে যুদ্ধ সমাপ্ত করেছি। কিন্তু পাকিস্তানি এবং তাদের ‘এ-দেশীয় দোসর’দের যুদ্ধ এখনো থামে নি! আজও তাদের যুদ্ধ “জারী’ রয়ে গেছে।
অতএব, অনেক সাবধানে এগুতে হবে।
অনেক ধৈর্য, শক্তি আর সাহস নিয়ে।
আপনাদের সকলের জয় হোক।
——————————————————
ছবিটি সুপন রায়ের তোলা (১৯৯৭ সালে সম্ভবত)।”






