ডাক্তারের কাছে রোগের কথা গোপন করলে ক্ষতিটা রোগীর; ডাক্তারের নয়। যে কারণে ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্ক হতে হয় অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ, বিশ্বস্ত এবং আস্থার। ফলে একজন চিকিৎসক কখনো ধর্ষক হতে পারেন না। তিনি যখন ডাক্তারিবিদ্যা পড়েন, তখন তাকে মানুষের শারীরবৃত্তিয় যাবতীয় রসায়ন জানতে হয়। তিনি হাতে-কলমে মানুষের শরীরের যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন।
একজন পুরুষ চিকিৎসকের অস্ত্রোপচারের টেবিলে অনায়াসে একজন নারী শুয়ে পড়েন। ওই নারী জানেন, অস্ত্রোপচারের সময় তিনি অজ্ঞান থাকবেন। তার শরীরের কোনো কিছুই ডাক্তারের কাছে গোপন থাকবে না। গোপন থাকবে না বলেই একজন চিকিৎসক কখনো তার রোগীকে ধর্ষণ করেন না বা করতে পারেন না। কিন্তু তারপরও কোনো কোনো ডাক্তারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। কোনো ডাক্তার যখন ধর্ষণ করেন, তখন তার ডাক্তারি পেশার নীতি-নৈতিকতা বলে কিছু থাকে না। তখন পেশার পরিচয় ছাপিয়ে, মানুষের পরিচয় ছাপিয়ে তিনি তখন কেবলই একজন ধর্ষক।
যখন অন্য পেশার কেউ একজন ধর্ষণ করে সেখানে তার পেশা ও মনুষ্যত্বের পরিচয় ছাপিয়ে তার মুখ্য পরিচয় তখন ধর্ষক। তার মানে যে ধর্ষণকারী, সে যে পেশায় থাকুক, সুযোগ পেলে সে তার পাষবিক চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলবেই। সুতরাং একজন ডাক্তার ধর্ষণ করলে যেমন পুরো চিকিৎসক সমাজ তার দায় নেবে না, তেমনি একজন শিক্ষক-সাংবাদিক-আইনজীবী-প্রকৌশলী-ব্যবসায়ী যেই ধর্ষণ করুক না কেন, তাতে ওই পেশার সবাই দোষী হয়ে যায় না।কিন্তু তারপরও চিকিৎসকদের বিষয়ে আমরা একটু বেশি সংবেদনশীল।
চট্টগ্রামে ম্যাক্স নামে একটি বেসরকারি হাসপাতলে ‘ভুল’ চিকিৎসায় রাফিদা নামে এক শিশুর পরে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দিয়ে ডাক্তারদের রাস্তায় নেমে আসা এবং খোদ হাইকোর্টের তরফে ‘চিকিৎসা দুর্বৃত্তের পেশায় পরিণত হয়েছে’—এরকম মন্তব্যের রেশ না কাটতেই আবারও সংবাদ শিরোনাম একজন ডাক্তার। এবার খোদ হাসপাতালের ভেতরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক ইন্টার্ন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তোলপাড় চলছে গোটা সিলেটে।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, মাক্কাম আহমদ মাহী নামে সিলেট ওসমানী মেডিকেলের এক ইন্টার্ন চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর ফাইল দেখার কথা বলে রুমের ভেতরে নিয়ে ওই রোগীর আত্মীয় নবম শ্রেণির স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করে। এমনকি মেয়েটি চিৎকার করলেও কেউ তাকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেনি। শুধু তাই নয়, ওই চিকিৎসক বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য হুমকি-ধমকি দেয়। এরপর থেকেই মেয়েটি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়ে। তার চেহারায় আতঙ্কের ছাপ দেখে কারণ জানতে চাইলে সে পরিবারের লোকদের ঘটনা খুলে বলে। এ ঘটনায় ওই স্কুলছাত্রীর বাবা কোতোয়ালি থানায় মাহীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করেন। গ্রেপ্তারের পরে আদালতে নেয়া হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন
আশার কথা হলো, এর আগে বিভিন্ন সময়ে ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসায় অবহেলা বা এরকম নানা অভিযোগে রোগীর স্বজনরা ক্ষুব্ধ হলে বা কখনো-সখনো চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হলে চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়া এমনকি হাসপাতাল ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসার ঘটনা ঘটলেও সিলেটের এই ঘটনায় এখনও ওই চিকিৎসকের সেবা বন্ধ করে দেয়া বা এরকম কোনো তৎপরতা দেখাননি।
যেসব কারণে ডাক্তাররা সেবা বন্ধ করে দেন বা রাস্তায় নেমে আসেন, তার মধ্যে প্রধান হলো রোগীর স্বজনদের হাতে নাজেহাল হওয়া। এটা ঠিক যে, কোনো চিকিৎসকই চান না যে অবহেলায় কোনো রোগীর মৃত্যু হোক। নিশ্চয়ই কোনো ডাক্তার সচেতনভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বা ইনজেকশন কোনো রোগীর শরীরে পুশ করেন না—এমনটাই আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু তারপরও অভিযোগ ওঠে। আবার ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু—এরকম সংবাদ শিরোনাম হরহামেশা গণমাধ্যমে চোখে পড়লেও ভুল চিকিৎসা প্রমাণ করা কঠিন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের আইনি সুরক্ষা অনেক বেশি। যে কারণে যখনই কোনো রোগীর ক্ষুব্ধ স্বজনরা ডাক্তার বা হাসপাতালের ওপর চড়াও হন, তখন সেবা বন্ধ করে দিয়ে চিকিৎসকরা ধর্মঘটে নামেন। বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এটি মোটামুটি নিয়মিত ঘটনা।
