পঁচিশে বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী। তিনি চির নতুনের কবি, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কবি। মৃত্যুহীন অনন্ত জীবনের সাক্ষর বয়ে যাবেন যুগ থেকে যুগান্তরে।।
প্রতিবছরের মতো নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ১২৬৮ বঙ্গাব্দে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ নেয়া নোবেল বিজয়ী এই বাঙ্গালি কবিকে স্মরণ করছেন তার অগণিত ভক্তরা। শুধু দুই বাংলার বাঙালীই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষী কবির জন্মবার্ষিকীর দিবসটি পালন করছেন হৃদয় উৎসারিত আবেগ ও শ্রদ্ধায়।
জাতীয় পর্যায়ে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। ঢাকাসহ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসটি যথাযোগ্যভাবে উদযাপন করা হবে। বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এ বছর জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসরে। বিকাল ২টা ৩০ মিনিটে নওগাঁর পতিসরে রবীন্দ্র কাচারি বাড়ির দেবেন্দ্র মঞ্চে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বন্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহাঃ ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক ও নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ ইসরাফিল আলম।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মানুষের ধর্ম : রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’। এ বিষয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তব্য দেবেন অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদ। আলোচনার পর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ৩০ মিনিটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এবং খুলনার দক্ষিণডিহি ও পিঠাভোগসহ ঢাকায় যথাযোগ্য মর্যাদায় তার জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে রবীন্দ্রমেলা, রবীন্দ্রবিষয়ক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তিনদিনব্যাপী কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলা একাডেমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগিতায় পতিসরের আলোকে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর স্মরণিকা ও পোস্টার মুদ্রণ করেছে।
বাংলা একাডেমিতে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। ঢাকাসহ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্যভাবে উদযাপন করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহও এ উপলক্ষে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
যে সকল জেলায় জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে না, সে সকল জেলার জেলা প্রশাসকরা স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও সুধীজনের সহযোগিতায় যথাযোগ্য মর্যাদায় কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছেন। জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও অন্যান্য অনুষ্ঠানমালা বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহ সম্প্রচার করা হচ্ছে।
কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জাতীয় পর্যায়ে মূল অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানসমূহে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বাংলার কবি, বাঙালির কবি তবে তিনি নিজেকে বিশ্বচরাচরের অংশ হিসাবে বিশ্বাস করতেন। বাঙালিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন, তুমি নিছক বাঙালি নও , তুমি বিশ্বচরাচরের অংশ। ‘সকলের সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রেমের মধ্যে বাঁচতে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে যুক্ত করতে বলেছেন প্রণীজগৎ, নিসর্গ, প্রকৃতিকে । শুধু তাই নয়, শিল্পের জগৎ, কল্পনার জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের বিস্তার ঘটাতে বলেছেন । রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ। সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ। চরণপদ্মে মম চিত নিস্পন্দিত করো হে। নন্দিত করো, নন্দিত করো, নন্দিত করো হে।’ একশ বছরেরও বেশি আগে বাঙালি পাঠকদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের জিজ্ঞাসা ছিল আজি হতে শতর্বষ পরে /কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি / শত কৌতুহল ভরে / অথবা, আজি হতে শতর্বষ পরে / এখন করিছো গান সে কোন্ নুতন কবি /তোমাদের ঘরে ! কবির আশংকার জবাবে বলা যায় শত বছর পরে এখন অনেক নতুন কবি এসেছেন, নব নব সৃষ্টিতে প্রতিনিয়ত স্ফীত হচ্ছে আমাদের সাহিত্য এবং সংগীতের ভূবন। তারপরেও আমাদের রবীন্দ্রনাথ মাত্র একজন। এখনকার নবীনদের সৃষ্টির উৎসও তিনি। এখনো জীবনের সবকিছুতে হাত বাড়াতে হয় রবীন্দ্রনাথে। তাই কবির বসন্ত গান শতবছর পরেও ধবনিত হয় নবীন কবি আর পাঠকের বসন্ত দিনে।
জন্মের ১৫৬ বছর পেরিয়ে এবং মৃত্যুর প্রায় ৭৫ বছর পরেও রবীন্দ্রনাথ এখনও কেন প্রাসঙ্গিক এ ব্যাপারে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বাঙালীর এই কবি এমন এক সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যখন রাষ্ট্র ছিল পরাধীন, চিন্তা ছিল প্রথাগত ও অনগ্রসর, বাংলাভাষা ছিল অপরিণত। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ একাধারে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমানে উন্নীত করার পাশাপাশি জাতির চিন্তা জগতে আধুনিকতার উন্মেষ ঘটিয়েছেন। বাঙালীর মানস গঠনে পালন করেছেন অগ্রদূতের ভূমিকা। সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের পথে অভিসারী হয়ে ওঠার প্রেরণা যোগানোর মধ্যদিয়ে বাঙালী মননকে বিশ্বমানে উন্নীত করে জাতিকে আবদ্ধ করে গেছেন চিরকৃতজ্ঞতায়। একশত পঞ্চান্ন বছর পেরিয়েও কবি আমাদের মাঝে তাই চিরজাগরূক হয়ে আছেন।







