বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করেন এবং তারা করোনা ভাইরাসের মহামারী নিয়ে মোটেও ভীতস্বন্ত্রস্ত্র নয়। পাশাপাশি করোনার ভয়াবহতা প্রকট আকার ধারণ করায় শহরে বসবাসকারী মানুষেরাও গ্রামে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সমগ্র বিশ্বের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে করোনা সংকট মোকাবেলায় যে ধরনের ব্যবস্থা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন গ্রামে তার ছিঁটেফোটাও চোখে পড়ছে না। তবে মসজিদে দু-একবার মাইকিং করে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছে সেটি সত্য কিন্তু ঐ রকম সতর্কবার্তা খুব বেশি কাজে আসছে না। কারণ গ্রামের মানুষ করোনাকে তেমন পাত্তা দিচ্ছে না যদিও টিভি মিডিয়াতে করোনা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সংবাদের ভয়াবহতা উল্লেখ করে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে।
চ্যানেল আই অনলাইনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিগত ২৪ ঘন্টায় করোনায় নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৪ জন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৭ জন, সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন ৩ জন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৫০ জন, হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১৪০০০ জন, আইসোলেশনে রয়েছে ৩০ জন এবং করোনায় মৃত্যু হয়েছে ২ জনের।
কাজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে বাংলাদেশে করোনার সার্বিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটা বলা মুশকিল তবে ডাক্তারদের সঙ্গে আলাপে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থার চিত্রই উঠে আসবে বলে মনে হয়। ইটালিতে প্রথম করোনায় একজনের আক্রান্ত হওয়ার খবরে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইতালিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ইতিমধ্যে চীনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। কাজেই এখনো সময় আছে যতদ্রুত সম্ভব করোনা প্রতিরোধে উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অবশ্যম্ভাবী। অন্যদিকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ১৩ হাজার, আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ এবং ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন প্রায় ১ লাখ মানুষ।
‘করোনা শহুরে মানুষের অসুখ, গরিব মানুষের করোনা বেরাম হবে না’-গ্রামের মানুষের অনেকেই এ কথার উপর ভরসা করে দিনাতিপাত করছে। করোনার ভয়াবহতা নিয়ে তারা মোটেই শঙ্কাগ্রস্ত নয়, সৃষ্টিকর্তার উপর তাদের অগাধ বিশ্বাস এবং সে কারণে তারা মনে করছে সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে ভয়াবহ মরণব্যধি থেকে যে কোন উপায়ে রক্ষা করবে। তবে সৃষ্টিকর্তা জীবনযাপনের জন্য নানা ধরনের পদ্ধতি ও উপায়ের চিত্র বাতলে দিয়েছেন সে কথা তারা বেমালুম ভুলে গিয়েছে। তারা কোন ধরনের যুক্তি মানতে নারাজ, নিজেদের মতো করেই চলছে এবং এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশেকে ভয়ঙ্কর পরিণতি বহন করতে হবে এবং দীর্ঘদিন ক্ষয়ক্ষতির খেসারত দিতে হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে। করোনায় স্থায়িত্বের কাল যদি বৃদ্ধি পায় তাহলে সমাজে নানা ধরনের অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্রামের বাজারের চিত্র থেকে বিশেষ করে ব্যবসায়িক লেনদেন দেখে কিন্তু আপনি তাদের কথা কাজের সঙ্গতি খুঁজে পাবেন না। কেননা গতকাল গ্রামের একটি বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৯০ টাকা দরে বিক্রি হয় এবং পুলিশ বাজার মনিটর করার পরে প্রতি কেজি ৫০-৫৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। গ্রামের বাজারে ব্যবসায়ী নিশ্চয়ই শহর থেকে আসেনি, গ্রামের মানুষই বাজারে ছোটখাট ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে। বিষয়টা কতটা অনৈতিক এবং অপাঙক্তেয়। যারা বিশ্বাস করে সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে করোনার মহামারী থেকে রক্ষা করবে (কিন্তু সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নিয়ম কানুন অনুসরণ করে না), তারাই সাধারণ মানুষের জটিলতার সুযোগ নিয়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম বাজার মূল্যের চেয়ে ৩৫-৪৫ টাকা বেশি দরে বিক্রি করছে। কাজেই বোঝা যাচ্ছে সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাদের কতটুকু বিশ্বাস, আস্থা রয়েছে; যদি প্রকৃতঅর্থেই থেকে থাকতো তাহলে কিন্তু তারা বাজারে পণ্যের যথাযথ সরবরাহ থাকা স্বত্ত্বেও অধিক মুনাফার লোভে রাষ্ট্রীয় সংকটের সময় কখনো অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রয় করার মনোবাসনা দেখাতো না।
বর্তমানে গ্রামে যে পরিস্থিতিগুলো বিদ্যমান তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে; বাড়িতে মহিলারা এখনো জটলা বসিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। ছোট ছেলেমেয়েদের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বরাবরের ন্যায় তারা উদাসীন। বাইরে থেকে এসে হাত ঠিকভাবে পরিচ্ছন্ন না করেই ঘরে প্রবেশ করছে। স্যানিটারির বিষয়েও তাদের মধ্যে মারত্নক সচেতনতার অভাব।আবার অনেকেই আছে ৫-৭ দিন ধরে জ্বর, সর্দি, কফে ভুগলেও ডাক্তারের কাছে না গিয়ে স্বাভাবিক ভাবে চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গ্রামে করোনার প্রাদুর্ভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবার আশংকা রয়েছে।
পুলিশ যেভাবে গ্রামের বাজারে এসে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে ঠিক তেমনভিাবে প্রশাসনের যথার্থ উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। কেননা এখনো অনেক গ্রাম রয়েছে যেখানে বিদেশ ফেরত মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে এবং সে সব গ্রামে এখনো করোনা সংক্রমনে কেউ আক্রমণের শিকার হয়েছে এমন নজির নেই; সে সকল গ্রামে অতি শিগগির চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে করোনার ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে গ্রামের বাজারের চায়ের দোকানগুলোতে এখনো পূর্বের ন্যায় ভীড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জনসমাবেশ এড়িয়ে চলার কথা বিশেষ সতর্কতার সহিত বলা হলেও প্রত্যেক গ্রামেই নিশ্চিত করে বলা যায় চায়ের দোকানগুলোই এক একটা জটলা। যেহেতু হাঁচি-কাশি ও আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে করোনা সংক্রমিত হতে পারে সেহেতু চায়ের দোকানগুলোর মাধ্যমে করোনা সংক্রমিত হতে পারে খুব সহজেই। যে কোন মূল্যে গ্রামের বাজারে জরুরী প্রয়োজনে ব্যবহৃত দোকান খোলা রেখে বাকি সব কিছু অনতিবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন।
গ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কাজে লাগানো যেতে পারে এবং তাঁরা স্ব-উদ্যোগে জনসাধারণকে সচেতন করার চেষ্টা গ্রহণ করতে পারে। তবে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করার কোন প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিবিশেষে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে মহল্লায় জনসচেতনতা তৈরির কাজ করা যেতে পারে।পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে হার্ডলাইনে যেতে হবে-কেননা ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করার নীতি গ্রহণ ব্যতিরেকে গ্রামের মানুষদের করোনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ কোনভাবেই সম্ভব হবে না বলেই মনে হচ্ছে। কাজেই সার্বিক দিক বিবেচনায় স্থানীয় মসজিদের ইমাম, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে করোনা প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ ব্যতীত মহামারী ঠেকানো কখনোই সম্ভব নয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







