যিনি গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে ভারতের ১৪টি রাজ্যের ৯৩টি হ্রদ এবং জলাশয় পরিষ্কার করেছেন।
আবর্জনা পরিষ্কার করা অনেকের পক্ষে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ভারতের চেন্নাই ভিত্তিক তরুণ পরিবেশবিদ অরুণ কৃষ্ণমূর্তির কাছে পরিচ্ছন্নতার কাজই অনুপ্রেরণার। গুগলে নিজের আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে এই তরুণ গড়ে তুলেছেন পরিবেশ আন্দোলন। তার এই আন্দোলন অবশ্য কোনো ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গলা ফাটানো বা মানববন্ধন করা নয়। তিনি একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তারপর পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি আন্তরিক এমন কিছু তরুণ, স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী এবং প্রবীণদের সংঘবদ্ধ করেছেন। এভাবে তিনি এরই মধ্যে পরিষ্কার ও উদ্ধার করেছেন ভারতের ১৪টি রাজ্যের অন্তত ৯৩টি হ্রদ ও জলাশয়।
ইন্ডিয়া টাইমস বলছে, অরুণের এই নিরবিচ্ছিন্ন উদ্যোগ তাকে একজন তরুণ পরিবেশবিদের সুখ্যাতি এনে দিয়েছে।
অরুণের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্টালিস্ট ফাউন্টেশন অব ইন্ডিয়া (ইএফআই)’ এরই মধ্যে একটি পরিবেশ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এটি একটি অলাভজনক বন্যজীবন সংরক্ষণ, হ্রদ, জলাশয় পুনরুদ্ধারকারী গ্রুপ। ২০০৭ সালে সংগঠনটির যাত্রা শুরুর পর থেকে তারা বিভিন্ন হ্রদ এবং জলাশয় থেকে জঞ্জাল, আবর্জনা এবং ক্ষতিকর উদ্ভিদ প্রজাতি সরিয়ে নিয়েছে, যা প্রকৃতির পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক।
অরুণ কৃষ্ণমূর্তি ভারতের চেন্নাইয়ের এমন একটি এলাকায় বেড়ে ওঠেন, যেখানে জীবনের শুরু থেকে জলাশয়ের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়। ফলে একসময় নিজের বিলাসবহুল জীবন পেছনে ফেলে এই তরুণ কেবল ব্যাঙ, মাছ, পাখি এবং সবুজায়নেপূর্ণ পরিচ্ছন্ন হ্রদ ও জলাশয় নিশ্চিত করার কাজে নেমে পড়েন।

৩২ বছর বয়স্ক এই পরিবেশকর্মী বলেছেন যে, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দেয়া তার জন্য কোনো কঠিন কাজ ছিলো না। কেননা তিনি জীবনে যা কিছু করেছেন, সে বিষয়ে কখনোই অনিশ্চিত ছিলেন না।
প্রথম দিকে পরিষ্কার এবং সবুজ পরিবেশ এর জন্য তিনি চেন্নাইয়ের স্থানীয় পঞ্চায়েত এর সহযোগিতায় জলাশয় পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন। পরবর্তীকালে তার এই উদ্যোগ অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে এই তরুণ উদ্যমী পরিবেশবিদকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
‘আমরা কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে কাজ করি। এর জন্য আমরা কোনো ফান্ড গ্রহণ করি না। তবে এই কাজের অনুমতি এবং অনুমোদনের জন্য তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশজুড়ে মিঠা পানির হ্রদ এবং জলাশয়গুলি পুনরুদ্ধারে আমাদের মতো আগ্রহীদের উৎসাহিত করতে প্রশাসনের ইতিবাচক মানসিকতা রয়েছে’-এক সাক্ষাতকারে বলছিলেন অরুণ কৃষ্ণমূর্তি।
