ঈদ আসন্ন। বাড়ি ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে ঘরমুখো মানুষেরা। একদিকে বৃষ্টির কারণে সড়ক-মহাসড়কে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। অন্যদিকে সরু রাস্তার কারণে দেখা দেয় তীব্র যানজট। বিশেষ করে রাজধানী থেকে বের হওয়ার মুখে ঘণ্টার ঘণ্টা যানজটে পড়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় ঘরমুখো এই মানুষদের।
বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ। মাত্র তিনদিনে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে চলাচলকারী কোচ ও বাসের সব আগাম টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। যারা সংগ্রহ করতে পারেননি; তাদের একমাত্র ভরসা এখন ট্রেন। গত ৩ জুলাই (শুক্রবার) থেকে রাজধানীর গাবতলী ও শ্যামলী থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হয়। তবে সায়েদাবাদ কিংবা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে চলাচলকারী কোনো বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করা হয়নি।
৫ জুলাই (রোববার) গাবতলী বাস টার্মিনালে বিভিন্ন রুটের কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের ভিড় ছিল একেবারেই কম। হানিফ, নাবিল, ডিপজল, শ্যামলী ও কেয়াসহ বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে ঈদের অগ্রিম টিকিট শেষ বলে নোটিশ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে রোজিনা, এস আর ট্রাভেলসহ কিছু বাসের টিকিট এখনও পাওয়া যাচ্ছে। যারা টিকিট সংগ্রহ করতে পারেননি তারা ট্রেনের আশায় প্রহর গুণছেন।
আগামী ১০ জুলাই থেকে বিআরটিসির বাস এবং ৯ জুলাই থেকে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হবে। রেলওয়ে জানিয়েছে, ৯ জুলাই বিক্রি হবে ১৩ জুলাইয়ের টিকিট, ১০ জুলাই বিক্রি ১৪ জুলাইয়ের, ১১ জুলাই ১৫ জুলাইয়ের, ১২ জুলাই ১৬ জুলাইয়ের ও ১৩ জুলাই বিক্রি হবে ১৭ জুলাইয়ের অগ্রিম টিকিট। ঢাকার কমলাপুর ও চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে এই অগ্রিম টিকিট বিক্রি হবে।
একজন যাত্রী চারটির বেশি টিকিট কিনতে পারবে না। এছাড়াও বিক্রিত টিকিট ফেরত নেওয়া হবে না। আগামী ১৬ জুলাই থেকে ঈদ পরবর্তী ফিরতি টিকিট বিক্রি শুরু হবে।
রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে বিক্রি হবে ফিরতি টিকিট। ওইদিন বিক্রি হবে ২০ জুলাইয়ের টিকিট, ১৭ জুলাই ২১ জুলাইয়ের, ১৮ জুলাই ২২ জুলাইয়ের, ১৯ জুলাই ২৩ জুলাইয়ের ও ২০ জুলাই ২৪ জুলাইয়ের ফিরতি অগ্রিম টিকিট বিক্রি হবে।
রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট স্টেশন হতে বিশেষ ব্যবস্থায় ফিরতি অগ্রিম টিকিট বিক্রি হবে। ঈদ সামনে রেখে নৌ-পথে যাত্রী পরিবহণের জন্য ঢাকার আশপাশের ডকইয়ার্ডগুলোতে প্রস্তুত হচ্ছে কয়েক’শ ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসহীন লঞ্চ। রং আর তুলির আঁচড়ে এসব লঞ্চকে নতুনের মতো করে সাজানো হচ্ছে। প্রস্তুত করা হচ্ছে যাত্রী পরিবহণের জন্য।
সরজমিনে দেখা গেছে, ফিটনেসহীন এবং চলাচলের অযোগ্য অনেক লঞ্চ মেরামত করা হচ্ছে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ২৫টিরও বেশি ছোট-বড় ডকে। এসব লঞ্চের মেরামত ও রং করার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া সদরঘাটের বিপরীত দিকে বুড়িগঙ্গার তীরের ডকগুলোও ব্যস্ত। ঈদের আগ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ডককেই এ কাজের জন্য বুকিং দেয়া হয়ে থাকে। ডকইয়ার্ডের শ্রমিকরা লঞ্চগুলো পানিতে ভাসানোর জন্য রাত-দিন মেরামত আর তাতে রং লাগানোর কাজ করছেন। চুক্তিতে লঞ্চ মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানের একজন মালিক জানান,‘ঈদের আগে লঞ্চ মেরামতের কাজ বেড়ে যায়। ডক ভাড়া নেয়ার জন্য আগে থেকেই লঞ্চ মালিকরা যোগাযোগ করেন। আর লঞ্চের ফিটনেস থাকা না থাকা আমাদের বিষয় না। মালিকরা এখানে লঞ্চ পাঠায় আর আমরা তা মেরামত করে দিই। মালিকের মতামতের ভিত্তিতে আমরা লঞ্চ মেরামত করি। তবে অনেক পুরোনো লঞ্চও ঈদের সময় মেরামতের জন্য আসে এখানে।’
