৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস। ২০১৮ সাল থেকে দেশে জাতীয়ভাবে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্বাচন করা হয়েছে ‘সুবর্ণজয়ন্তীর অঙ্গীকার ডিজিটাল গ্রন্থাগার’। অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি প্রতিপাদ্য। ডিজিটাল বাংলাদেশের সাথে তাল মেলাতে প্রতিটি পেশায়, প্রতিটি খাতে চলছে অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশন। অনেক খাত বেশ এগিয়ে গেছে। দেশের গ্রন্থাগারসমূহও সারা বিশ্ব তথা ডিজিটাল বাংলোদেশের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে। দেশে আশি’র দশকে প্রথম আইসিডিডিআর,বি ও কৃষি তথ্য কেন্দ্রে কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়। সে সময়ের কমান্ড লাইন ইন্টারফেস ভিত্তিক সফটঅয়্যার দিয়েই তৈরি হতো ডাটাবেজ। ইউনেস্কোর সিডিএস/আইএসআইএস বেশ জনপ্রিয় হয় এবং সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়।পরবর্তীতে কম্পিউটার প্রযুক্তি ও অপারেটিং সিস্টেমের ব্যাপক উন্নতি সাধন হলে লাইব্রেরি অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশনের জন্যও অনেক সফটঅয়্যার তৈরি হয়। সেগুলোর বেশিরভাগই ওয়েব ভিত্তিক হওয়ায় ইন্টারনেট বা ইন্ট্রানেট ব্যবহার করে গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগারসমূহ সে সকল সফটঅয়্যার ব্যবহার করে শুরু করে অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশন। বর্তমানে দেশের প্রায় সকল উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাগারসমূহ কোন না কোন সফটঅয়্যার ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় গ্রন্থাগার সেবা প্রদান করছে।
দেশে গ্রন্থাগার অটোমেশন ও ডিজিটাইজেশনের বর্তমান চিত্র খুঁজতে গেলে দেখা যায় যে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এখানেও আধুনিক সকল প্রকার সেবা প্রদান করা হচ্ছে। অটোমেশন সম্পন্ন গ্রন্থাগারসমূহে সকল বইয়ের বিবলিওগ্রাফিক তথ্য এখন কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনেই পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবহারকারীরা অনলাইনে বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে এমনকী কভারসহ সূচীপত্র দেখার বা কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু অংশ পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে বইটি তার উদ্দেশ্য সাধন করবে কী না। চাইলে অনলাইনেই দেওয়া যায় রিকুইজিশন। বই ইস্যু-রিটার্নের কাজ করা হচ্ছে সফটঅয়্যার ব্যবহার করে। মেয়াদ শেষের আগে ও পরে ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন নোটিফিকেশন ইমেইল ও মেসেজ। অনেকেই আবার অনলাইনেই বইয়ের মেয়াদ বাড়িয়ে নিচ্ছেন। কাঙ্খিত বইটি গ্রন্থাগারে না থাকলে সেটি কেনার অনুরোধও অনলাইনে করা যায়। আবার প্রয়োজনীয় বইটি অন্যের কাছে ধারে থাকলে সেটি ফেরত আসার পর যেন পাওয়া যায় বা গ্রন্থাগারে থাকা বইটি যেন তার পৌছার আগেই অন্য কেউ না নিয়ে যায় সেরকম রিজার্ভেশনও দেওয়া যায়।
অটোমেশনের পাশাপাশি অনেক গ্রন্থাগারে এখন ডিজিটাল লাইব্রেরি’র সুবিধা পাওয়া যায়। প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারসমূহে রয়েছে নিজস্ব ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরি। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রকাশনাসহ অনুমতিপ্রাপ্ত প্রকাশনাসমূহের সফটকপি থাকছে এই ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরিতে। ব্যবহারকারীরা গ্রন্থাগারে না গিয়েই পড়তে পারছে সম্পূর্ণ লেখা।