অরুণের কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছেন স্কুল-পড়ুয়া থেকে শুরু করে পরিবেশ সংরক্ষণে অভিজ্ঞ প্রবীণরাও। ‘ভারত এবং তার পরিবেশ এর জন্য ইএফআই স্বেচ্ছাসেবী’ স্লোগান ধারণ করে সংগঠনটি স্বেচ্ছাসেবী আহ্বান করে থাকে। সংগঠনটি চেন্নাইয়ের এগাটুর জলাশয়, কিনাথুকাদাবু সিস্টেম জলাসয়সমূহ, টুটিকোরিনের পেই কুলামসহ বিভিন্ন জলাশয়ের জঞ্জাল, আবর্জনা, আক্রমণাত্মক আগাছা পরিষ্কার করেছে।
নিজেদের কাজকে মজাদার ও শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে সংগঠনটি ‘সাইক্লেকস’ নামে একটি ইউনিক প্রকল্প আরম্ভ করেছে। যা শিশুদের প্রাকৃতিক বিস্ময়ের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যগুলি অনুধাবন করার জন্য হ্রদ ও তার আশপাশের আবাসন এলাকায় সাপ্তাহিক সাইকেল ভ্রমণের ব্যবস্থা করে থাকে।
তাদের আর একটি সৃজনশীল এবং ইন্টারেক্টিভ উদ্যোগ হলো, ‘ওয়াল-ই’- কর্মসূচি। এটি একটি সচেতনতামূলক স্বেচ্ছাসেবী দেয়ালচিত্রাঙ্কন উদ্যোগ। যেখানে ভারতের বন্যজীবন এবং প্রাকৃতিক আবাসকে জনপ্রিয় করতে জীববৈচিত্র্যের তথ্যগুলো দেয়ালে অঙ্কন করা হয়।
এভাবে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সচতেনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আরও অনেক ব্যক্তি এবং সংস্থা এই উদ্যোগকে সমর্থন করছেন। সরকারের দিকনির্দেশনা ছাড়াও দ্য হিন্দুজা ফাউন্ডেশন, দ্য মুরুগাপ্পা গ্রুপ, শ্রীরাম গ্রুপ এবং অন্য অনেক অংশীদারি সংগঠন তাদেরকে তহবিল ও স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সমর্থন করছে।
কৃষ্ণমূর্তির এই প্রচেষ্টা তাকে এনে দিয়েছে ‘এন্টারপ্রাইজ রোলেক্স অ্যাওয়ার্ডস-২০১২’, যা বিশ্বের জীবমান উন্নতি, জ্ঞানকে প্রসারিত করা, বড় চ্যালেঞ্জগুলির সমাধানের প্রস্তাব দেয়া বা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এমন উদ্ভাবনী প্রকল্পের ব্যক্তিদের সহায়তা ও উৎসাহিত করতে প্রদান করা হয়।
মানুষকে সচেতন করা এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা এই কর্মীর পক্ষে সবচেয়ে কঠিন বলে মনে হয়েছিলো।
তিনি বলেছেন, ‘স্থানীয় সম্প্রদায়কে সুপেয় পানির হ্রদ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো বড় রকমের ধাঁধা। আমরা যদি একবার স্থানীয়দের এই কাজে সম্পৃক্ত করতে পারি, তাহলে আমাদের আর চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন হবে না। তাদের বোঝাতে হবে যে, সমস্ত সমস্যা থেকে মুক্ত হতে জলাশয়গুলিকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে’।
প্রাকৃতিক সৌন্দয সুরক্ষার জন্য অরুণ কৃষ্ণমুর্তি সবাইকে লক্ষ্য করে একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন এভাবে, ‘ভারতের পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। সবাইকে আমাদের জাতির প্রাকৃতিক ইতিহাস বুঝতে শেখা প্রয়োজন এবং এর সংরক্ষণের জন্য একত্রে কাজ শুরু করা উচিত’।
অরুণের এই উদ্যোগ এরই মধ্যে চেন্নাই, মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতা, পুনে, হায়দরাবাদ, কয়ম্বাতুর, পুডুচেরি, থিরুবনন্তুপুরম, বেঙ্গালুরু, তিরুনেলভেলি এবং আহমেদবাদ প্রভৃতি শহরে প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে অরুণ কৃষ্ণমূর্তির সংগঠন ৩৯টি সক্রিয় প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। শিগগিরই এটি বিজওয়াদা, মাইসুরু এবং কন্যাকুমারীতেও পুরোদমে কাজ শুরু করবে।









