আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি মারা গেছেন ২০০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এ এক আশ্চর্য সংযোগ। যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন তাঁর সাথে রাজনীতি বা নেতাদের নিয়ে আলোচনা হয়েছে খুবই কম। বরং বেশি আলোচনা হয়েছে, যুদ্ধের সময় তিনি কী কী করেছেন সেসব নিয়ে। তিনি বহুবার বলেছেন, প্রাণ বাঁচাতে কবরে মরদেহের সাথে রাত কাটানোর কথা। বলেছেন, পাক সেনাদের আসার খবরে দাদীমা’র হাতের এক লোকমা খাবার মুখে দিয়েই দৌড়ে পালানোর কথা। শুনিয়েছেন, মাসের পর মাস যুদ্ধ করার ভয়াল সেসব অভিজ্ঞতার কথা। এসব গল্পের ফাঁকেই উঠে আসতো বঙ্গবন্ধুর কথা। সেই ছোটবেলাতেই আব্বার মুখে এই নামটি বহুবার শুনেছি আমি। তিনি বহুবার আমাদের সামনে আওড়েছেন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ভাষণ, রক্ত যখন দিয়েছি, আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। আমারা বাবা বলতেন, মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হওয়ার এটাও একটা মন্ত্র ছিলো। বাবা বলতেন, বঙ্গবন্ধু যেভাবে বলেন, তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো; সেটাই গ্রামে-গঞ্জের মানুষকে উৎসাহিত করতো। বাবা বলতেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের এই কথাতেই বেচেঁ থাকার সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন নারী-পুরুষ-যুবা-বয়োবৃদ্ধারাও।
ছোটবেলায় আব্বার মুখে শোনা বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের গুরুত্ব বুঝতাম না। কেবল বুঝতাম আমার বাবার চাইতে তিনি বড় নন। ভাবতাম তিনি কেবল বলেই দায়িত্ব শেষ করেছেন, আসল কাজ তো করেছেন আমার বাবা, বাবার বন্ধুরা। যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন পাকসেনাদের সাথে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিন-রাত কাটিয়েছেন অনাহারে-অর্ধাহারে, বনে-বাদাড়ে। আমার আব্বার কৃতিত্বের কাছে তখন সেটা বেশি বড় হয়ে উঠেনি। তখন মনে হয়েছে, আমার বাবাই সেরা, শ্রেষ্ঠ বাবার সন্তান আমি।
প্রথমবার আব্বা ভোট দিতে বলেছিলো নৌকায়, দিয়েছিলামও, পরেরবারও তাই। কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অধীন হয়ে নয়, বলা ভালো আব্বার আদেশেই। তখনও আমি কেবল স্কুল, কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী, রাজনীতির ‘র’ ও জানি না,জানতেই চাইতাম না। কেন জানি আমার জানতেও ইচ্ছা করেনি। আব্বা নিজে মুক্তিযুদ্ধ করলেও কোন দল বা সংগঠনে কাজ করার ব্যাপারে কখনই উৎসাহ দিতেন না। হয়তো সে কারণেই দলীয় কোন পরিচয় নেই আমার, তখনও ছিলো না, এখনও নেই। রাজনীতি সম্পর্কে অনেক বেশি জানতেও চাই না। রাজনৈতিক দলের কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি দেখে একবার সহকর্মী আবু নাসের খান পান্নুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, শেখ মুজিব এতো জনপ্রিয় হলে, তাঁর অপমৃত্যু হলো কেন?
