বছর দুয়েক আগে তাকে বেলজিয়ামের সহকারী কোচ হতে দেখে চমকে গিয়েছিলেন অনেকে। নিজ দেশ ফ্রান্স তো ছিলই, সেই সঙ্গে সুযোগ ছিল ইংল্যান্ডের লিগে কোচিং করানোরও। সেসব ছেড়ে কিনা বেলজিয়ামের সহকারী কোচ! বলা হচ্ছে ফ্রান্সের সাবেক তারকা থিয়েরি অঁরির কথা।
রাশিয়া বিশ্বকাপকে অনেকেই বলছেন ‘অঘটনের’ বিশ্বকাপ। সর্বশেষ শিকার নেইমারের ব্রাজিল। ম্যাচ শেষে নেইমারের পাশাপাশি ভেঙে পড়তে দেখা যায় সতীর্থ ফিলিপে কৌতিনহোকেও। তাদের দু’জনকেই প্রথমে জড়িয়ে ধরেন অঁরি। নেইমারকে নিয়েই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান ফরাসি কিংবদন্তি।
যদিও বেলজিয়ামের এই সাফল্যের পেছনে কোচ মার্টিনেজের সঙ্গে যার হাত সবথেকে বেশি বলে মনে করা হয়, তিনি এক এবং অদ্বিতীয় থিয়েরি অঁরি। ফ্রান্স এবং আর্সেনালের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা।
২০১৪ বিশ্বকাপের ব্যর্থতা এবং ২০১৬ ইউরোয় ওয়েলসের কাছে লজ্জার হারের পরেই রবার্তো মার্টিনেজকে কোচ করে বেলজিয়াম। মার্টিনেজ এসেই অঁরিকে প্রস্তাব দেন তার দলে যোগ দেয়ার। অঁরি রাজি হন। শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।
প্যারিসে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলকে হারানো ফরাসি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অঁরি। ১২ বছর আগে (২০০৬ বিশ্বকাপ) তার একমাত্র গোলেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়েছিল ব্রাজিল। শুক্রবার রাতে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে ‘কোচ’ অঁরি দেখলেন, কীভাবে তার মন্ত্রে চলা বেলজিয়াম বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায় করিয়ে দিল।
কিছু দিন আগেই মার্টিনেজ বলেছেন, ‘অঁরি এমন একজন খেলোয়াড় যিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন, আবার ইউরো কাপও জিতেছেন। আমাদের এই দলটারও লক্ষ্য ওই দুটি ট্রফিই। তাই অঁরির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতেই তাকে নিয়ে এসেছিলাম।’
কীভাবে এল বেলজিয়ামের সাফল্য? অঁরি যোগ দিয়েই বুঝেছিলেন যে দলে প্রতিভার কোনও কমতি নেই। শুধু ঠিকঠাকভাবে খেলাতে হবে। বেলজিয়ামের সাবেক কোচ ও দেশটির অন্যতম সেরা তারকা মার্ক উইলমটস দলকে খুব বেশি ডিফেন্সিভ খেলাতেন।
মার্টিনেজের সঙ্গে পরামর্শ করে সেটা এসেই বদলে দেন অঁরি। ৫–৩–২ ফর্মেশন থেকে সরে এসে দলকে খেলাতে থাকেন ৩–৪–৩ ফর্মেশনে। রোমেলু লুকাকুকে তুলে আনেন সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড পজিশনে। দু’দিকে এডিন হ্যাজার্ড এবং কেভিন ডি ব্রুইন। কখনও ডি ব্রুইনকে মিডফিল্ডে খেলিয়ে ডানদিকে ড্রিস মার্টেন্সকে খেলান।
রেড ডেলিভসদের আক্রমণের অন্যতম সেরা অস্ত্র লুকাকু বলেছেন, ‘অঁরিকে কোচ হিসেবে পাওয়া আমার জীবনের সেরা ঘটনা। অঁরিই আমার কাছে সেরা। একবার দু’ঘণ্টা ধরে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম। অথচ উনি একটুও বিরক্ত হন না।’
আর ব্রাজিল ম্যাচে মিডফিল্ডার ডি ব্রুইন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলার পর বলেছেন, ‘কোচ যেখানে বলেন আমি সেখানেই খেলতে ভালোবাসি। সিদ্ধান্তটা কোচের, মাঠের প্রয়োগ আমার।’
ফলাফল রয়েছে পরিসংখ্যানেই। প্রথম ইউরোপীয় দল হিসেবে বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া বেলজিয়াম বাছাইপর্বে করে ৪৩ গোল। বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত করেছে ১৪ গোল। ডিফেন্স নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছিল। সেটাও কাটিয়ে দিয়েছেন মারুয়ানে ফেলাইনি এবং নাসের চাডলি। শুক্রবার ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যারা অসাধারণ খেলেছেন। মুহুর্মুহু আক্রমণ করেও একবারের বেশি গোলমুখ খুলতে পারেননি নেইমার-কৌতিনহো-ফিরমিনোরা।
ম্যাচ শেষে নেইমারদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য প্রথমেই যাকে দেখা যায়, তিনি তার দলের কোনও সতীর্থ নন। ব্রাজিলের সমর্থকও নন। নেইমারকে সান্ত্বনা দিতে সহকারী কোচ অঁরিকে যেতে দেখে এগিয়ে যান বেলজিয়ামের অধিনায়ক এডিন হ্যাজার্ড। টেনে তোলেন প্রতিপক্ষ তারকাকে।
কোচকে শুধু এখানেই অনুসরণ করেননি হ্যাজার্ড। ব্রাজিলকে হারানোর পরে গোটা বেলজিয়াম দল যখন জয়োৎসব করেছে, তখন অঁরির দিকে ক্যামেরা ধরতেই দেখা যায় মাঠে ছড়িয়ে থাকা বোতল কুড়িয়ে ড্রেসিংরুমে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাকে দেখে একে একে, সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন হ্যাজার্ড, ভিনসেন্ট কোম্পানি, রোমেলু লুকাকু, কেভিন ডি ব্রুইনেরা।
এই দৃশ্য দেখার পর বিশ্লেষকরা বলছেন, বেলজিয়াম দলের বোঝাপড়ার কোনও অভাব নেই। মাঠে নেইমারদের বিরুদ্ধে যেভাবে দল হিসেবে তারা খেলেছেন, মাঠের বাইরেও একই ভাবে একে অপরকে সাহায্য করছেন।
তবে এবারই অঁরির আসল পরীক্ষা। সেমিফাইনালে হ্যাজার্ডদের বেলজিয়ামের পরের ম্যাচ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে। যে দেশে জন্মেছেন, যে দেশকে বিশ্বকাপ এবং ইউরো দিয়েছেন, তাদেরই ফাইনালে ওঠা থেকে আটকাতে হবে তাকে।
কিন্তু অঁরিকে নিয়ে হঠাতই শুরু হয়েছে সমালোচনা। তার একসময়ের সতীর্থ উইলিয়াম গালাস বলেছেন, ‘অঁরির বেলজিয়ামকে কোচিং করানোর সিদ্ধান্ত লজ্জার।’ তার দাবি, অঁরির সাহায্য করা উচিত ছিল গ্রিজম্যানদের।
ফরাসি কিংবদন্তি অবশ্য এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। তার ফোকাসে শুধুই বিশ্বকাপ। আর ফাইনালে ওঠার জন্য হয়তো সাবেক ফরাসি তারকার টোটকাই প্রধান অস্ত্র ইউরোপের ‘কালো ঘোড়াদের’ কাছে।






