চড় আমাদের সমাজে খুব চালু ‘মাইর’-এর একটা ধরন। রোমান্টিকতা প্রকাশে আলিঙ্গন যেমন শাসনের ক্ষেত্রে চড় তেমন ধন্বন্তরী ও অনিবার্য উপাচার। পারিবারিক পর্যায়ে এক সময় চড় ছিল খুবই প্রচলিত এবং সাধারণ বিষয়। আমরা ছোটকালে মুড়ি-মুড়কি যেমন খেয়েছি, তেমনি নিয়মিত চড়ও খেয়েছি। আমাদের শৈশব ও কৈশোরের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বেশিরভাগ পরিবারে তখন বজায় ছিল ‘মিলিটারি শাসন।’ অভিভাবকরূপী শাসকরা তেমন কোনো নিয়ম-নীতি-সংবিধানের ধার ধারতেন না। পান থেকে চুন খসলেই চড়-থাপ্পড়। তারা সারাক্ষণ মুখিয়ে থাকতেন কোন উছিলায় কাকে একটা চড় কষিয়ে দেওয়া যায়। আমরাও ছিলাম নির্লজ্জ। প্রতিনিয়ত চড় খাওয়ার পরও কোনো শিক্ষা হতো না। যেন গালে চড় পড়ে-তেমন কাজই বেশি বেশি করতাম!
পুরানো সমাজে শাসনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার বা অস্ত্র ছিল চড়। জীবনে পরিবারে, স্কুলে, কিংবা উচ্ছৃঙ্খল কোনো ব্যক্তির কাছে চড়-থাপ্পড় খায়নি-এমন সৌভাগ্যবান মানুষ সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তবে সব চড় সব সময় খারাপ নয়। ঘাড়ত্যাড়া-রাগী মানুষরা চড়কে বৈধতা দিতে নানা ফন্দি এঁটেছেন। তারা চড়কে বৈধতা দিতে ‘মনের মানুষ’ ‘বনের মানুষ’ এই রকম একটা উদ্ভট সীমারেখা টেনেছেন। তাদের ভাষ্য মতে, ‘মনের মানুষ বাম গালে মারে যদি চড় ডান গাল পেতে দিও পাবে যে আদর!’ কিংবা ‘শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে!’ তার মানে দাঁড়াচ্ছে যে চুমু খাবে, সে চড়ও মারতে পারে! এ ধরনের তত্ত্ব আরোপ করে আসলে এক শ্রেণির ‘চড়বাজ’ মানুষ নিজেদের অপকর্মকেই জায়েজ করার অপচেষ্টা করেছেন!
যাহোক, আমাদের সমাজ, সমাজের রীতিনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সেই আখও আর নেই, নেই সেই রস। সেই চড়ের শাসন পরিবার থেকে, সমাজ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন শিশুর শাস্তি বা ‘করপোরাল পানিশমেন্ট’ বন্ধে গোটা দুনিয়া একাট্টা। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের গায়ে হাত তোলার আগে দশবার চিন্তা করেন। আর স্কুল থেকে শাস্তি তো প্রায় উঠেই গেছে।একালের মানুষেরা বউ পেটানোর ব্যাপারে সীমাহীন উদার হলেও শিশুদের পেটানোর ব্যাপারে খুবই অনুদার!
সিনেমা জগতে, বিশেষত হলিউডের সিনেমা-জগতে এখনও চড় থাপ্পড়ের ব্যবহার ও প্রয়োগের কাহিনি শোনা যায়।যারা বলিউডের সিনেমা জগতের খবর রাখেন তারা জানেন, মাত্র কয়েকদিন আগে হিন্দি সিনেমার নামজাদা পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানশালীকে চড় হজম করতে হয়েছিল। হালের বিখ্যাত নায়ক রণবীর কাপুরকে চড় মেরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন নায়িকা আনুশকা শর্মা। যদিও সেটা সিনেমার শুটিং ছিল। কিন্তু আনুশকা নাকি বেশ ঠাটিয়েই চড়টা মেরেছিলেন রণবীরের গালে! এই নিয়ে কত কত কাণ্ড, কত লেখালেখি!
তবে বিশাল ভারতবর্ষে নানা কিসিমের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন একসময় ভারতের দুই মন্ত্রীকে চড় মেরে আলোড়ন তুলেছিলেন শিখ যুবক হরবিন্দর সিং। তার শখই নাকি ছিল মন্ত্রীদের চড় মারা! মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে টেলিকম-মন্ত্রী সুখরাম ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শারদ পাওয়ারকে চড় মারার পর তিনি মানবসম্পদ ও উন্নয়নমন্ত্রী কপিল সিবালকে প্রকাশ্যে চড় মারতে গিয়ে ধরা খান!
কয়েক দফা চড় খেয়েছিলেন ভারতের আলোড়ন সৃষ্টি করা নেতা আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে। এক সময় তো তিনি চড় খাওয়ার পর হতাশ হয়ে এক টুইটার বার্তায় প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘কেন বারবার আমাকে চড় মারা হচ্ছে?’