তবে চট্টগ্রামে সম্প্রতি চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দিয়ে ডাক্তারদের রাস্তায় নেমে আসার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনেএরকম প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, ডাক্তাররা কি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মালিকদের কেনা গোলাম? প্রশ্নটা এ কারণে যে, রাফিদা নামে এক শিশুর মৃত্যুর পরে ম্যাক্স হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালায় এবং সেখানে কিছু অনিয়ম পায়। একই সময়ে চট্টগ্রামে আরও একাধিক হাসপাতালে অভিযান চালানো হয়। এর প্রতিবাদে বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনিস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট প্র্যাকটিস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে রাস্তায় নেমে আসেন চিকিৎসকরা।
অথচ ঘটনাটি উল্টো হবার কথা ছিল। ডাক্তারদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সুনাম ব্যবহার করে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা কোটি কোটি টাকা কামান। ডাক্তাররা নিজেরাও লাভবান হন। ফলে সেখানে যখন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, খারাপ যন্ত্রপাতি, ভুইফোঁড় ল্যাব থেকে পরীক্ষা করিয়ে এনে অভিজাত হাসপাতালের নামে চালানোর মতো অনৈতিক কাজ যখন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ধরা পড়ে, তখন ডাক্তারদেরই উচিত মালিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। তাদেরই উচিত মালিকের শাস্তির দাবি জানানো। কেননা যে হাসপাতালের বিরুদ্ধে যখন এরকম অভিযোগ ওঠে, তখন তাতে ওই হাসপাতালে কর্মরত সকল চিকিৎসকের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়।
চট্টগ্রাম বা ঢাকার বাইরে নয়; খোদ রাজধানীতেই ইউনাইটেড ও অ্যাপোলোর মতো অভিজাত হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে রোগ পরীক্ষার মেয়াদোত্তীর্ণ উপাদান, ব্লাড ব্যাংকের লাইসেন্স ছাড়া রক্ত বিক্রির মতো গুরুতর অপরাধের প্রমাণ পেয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব হাসপাতালে দেশের সেরা চিকিৎসকরা প্র্যাকটিস করেন। কখনো কি কোনো একজন অধ্যাপক এসব অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে সেই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছেন? কেননা, একজন নামকরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যদি ফুটপাথে ভাঙাচোরা একটা ঘরেও বসেন, রোগী তার কাছেই যাবে। তিনি কত বড় আলিশান রুমে বসে রোগী দেখেন, সেটি খুব বেশি মানুষের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু আমরা কখনো হাসপাতাল মালিকদের অসততার বিরুদ্ধে ডাক্তারদের কথা বলতে শুনিনি। বরং তারা অন্যায় হলেও মালিকদের পক্ষেই থাকেন। অথচ প্রতিবাদটা যদি ডাক্তারদের পক্ষ থেকেই আসতো তাহলে কোনো হাসপাতালের মালিকই মেয়াদোত্তীর্ণ উপাদান, যন্ত্রপাতি রাখতে পারতেন না। তারা ভালো চিকিৎসক হারানোর ভয়ে সব নিয়ম মেনে চলতেন।
চিকিৎসকদের নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ড কেমন হবে তা নিয়ে সিলেটে ধর্ষণের অভিযোগে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসককে গ্রেপ্তারের ঠিক আগের দিন কথা হচ্ছিলো দেশের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসকের সঙ্গে; টেলিভিশনে নিয়মিত দেখা যায়। তিনি বলেন, ধরুন মহাসড়কে নৈশকোচ থামিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেলো ডাকাতরা। সেই বাসে আমিও ছিলাম। কিন্তু পরদিন ভোরে জনতার পিটুনি খেয়ে ডাকাতদলের একজন হাসপাতালে এলো। আমি চেহারা দেখে তাকে চিনলাম। আমি কি ডাকাত বলে তার চিকিৎসা দেব না? ডাক্তারদের নীতি-নৈতিকতা সেটি বলে না। বরং চরম শত্রুকেও আমরা সেবা দিতে বাধ্য। কোনো অবস্থাতেই সেবা বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসার সুযোগ নেই। তার কাছে প্রত্যেক রোগীই ঈশ্বর। তিনি যদি কোনো কারণে কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রতি ক্ষুব্ধ হন, তার প্রতিকারের নানা পথ আছে। তার প্রতি কোনো অন্যায় হলে তার জন্য দেশে আইন আদালত আছে। তিনি কোনো অবস্থাতেই সেবা বন্ধ করে রাস্তায় নামতে পারেন না। সুতরাং এমন নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হয় যে পেশার মানুষকে, তিনিই যদি ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








