মানুষের দোষ ধরাটা আমাদের জন্মগত সমস্যা। আমাদের মানে বাংলাদেশিদের। কোন কিছুর ছুতো পেলেই আমরা দোষ ধরে বসি। প্রমাণ লাগে না। যুক্তিতর্ক ছাড়াই আমরা কাউকে দায়ী করে থাকি। সংশ্লিষ্ট কোন ঘটনার আশেপাশে অপছন্দের কেউ থাকে, তাহলে তো কথায় নাই, কোন প্রমাণ ছাড়াই তাকে দায়ী করে বিচার কাজ শেষ করে ফেলি। অপরের দোষ খুঁজে বেড়ানোই আমাদের প্রধান বিনোদন। কোন কিছু একমত হতে তো পারিই না, আবার না জেনে না বুঝে কিংবা না শুনে মতামত দেয়াটা অপরিহার্য বলে মনে করি। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত এত কিছু হয়ে যাচ্ছে তা থেকে শিক্ষা নেয়াটা প্রয়োজন বলে মনেই করি না।
গত মঙ্গলবার লোয়ার ম্যানহাটানে ঘটে গেল ট্রাক হামলা, এতে প্রাণ হারায় ৮ জন ব্যক্তি, যার মধ্যে পাঁচজন আর্জেন্টিনার নাগরিক। তারা রোজারিও নগরী থেকে এক স্কুলের পুনর্মিলনীতে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরে এসেছিলেন। ৯/১১-এর স্মারক স্তম্ভ থেকে অল্প দূরত্বের ওয়েস্ট সাইথ অব লোয়ার ম্যানহাটানে এ ট্রাক হামলা চালানো হয়। হামলায় আরো ১১ জন গুরুতর আহত হয়েছে। এ সময় স্কুলের শিশু ও অভিভাবকরা হ্যালোইন উৎসব উদযাপনের জন্য সেখানে সমবেত হয়েছিল। তারা আমেরিকা এসেছিল একটি স্কুলের রিইউনিয়নে যোগ দিতে।
নিউইয়র্কের রাস্তায় মানুষের ওপর পিক-আপ ট্রাক তুলে আটজনকে হত্যার জন্য দায়ী যুবক সম্পর্কে জানা যায়, সাইফুল্লা হাবিবুলেভিক সাইপোভ (২৯) নামে এই যুবক উজবেকিস্তান থেকে আসা একজন অভিবাসী। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে, তার ট্রাকের ভেতর এমন একটি কাগজ পাওয়া গেছে যাতে ওই যুবক লিখে রেখেছে যে, সে ইসলামিক স্টেটের সমর্থনে এই হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে।
হামলাকারী মুসলিম হওয়াতে এদেশে বসবাসকারী মুসলিমরা আবারো উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাতে শুরু করেছে। কারন হেট ক্রাইমের শিকার হবার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। পরদিন ক্লাসে গেলাম যথারীতি, পুরা ক্লাসে ২২ জন শিক্ষার্থী এর মধ্যে আমরা দুইজন শুধু মুসলিম। ক্যাম্পাসে আলোচনাও হলো। আমাদের ক্লাসে ৫/৬ঘন্টায় না শিক্ষক না শিক্ষার্থী এই বিষয়ে কথা বলল। না আমাদের দিকে বক্র দৃষ্টিতে ভস্ম করার জন্য তাকালো কিম্বা টেরোরিস্ট টেরোরিস্ট করে আওয়াজ দিল, বা পাশে বসবে না বলে উঠে গেল। সিলেবাসের বাইরে দুনিয়ার বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন শিক্ষকরা।
বাংলাদেশিরা হলে ধর্মীয় কারণে দুই সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের সবাই মিলে নাজেহাল করে ছাড়ত। মুস্টিমেয় কিছু ব্যক্তির জন্য সমগ্র জাতি যে খারাপ না এই বোধ এদেশের অধিকাংশ মানুষের আছে। তাই এতো কিছুর পরেও বুক ফুলিয়ে এদেশের রাস্তায় মানুষ হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে নিরাপদে।
ক’দিন আগে খালেদা জিয়া গেলেন মিয়ানমার থেকে আগত শরণার্থীদের ত্রাণ দিতে। তার গাড়ি বহরে করা হল হামলা। ব্যস! এরপর থেকেই শুরু হয়ে গেল কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি। মনের মাধুরী মিশিয়ে এ ওকে দায়ী করছে। এমনকি অডিও ক্যাসেটও বের হয়ে গেল হামলা পরিকল্পনার কথপোকথন। আজব আমরা। আওয়ামী লীগ দায়ী করছে বিএনপির এক নেতা ডা.শাহাদাতের নামে। আর এদিকে কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা করা হয় বলে খবর প্রকাশ হয়। যদিও বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, শর্শদী ইউপি চেয়ারম্যান জানে আলমের নেতৃত্বে হামলায় চালায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়েল ও তার কর্মীরা।