চড়-থাপ্পড়-কিল-ঘুষি আমাদের চিরায়ত সাংস্কৃতিক উপাদান। গরুর গাড়ি, পালকির মত এগুলোও বিলুপ্তপ্রায়! তবে আমাদের এই হারানো ঐতিহ্য চড়কে ফিরিয়ে এনে আলোচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি সম্প্রতি তুচ্ছ কারণে টাঙ্গাইল সদরের সংসদ সদস্য ছানোয়ার হোসেনকে চড় ও ঘুষি মেরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন।
তিনি ছানোয়ার হোসেন এমপিকে নাকি গুণে তিনটি চড় ও একটি ঘুষি মেরেছেন! যদিও তিনি পরদিন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘আমি এমপি মো. ছানোয়ার হোসেনকে শাসন করেছি। এটা আমাদের আওয়ামী লীগ পরিবারের বিষয়’। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এটা আমি করতেই পারি। ছানোয়ারও ‘পরিবার-কর্তা’র এই ‘শাসন’কে ইতিবাচক ভাবেই নিয়েছেন। তিনিও বলেছেন, দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমাকে একটু শাসন করতেই পারেন! কী মজা! চড় খেয়ে কী সুন্দরভাবে এই নব্য ‘জননেতা’ হজম করে গেলেন। এমন ‘পারিবারিক সম্প্রীতি’ ও ‘শাসনের রীতি’ ঘরে ঘরে থাকলে বাংলাদেশে কোনো কোর্ট-কাচারির দরকার হতো না!
আমরা অবশ্য ছোটকালে মার খেয়ে মার হজম করতাম অধিক মার খাওয়ার ভয়ে। কেননা বড় ভাই কিংবা বোনের চড় মারার কথা অভিভাবকদের জানালে পরে আরও ভয়াবহ সংকটে পড়ার আশঙ্কা থাকত। তাই অনেক ক্ষেত্রে আমরা গালে হাত বুলিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম। কিন্তু জ্যেষ্ঠ কেউ জিজ্ঞেস করলে, ‘কিছুই হয়নি বলে’-চোখ মুছতাম! আহা, আমাদের সেই সব বঞ্চনাঘেরা দিনগুলো যেন আর কখনই ফিরে না আসে!
আমাদের হারানো ঐতিহ্য চড়কে ফিরিয়ে এনে এক ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ পালন করলেও অনেকে কেন জানি নাক সিটকাচ্ছেন। অনেকে নীতিকথাও ঝাড়ছেন। কেউ কেউ বলছেন, কারো গায়ে হাত তোলা রীতিমত অপরাধ। সেই অপরাধের বিচার হওয়া উচিত প্রচলিত আইনে। একজন মন্ত্রী, যিনি ‘রাগ বা অনুরাগের বশে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার শপথ’ নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, তার ক্ষেত্রে এই অপরাধ আরও বড়। কারণ তিনি একজন নাগরিক বা নির্বাচিত প্রতিনিধির গায়ে হাত তুলেছেন। আর সেই কাজটি যদি তিনি রাগের কারণে করে থাকেন, তা হলে তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। দুটোই গুরুতর অপরাধ।
এমনটাও বলা হচ্ছে যে, নিজ দলের একজন এমপির গায়ে হাত তোলাটা নিতান্তই ‘পরিবারের ব্যাপার’ বা ‘শাসন’ নয়! এর আগেও তিনি গায়ে হাত তুলেছেন, কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন। তার মানে হচ্ছে- আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটা প্রবণতা তার মধ্যে আছে। গায়ে হাত তোলার ক্ষেত্রে তিনি ড্রাইভার থেকে এমপিতে উঠেছেন, এর পরে মন্ত্রীর গালে যে চড় মারবেন না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তুলছেন, মন্ত্রীদের ‘পেশী শক্তি’র প্রয়োগকে মেনে নিলে সন্ত্রাসীদের নিয়ে কথা বলার নৈতিক অবস্থান থাকে কী?
আমরা এসব ভারী আলোচনায় যাব না। আসলে বিষয়টিকে এতটা সিরিয়াসভাবে দেখার কোনো মানে নেই। মানুষের জীবনে চড়-থাপ্পর কোনো ব্যাপারই না। এমনকি ঘুষি-লাথিও কোনো ব্যাপার না। আসুন আমরা ডিএল রায়ের কবিতার মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করি :
আমি যদি পিঠে তোর ঐ লাথি একটা মারিই রাগে;
তোর তো আস্পর্ধা বড়, পিঠে যে তোর ব্যথা লাগে?
আমার পায়ে লাগলো সেটা কিছুই বুঝি নয়কো বেটা?
নিজের জ্বালায় নিজে মরিস, নিজের কথাই ভাবিস আগে।
লাথি যদি না খাবি ত’ জন্মেছিলি কিসের জন্যে?
আমি যদি না মারি তো, মেরে সেটা যাবে অন্যে।
আমার লাথি খেয়ে কাঁদা, ন্যাকামি নয়? শুয়োর গাধা!
দেখছি যে তোর পিঠের চামড়া ভ’রে গেছে জুতোর দাগে!
আমার সেটা অনুগ্রহ যদি লাথি মেরেই থাকি;
লাথি যদি না মারতাম তো না মারতেও পারতাম না কি?
লাথি খেয়ে ওরে চাষা! বরং রে তোর উচিত হাসা,
যে তোর কথাও মাঝে মাঝে, তবু আমার মনে জাগে।
বরং উচিত আগে আমার পায়ে হাত তোর বুলিয়ে দেওয়া;
পরে ধীরে ধীরে নিজের পিঠের দাগটা মুছে নেওয়া!
পরে বলা ভক্তিভরে, ‘প্রভু! অনুগ্রহ ক’রে
পৃষ্ঠে ত মেরেছো লাথি মারো দেখি পুরোভাগে?
দেখি সেটা কেমন লাগে!’
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)










