সিনেমায় তার কণ্ঠ ব্যবহার করে অনেক শিল্পী হয়েছেন সাধারণ থেকে সুপাস্টার। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা অর্জন। অথচ তিনি এমনই একজন শিল্পী যিনি রয়েছেন পর্দার আড়ালে। সিনেমার ডাবিং আর্টিষ্ট (বাচিক শিল্পী) আনোয়ার শাহী। ১৯৯৫ সালে অভিনেতা হতে এসে কীভাবে হয়ে গিয়েছেন ডাবিং আর্টিষ্ট। ডাবিং আর্টিষ্ট হিসেবে পরিচিতি পেলেও তিনি একজন অভিনেতা, নৃত্যশিল্পীও বটে। এ পর্যন্ত ২ হাজারেরও বেশি সিনেমায় ডাব করা এই শিল্পী চ্যানেল আই অনলাইনকে জানিয়েছেন তার লোকচক্ষুর আড়ালের এই জগতের কথা।
সিনেমায় ডাবিং আর্টিষ্ট কেন হলেন?
আসলে আমি যে ডাবিং আর্টিষ্ট হব, সেটা কখনো ভাবতে পারিনি। কিন্তু ঘটনাক্রমে হয়ে যাওয়া। আমি ঢাকা শহরে ১৯৯৫ সালে এসেছিলাম অভিনেতা হতে। সে সময়ের নির্মাতা আজমল হুদা মিঠুর দুই ছেলের অভিনয়ের শিক্ষক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করি। এসময় মিঠু ভাই ‘অপরাধ জগতের বাদশা’ নামের একটি ছবি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। সেখানে তার দুই ছেলেই অভিনয় করেছিল। সে ছবিতে আমাকে একটি চরিত্র করতে বলেন। আমি সেখানে সংসদ সদস্যে ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছি। ছবির দৃশ্যধারণ শেষে মিঠু ভাই বললেন, ছোট ছেলের কণ্ঠের ডাবিং করতে। ওনার কথামতো তা করি।’ এরপর ছবি মুক্তির পর নির্মাতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি সেসব সিনেমার আর্টিষ্টদের ডাবিংয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। আমিও কোনোটাই মানা করিনি। এভাবেই আসলে শুরু হয় আমার ডাবিং আর্টিষ্ট হিসেবে পথ চলা।
এটাতো অফট্র্যাকের একটা পেশা, পরিবার থেকে কোনো বাঁধা আসেনি?
এটাকে আসলে পেশাও বলা যাবে না। আমি তো অভিনেতা হতে এসেছিলাম। রাজশাহীতে যখন নাট্যদলের হয়ে কাজ করি তখনই বাবা আমার বিরোধী ছিলেন। মা আমাকে খুব সমর্থন করতেন। প্রথম যেদিন রাজশাহীর একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় আমার ছবিসহ খবর আসে, তখন মা অনেক আগ্রহ ভরে বাবাকে তা দেখিয়েছিলেন। তারপর থেকে অবশ্য বাবা খুব বেশি উচ্চবাচ্য করেনি আমার ব্যাপারে।

ডাবিং করার সময়টার কথা বলুন।
ডাবিং করার আগে আমাকে পুরো চরিত্রটি বোঝার জন্য স্ক্রিপ্টটা দেওয়া হয়। তারপর চরিত্রের ধরণ বুঝে দৃশ্য অনুসারে এক্সপ্রেশন ধরে ডাবিং করি। যখন ডাবিংয়ের মধ্যে থাকি তখন সেই চরিত্রটি আমার উপর ভর করে। নিজেকে তখন আর আনোয়ার শাহী মনে হয় না। সিনেমার সেই চরিত্রের ধরণ বুঝে বুঝে এগোতে থাকি।
সম্প্রতি কোন কোন ছবিতে ডাবিং করেছেন?
‘ধ্যাততেরিকি’, ‘আমার প্রেম আমার প্রিয়া’ ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে নির্মাণাধীন হারুনুজ্জামানের একটি সিনেমায় ডাবিং করেছি।এছাড়া সারোয়ার জাহানের একটি ছবিতে একটি চরিত্রের ডাবিং করব।
এ পর্যন্ত কার কার ডাবিং করেছেন?
অনেকেরই তো করেছি। জসিম থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের নায়কদেরও ডাবিং করছি। এর মধ্যে রয়েছে মান্না, রাজিব, দিলদার, শাকিব খানসহ আরও অনেকে। এ পর্যন্ত ২ হাজারেরও বেশি ছবিতে ডাবিং করেছি। তবে ইদানিং সিনেমায় ডাবিংয়ের পরিমান কমে গেছে।
কেন?
সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাতারা স্পট থেকে নায়কের যতটুকু অডিও পান, ততটুকু দিয়েই কাজ চালিয়ে নেন। অনেক সময় আবার জুনিয়র আর্টিস্টদের দিয়েও নায়কদের কন্ঠের ডাবিং নিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে দেখবেন গত কয়েক বছরের মুক্তি পাওয়া অনেক ছবির অডিও লেভেল ভালো না।
এটাকে পেশা হিসেবে নেওয়া ঝুকি হয়ে যায়?
দেখুন, বিষয়টা আমি এভাবে বলতে চাই না। আমি যখন ইন্ডাষ্ট্রিতে পা রাখি, তখন ডাবিং আর্টিষ্টদের কোনো মূল্যানয়ই ছিল না। আমি যোগ্যতাবলে একটি অবস্থান তৈরি করেছি। কিছুদিন আগমুহুর্ত পর্যন্ত ডাবিং আর্টিষ্টদের কদর ছিল অনেক। কিন্তু সিনেমায় এ শিল্পীদের কাজ এখন কমে গেছে। তবে সেটা অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা নয়। বিশ্বাস করি, সিনেমার বাজেট বাড়লে ডাবিং আর্টিষ্টদেরও কাজ বাড়বে এবং তাই হবে। তাই পেশা হিসেবে এটা না নেওয়ার পক্ষপাতী আমি নই।

ডাবিং আর্টিষ্ট হিসেবে কোন আক্ষেপ?
আক্ষেপ ঠিক নয়। তবে একটা দাবি আছে। আমাদের কণ্ঠ ব্যবহার করে অনেক সাধারণ মানুষ সুপারস্টার হয়েছেন। অনেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু আমরা চিরদিনই আড়ালে রয়ে গেলাম। আমাদের কণ্ঠে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার হলেও আমাদেরকে কেন তা দেওয়া হবে না? আমি সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ডাবিংয়ের জন্য একটি ক্যাটাগরি রাখা হউক।
ডাবিং আর্টিষ্ট হতে হলে কী করতে হবে?
ডাবিং আর্টিষ্ট হতে কোনো প্রশিক্ষণ লাগে না। তবে চরিত্রের এক্সপ্রেশন অনুযায়ী বাচনভঙ্গিটা সুন্দর হতে হয়। বাচনভঙ্গি সুন্দর করার জন্য প্রশিক্ষণ রয়েছে। সেটা করা যায়। আমি অবশ্য রাজশাহীর শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলার ছাত্র ছিলাম। সেখান থেকেই মূলত আমার বাচনভঙ্গিটা তৈরি হয়েছে। তারপর ডাবিং আর্টিষ্ট হওয়ার জন্য যা করা, তা হলো অন্যের কণ্ঠ অনুসরণ করে তা সময় মতো একইরকম ভাবে ডেলিভারি দেওয়া।
আলোকচিত্রী : ওবায়দুল হক তুহিন