ব্লেম গেম, আর ডিনাইলে ভরপুর আমাদের রাজনৈতিক জীবন। আমি একজনকে দায়ী করে নিউজ করে দেব কিন্তু তার বক্তব্য থাকবে না এমনকি তাকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও উল্লেখ নেই। তাহলে ঘটনার তদন্ত না করে প্রমাণ ছাড়া একজনকে দায় করা হয় কী করে। আওয়ামী লীগের এখন শক্ত অবস্থান রাজনীতিতে। ক্ষমতায় আছে বলা বাহুল্য যে তারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতেই পারে। কারো গাড়ি বহরে হামলা করে নিচু রাজনীতির পরিচয় দেয়ার কোন মানে নেই। কারণ এতে আরো বেশি সংবাদ শিরোনামে আসবে। আওয়ামী লীগই বিএনপির ঢোল বাজিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রচার প্রচারনার দায়িত্ব নিয়েছে হামলা ঝামেলা করে। আর বিএনপির কথা নাই বললাম, দলটি কি এতো বোকা! আশার টিমটিম করে জ্বলতে থাকা বাতিটি ফু দিয়ে নিভিয়ে দেবে। খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলার জন্য দায়ী করে অডিওটি বানানো যেমন নিচু কাজ, আরো নিচু কাজ কোন তথ্য প্রমাণ ছাড়া একজন কর্মকর্তাকে গাড়ি বহরে হামলা মূল পরিকল্পনাকারী বলে সংবাদ পরিবেশন করা। হামলা ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিৎ। দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর সাজা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এইধরনের হামলা-মামলার কালচার বন্ধ হওয়া উচিৎ। বন্ধ হওয়া উচিৎ ব্লেম গেম ও ডিনাইলের রাজনীতির। তথ্য প্রমাণ ছাড়া তথ্য উপসচিবকে জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।
আমাদের বাংলাদেশিদের মধ্যে নেই কোন একতা, কোন বিষয়ে আমরা একমত হতে পারি না, এমনকি জাতীয় স্বার্থেও না। আমরা সব বিষয়ে মতামত প্রকাশ করি, যুক্তির ধার না ধেরে আমরা কু-তর্কে মাতি। আমাদের আলোচনার চাইতে সমালোচনা করতে বেশি পছন্দ করি। আমরা কোন বিষয়ের গভীরে যাই না। আমরা অতি জাজমেন্টাল ও দ্বিধা-বিভক্ত জাতি। আমাদের উন্নতির চেয়ে অবনতির পাল্লা ভারি।
এখানে মুসলিম জেনেও আমাদের কেউ শ্রেনী কক্ষে নাজেহাল করছে না। আর আমাদের প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের শিক্ষকরা নিজেরা একে অন্যকে ফুটবল বানিয়ে লাথালাথি করছেন, ঘুষি মেরে নাক ফাটাচ্ছেন। আর আমাদের ছাত্ররা গাঁজা খাওয়ার দাবিতে মারামারি করছে। এমনই তো হবার কথা, যোগ্যতার বদলে যেখানে অর্থ ও ক্ষমতা কাজ করে সেখানে মূল্যবোধ, বিবেক, জ্ঞান ও মান আশা করাই ধৃষ্টতা। চেয়ে চেয়ে দেখে যাওয়া ছাড়া কারো কিছু করার নেই, কারণ সবাই আমরা গা বাঁচিয়ে চলছি। প্রতিবাদি হই না, হয়ে উঠি মোসাহেব, খুঁজি কোনভাবে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার উপায়।
অন্যায় আর অন্যায়কারীর সাথে আপোষ করি, ক্ষমতার কাছে নতজানু হই আর ভাবি যার যা হয়ে যাক, আমার ঘাড়ে তো পরেনি, আমি তো বেঁচে আছি। আমরা উটপাখি হয়ে বেঁচে আছি, এইভাবেই হয়ত মরেও যাব। চারপাশে চলুক অন্যায়ের উৎসব।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