গবেষণা কাজে জার্নাল আর্টিকেলের কোন বিকল্প নেই। পূর্বে জার্নালসমূহের প্রিন্ট কপি বের হলেও বর্তমানে বেশিরভাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনলাইনেই তাদের জার্নালসমূহ প্রকাশ করে থাকে। তবে এদের বেশিরভাগই আবার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যায় করে সাবস্ক্রিপশনের বিনিময়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। গ্রন্থাগারসমূহ ব্যবহারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অনলাইন জার্নালসমূহ সাবস্ক্রিপশন করে থাকে। ফলে ব্যবহারকারীরা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক থেকে ঐ জার্নালসমূহ ব্যবহার করতে পারে। অনেক গ্রন্থাগার আবার ব্যবহারকারীদের ২৪/৭ সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এবং ব্যাবহারকারীদের সুবিধার্থে প্রদান করে রিমোট এক্সেস সেবা। ফলে ব্যবহারকারীরা যে কোন সময় যে কোন স্থান থেকে সাবস্ক্রাইবড্ জার্নালসমূহে প্রবেশ করতে পারে।
গত এক দশকে এ দেশের গ্রন্থাগার সেবায় যুক্ত হয়েছে আরএফআইডি প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রন্থাগারে রক্ষিত সকল বইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সুযোগ করে দিয়েছে সেল্ফ সার্ভিস সুবিধা। আরএফআইডি প্রযুক্তির সহায়তায় ব্যবহারকারীরা কোন গ্রন্থাগার কর্মীর সহায়তা ব্যতীত নিজেরাই বই ইস্যু করে নিতে পারে আবার নিজেরাই ফেরত প্রদান করতে পারে। বুক ড্রপ বক্সের মাধ্যমে গ্রন্থাগার বন্ধ থাকলেও ব্যবহারকারীরা বই ফেরত প্রদান করতে পারে।
সেবা প্রদানের ধরনেও এসছে ব্যাপক পরিবর্তন। ফোন ও ইমেইলের পাশপাশি এখন হোয়াটসএ্যাপ, মেসেন্জার কিংবা লাইভ চ্যাটের মাধ্যমেও দেওয়া হচ্ছে গ্রন্থাগার সেবা। বিভিন্ন প্রয়োজনী বিষয়ের ওপর ছোট ছোট ভিডিও করে দেওয়া হচ্ছে ওয়েবসাইটে। রয়েছে সাইটেশন তৈরি, গ্রামার চেকসহ ডাটা এনালাইসিস সুবিধা। রয়েছে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার একাউন্ট ও ইউটিউব চ্যানেল। সেবা নিতে গ্রন্থাগারে যাওয়ার ধারণা বদলে সেবা এখন ব্যবহারকারীর দোড় গোড়ায়।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে গ্রন্থাগার সেবার এই ব্যপক উন্নতি দেখতে বেশ ভালোই লাগে। দেশের উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থাগার বিশেষ করে প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারসমূহ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে অন্যদের জন্য অনুকরনীয় হয়ে উঠেছে। এসকল গ্রন্থাগারের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, কুয়েট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউল্যাব, আইসিডিডিআর,বি, বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রন্থাগার এবং সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে।
তবে এসকল সেবা এখনো সর্বত্র পৌছেনি। এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে অটোমেশনের ছোঁয়া লাগেনি। রয়েছে বাজেট সংকট, রয়েছে পেশাজীবদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা। তবে আশার কথা হচ্ছে সরকারেরর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এ দেশের গ্রন্থাগার পেশাজীবীরা কাজ করে যাচ্ছেন। পেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি (ল্যাব) ও বাংলাদেশ গ্রন্থাগারিক ও তথ্যায়নবিদ সমিতি (বেলিড) পেশার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বেলিড কর্তৃক আয়োজিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেশাজীবীরা তাদের সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে পারছেন। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর দেশের সকল গণগ্রন্থাগার সমূহের আধুনকিায়নে ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে বেসরকারী গ্রন্থাগারসমূহকে সহায়তা করা হচ্ছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দেশের গ্রন্থাগারের উন্নয়নে প্রতি বছর জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উদযাপন করছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান যেমন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থাগার ও বেসরকারী গ্রন্থাগারসমূহের জন্য একটি সফটওয়্যার নির্বাচন করে কেন্দ্রীয় সার্ভারে জায়গা বরাদ্দ করতে পারে।
পরিশেষে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস প্রতি বছর পালন হোক প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে জোরদার কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