সেটা ২০০০ সালের কথা। তখন আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। সেই সহকর্মী আমার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে নিয়ে গিয়েছিলো ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। ওখানে নিয়ে গিয়ে ঘুরে দেখিয়েছেন সেই রক্তস্নাত সিঁড়ি, ঘর, খাট, বারান্দা। দেখিয়েছেন মায়াবতী মা, ছোট রাসেল আর অন্যান্যদের করুণ মৃত্যুর দৃশ্য। সেখান থেকে বের হয়ে আমাকে নিয়ে বসলেন ৩২ নম্বরের লেকে। বললেন, বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতা হয়ে ওঠার গল্প। জানালেন ছয় দফা দাবীর ইতিকথা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন ও স্বাধীনতা যুদ্ধ, বাংলাদেশ- এর তার শাসন ও বাকশাল গঠনের কথা। বঙ্গবন্ধু তখন আমার কাছে ক্রমশ প্রকাশ্য এক অধ্যায়। আমি তন্ময় হয়ে শুনছি আর অবাক হচ্ছি। শুনতে শুনতেই ভাবছি কেমন করে একজনের বাবা, সবার বাবা হয়ে উঠেন। পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়ে উঠেন গ্রামের, এলাকার, দেশের, জাতির। হয়ে ওঠেন সবার পিতা। 
৩২ নম্বরে বসেই শুনেছি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে। যিনি জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় ছিলেন আপোষহীন। যার নেতৃত্বে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার আস্বাদ ও স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড পেয়েছে বাংলাদেশ, বাঙ্গালী। পেয়েছে মাতৃভাষা। যার আদর্শ ছিলো সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে সংবিধান প্রণয়ন করা এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে দেশ থেকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অরাজকতা ও ব্যাপক দুর্নীতির মোকাবেলা করা। যিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে একদল বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তার হাতে সপরিবার নিহত হন।
৩২ নম্বরের সেই সন্ধ্যায় আমি জেনেছি কীভাবে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। জেনেছি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানীর সাথে তার হৃদ্যতার কথা। শুনেছি দেশ গঠনে তার অবদান, ত্যাগের কথা। অকুতোভয় আন্দোলনে তার সোচ্চার ও বলিষ্ঠ উচ্চারণের কথা। সেই দিনের পর আমার শুধুই জানতে ইচ্ছা করেছে ‘সবার’ এই পিতা সম্পর্কে। অনেক ঘেঁটেছি, জেনেছি, পড়েছি… এখনও পড়ছি কিন্তু তাকে জানার যেনো শেষ নেই!
বার বার ভাবি কিভাবে একটা মানুষের এতো সাহসী হতে পারে যে সাহসের উপর ভর করে বুলেট বুক পেতে নেন! যে সাহসে চির ধরাতে পারে না মেশিনগান। যে পাঁজর ঝাঁঝড়া করতে পারে না কোনো ট্যাঙ্ক! সেটাই আজো বিস্ময় আমার কাছে। কিভাবে একজনের দাবি হয়ে উঠে গণমানুষের দাবি।
যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিলো, ‘বাংলা’ শব্দটির অস্তিত্ব শুধু ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না, তখন শেখ মুজিবই ঘোষণা দিয়েছিলেন, এখন থেকে এই দেশকে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ বদলে ‘বাংলাদেশ’ ডাকা হবে। জেনেছি, কিভাবে মুজিবের বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতিগত আত্মপরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। কিভাবে এই দ্বি-জাতিতত্ত্বের মাধ্যমেই বাঙালিদের জাতিগত ও সংস্কৃতিগত এই আত্মপরিচয় তাদেরকে আলাদা একটি জাতিসত্ত্বা প্রদান করে তাও জেনেছি। এসবই তো শেখ মুজিবকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, পরিচিত করে। 
বিভিন্ন গ্রন্থে, বিভিন্ন লেখকের স্মৃতি-বিস্মৃতিতে লেখা জবানিতে জেনেছি তার দলের কিছু নেতা-কর্মীর কারণে, দ্রব্যমূল্যের অসামঞ্জস্যতা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যর্থতার কারণে কিভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে এমন জনপ্রিয়, অসাধারণ এক সম্রাটকে। সেইসাথে জেনেছি কিভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তা ট্যাঙ্ক দিয়ে ধানমন্ডির বাসভবন ঘিরে ফেলে এবং শেখ মুজিবসহ তাঁর পরিবারের সব সদস্য, তাঁর ব্যক্তিগত কর্মচারীদের হত্যা করা হয়।
কিন্তু, সর্বকালের সেরা এই বাঙ্গালীর চিহ্ণ মুছে ফেলতে পেরেছে দুর্বৃত্তরা? কিংবা তাঁর জনপ্রিয়তায় এতোটুকুও কি চির ধরাতে পেরেছে? কোনোদিন পারবে বলেও মনে হয় না। যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/ গৌরী মেঘনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