প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের মানুষ ঝুঁকি নিয়েই এসব লঞ্চে বাড়ি ফিরবে। তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) দাবি করছে, কোনো ফিটনেসহীন লঞ্চ বা জাহাজ ঈদ উপলক্ষে চলাচল করতে পারবে না। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন রুটে অর্ধশতাধিক ছোট-বড় পুরোনো লঞ্চ জোড়াতালি দিয়ে ঈদে ঘরমুখী যাত্রীদের পরিবহণের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া লঞ্চ মালিক সমিতির বর্তমান হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২০-৩০ বছরের পুরোনো লঞ্চও চলাচল করছে এসব রুটে।
বরিশাল-ঢাকা রুটের এক লঞ্চ কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরোনো লঞ্চ চালানোর বিষয়ে আমাদের কোনো হাত নেই। মালিকপক্ষ বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে আঁতাত করে প্রতিবছরই ফিটনেসহীন লঞ্চ নামায়। আমরা কর্মচারী। মালিকের চাকরি করি। আমাদের কিছু করার নাই। আমরা তো লঞ্চেই থাকি। যাত্রীদের যা হবে, আমাদেরও তা-ই হবে।’
প্রতি বছর সড়কপথে যাত্রীদের নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে যাতায়াতের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই বৈঠকের অধিকাংশ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় না। প্রতি বছরেই যাত্রীদের প্রচণ্ড দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। জানা গেছে,যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তার অধিকাংশ স্থানে খান-খন্দের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সায়েদাবাদ ওন্ডারল্যান্ডের সামনের রাস্তায় বৃষ্টির কারণে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া রাজধানীর থেকে বের হয়ে যানজটে শিকার হতে হয় ঈদে ঘরমুখো মানুষদের। তাই আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে এবার তা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
বর্ষার শুরুতেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুরের ধেরুয়া রেলক্রসিংয়ে ও মির্জাপুর বাইপাস স্টেশনে বৃষ্টির কারণে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। তাই এই সড়কে যানবাহন ধীরগতি চলতে হচ্ছে। এর মধ্যে কুমিল্লার দাউদকান্দির টোল প্লাজার থেকে কুমিল্লা সদরের আলেখার চর, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরের চন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার, ঢাকা-টাঙ্গইল মহাসড়কে বঙ্গবন্ধু সেতুর আগে এলেঙ্গা বাইপাস থেকে পৌলি ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় প্রতিদিন-ই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
ঈদের সময় এই যানজট ৫০-৬০ কিলোমিটার অতিক্রম করে যায়। এছাড়া ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে বাবু বাজার ব্রিজের পর থেকে কদমতলী মোড় হয়ে জনি টাওয়ার পর্যন্ত এবং অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে মাওয়া ফেরিঘাটে প্রতিদিনেই দীর্ঘ যানজটে পড়ে দুর্ভোগে শিকার হচ্ছে যাত্রীরা। ঈদের আগে এ যানজট সংগত কারণেই আরও বেড়ে যায়!
অপরদিকে ঢাকা থেকে বিভিন্ন মহাসড়কের প্রবেশদ্বারগুলোতে সড়কের বেহাল অবস্থা ও অসহনীয় যানজটের কারণে ঈদে ঘরমুখো মানুষকে এবারও বিড়ম্বনা সহ্য করেই ফিরতে হবে বাড়িতে।
নৌপথ, রেলপথ ও সড়কপথ। সর্বত্র অস্তিরতা। অব্যবস্থাপনা। ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রীদের দুর্ভোগ কীভাবে দূর হবে? আর যাই হোক, আমরা এমন নৈমিত্তিক ও নৈরাজ্যজনক ঘটনা দেখতে চাই না। যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রার দায়িত্ব সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সরকারের আন্তরিকতায় ঈদের এসব বিড়ম্বনা দূর করা সম্ভব। যদিও কোনো সরকারের সেই আন্তরিকতার পরিচয় পাওয়া যায় না। তবুও আমরা আশা করব,ঘরমুখো মানুষের ঘরে ফেরা নির্বিঘ্ন ও বিড়ম্বনা মুক্ত হোক।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







