দুইটি দেশের মধ্যে মালবাহী ট্রেনের সংযোগ বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোর হেডলাইন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার চীনের চালু করা একটি নতুন ট্রেন সার্ভিস এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম।
১ হাজার ১৫০ টন সূর্যমুখী বীজ নিয়ে মালবাহী এই ট্রেনের অভিষেক যাত্রার খবরটি হয়তো উল্লেখ করার মতো নয়, কিন্ত এর গন্তব্য কৌতুহল জাগানিয়া, ইরানের রাজধানী তেহরান। (খাদ্য ও তেলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয় সূর্যমুখী বীজ)।
চীনা সংবাদ সংস্থা জিনহুয়া বৃহস্পতিবার চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ইনার মঙ্গোলিয়ার বায়ানুর এবং ইরানের মধ্যকার নতুন রেল সংযোগ চালুর বিষয়টি জানায়।
এই ট্রেনের পথের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট বর্ণনা করা না হলেও এর ফলে পরিবহন সময় কমবে। সাগরপথের চেয়ে স্পষ্টতই কমপক্ষে ২০ দিন সময় কমবে।
এখন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সূর্যমুখী বীজ এখন তেহরানে পৌছাবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
চীনের এই ট্রেনটি এমন সময় ইরানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো যখন ইরান-ইসরায়েল সংঘাত প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ইরানের সাথে চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ইউরোপিয়ান মিত্রদের অনুরোধ-আহ্বান উপেক্ষা করে গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেন। এই চুক্তি অনুযায়ী ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার বিনিময়ে দেশটির উপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছিলো। ২০১৫ সালে ছয়টি দেশের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন) সাথে এই চুক্তি হয়েছিল ইরানের।

বিশেষত, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ সতর্ক করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও অবরোধ আরোপ করলে দেশটি তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় চালু করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পরপরই বুধবার ইরানের রকেট হামলা এবং এর পরে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রতিশোধমূলক হামলাই প্রমাণ করে পরিস্থিতি দ্রুতই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
বুধবার মধ্যরাতে অধিকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরাইলের সেনাবাহিনীর অবস্থানে অন্তত ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলা চালায় ইরান। জবাবে সিরিয়ায় কয়েক ডজন ইরানি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরাইল।
ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সময় যুক্তরাষ্ট্র বিদেশী কোম্পানিগুলোর প্রতিও আহ্বান জানায়, ইরান থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই আহ্বানের ঠিক বিপরীতটাই করছে চীন।
বৃহস্পতিবার চীনের এই মালবাহী রেল চালুর ঘটনা ইরানের সাথে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোড়দার করতে চাওয়ারই বহিঃপ্রকাশ। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নেওয়ার কোন পরিকল্পনা চীনের রয়েছে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।

বুধবারের এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেং শুয়াং বলেন, ইরান এবং চীন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে পারে।
এর প্রেক্ষিতে, ইউরোপের কেউ কেউ ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। উচ্চপদস্থ ইউরোপিয়ান কর্মকর্তাদের কেউ ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছেন, তারা ইরানের সাথে বাণিজ্য অব্যাহত রাখায় যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোকে সাজা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে তাদের হাতে খুব সামান্যই সুযোগ আছে।
চীন এক্ষেত্রে বেপরোয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এড়ানোর জন্য চীন তাদের কোম্পানিগুলোকে ইরান থেকে সরে আসার নির্দেশ দিবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইঙ্গিত দিয়েছেন, বেইজিং হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনকে অবজ্ঞাই করবে।
“আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে চীন সরকার একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং কোন দেশের স্থানীয় আইন অনুযায়ী তথাকথিত লং-আর্ম জুরিসডিকশনের (স্থানীয় আদালতের দেশের বাইরে আইনী অধিকার) বিরোধীতা করে।
চীন এর আগেও কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে পাশ কাটিয়ে যেতে পেরেছে। এবারও হয়তো তেমন কিছু করতে পারে। কয়েকজন বিশ্লেষক এমনও বলছেন, ইরানের সাথে বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে ইচ্ছুক, কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘণে ভীত, এমন ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবর্তীণ হতে পারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এধরণের মার্কিন অবরোধ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত হওয়া ইউরোপিয়ান বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিপর্যয় বনে আনতে পারে, যেমন প্লেন প্রস্তুতকারক ‘অ্যায়ারবাস’।
সিএনবিসিকে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক কার্লোস পাসকল বলেন, ইরান থেকে চীন বা রাশিয়ার মাধ্যমে অন্যান্য দেশগুলোতে তেল বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে পাশ কাটাতে পারবে।
“এটা রাশিয়া ও চীনের সবচেয়ে স্পষ্ট এক ধরণের ‘লিকেজ’ যার মাধ্যমে ইরান তাদের পন্য রপ্তানির পথ পাবে। “
২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ইউরোপিয় ইউনিয়নে (ইইউ) ইরানের রপ্তানি ৩৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই ইরানে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
ইরানের সাথে বাণিজ্য সমুন্নত রাখতে চীনের আরও একটি স্বার্থগত বিষয় রয়েছে। অন্য কোন দেশের চেয়ে তেহরান চীনের কাছেই সবচেয়ে বেশি পন্য রপ্তানি করে এবং গত বছর তা বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ইরানে চীনের রপ্তানিমূল্যও ২০ শতাংশ বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইউরোপ চীনা কৌশল অবলম্বন করলে, যার সম্ভাবনাই বেশি, তবে এই পরিস্তিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পারে-নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া দেশটি ইরান নয়, বরং সে নিজে।








