এত তাড়া! কীসের এত তাড়া! তাড়া না তাড়না? একের পর এক ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তরতাজা প্রাণগুলো অকালে মর্মান্তিকভাবে ঝরে যাচ্ছে, কত বাবা-মা স্বজন-প্রিয়জনের কত স্বপ্ন কত আশা-আকাঙ্ক্ষা চুরমার হয়ে যাচ্ছে—তবু হুঁশ হচ্ছে না কারও! সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে এত প্রচার এত সভা সেমিনার অনুষ্ঠান রোড শো পইপই করে এত বোঝানো এত টাকাপয়সা খরচ—সব বৃথা! কেউ শুনবে না বুঝবে না। রাস্তায় চলতে ফিরতে নিজেদের নিরাপত্তার কথাটাও ভাববে না মানুষ! লোকে বলে, প্রাণের মায়া নাকি সবচেয়ে বড় মায়া। এখন তো দেখে শুনে মনে হচ্ছে—প্রাণের মায়াটাও বোধহয় আর আগের মতো নেই। এখন প্রাণের মায়া ছাপিয়ে উঠছে এক ধরনের তাড়না, উন্মাদনা। আর তার মোহে পড়ে প্রাণের মায়া জীবনের মূল্য সব তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। বড় হয়ে উঠছে ঝড়ের বেগে উড়ে চলার সাময়িক রোমাঞ্চ, গতির উন্মাদনা। আর এই উন্মাদনার আনন্দ অনেকক্ষেত্রেই শেষ হচ্ছে বুকফাটা বিলাপে। কিন্তু, তাতেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে কই! উদ্দাম গতির উত্তেজনা উপভোগ করতে গিয়ে মৃত্যুর ফাঁদে পড়ে একের পর এক জীবন তো হারিয়েই চলেছে।
সড়ক দুর্ঘটনা যেন আকস্মিক মহামারীর রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন কেউ না কেউ বলি হচ্ছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। কিছুদিন ধরে মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজধানীর পান্থপথে ৩ এপ্রিল রাজীবের হাত কাটা পড়ল, তারপর আহত হলো রোজিনা। দু’জনকেই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ৫ এপ্রিল সকালে গৃহবধূ আয়েশা খাতুনের মেরুদণ্ড ভাঙল, আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তিনি আর কোনোদিন দাঁড়াতে পারবেন কি না। ১১ এপ্রিল ফার্মগেটে বেসরকারি চাকরিজীবী রুনি আক্তারের পা থেঁতলে গেল, পায়ের কার্যক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ফেনীতে যাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে মা ও মেয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। রাজধানীতে ট্যাক্সিক্যাবের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন। রাজধানীর মালিবাগ মোড়ে চলন্ত অবস্থায় নারী যাত্রীকে নামাতে গিয়ে তার ডান পায়ের পাতার ওপর দিয়ে চলে গেছে বাসের চাকা। নিলুফা বেগম (৪০) নামের গৃহবধূ এ দুর্ঘটনার শিকার হন।
গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে হানিফ ফ্লাইওভারের ঢালে গ্রিন লাইন পরিবহনের চালক গাড়ি তুলে দিয়েছিলেন প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকারের বাঁ পায়ের ওপর। এতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তার পা। বর্তমানে পিআর এনার্জির চালক রাসেল এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নওগাঁ শহরের বাইপাস সড়কে ভটভটির চাপায় পা হারানোর পর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিশোর নিলয় মারা গত ৪ মে মারা গেছেন।
সবগুলো মর্মান্তিক কাহিনীর পেছনে একমাত্র কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছে। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং চিত্রগ্রাহক ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের জোঁকা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর বাসসের সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক জগলুল আহমেদ চৌধুরী কারওয়ানবাজার এলাকায় বাস থেকে নামতে গিয়ে সেই বাসের পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে। এই ঢাকা নগরের জনাকীর্ণ রাজপথে প্রতিনিয়ত কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, হাত-পা খোয়াচ্ছে, তা নিয়ে কি খুব বেশি ভাবি আমরা? এ যেন ডালভাত। রাজীবের হাত হারানোর মতো দু-একটা ঘটনা কদাচিৎ আলোড়ন তোলে, তারপর তা হারিয়ে যায় অন্য কোনো ইস্যুর অতলে। আমরা দেখি, বুঝি, উপলব্ধি করি, তারপর মুখ ঘুরিয়ে ফেলি। সামনে কত ঘটনা, কত সমস্যা, একটা নিয়ে পড়ে কে থাকে?
বিভিন্ন সংস্থা কিংবা ব্যক্তি পর্যায় থেকে বহুবার সড়ক দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিকারের উপায় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পরও এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। যান চালকদের বিরুদ্ধে একটু কড়াকড়ি করলেই সব কিছু অচল করে দেয়া হয়। সরকারও নতজানু আজ পরিবহন-সন্ত্রাসীদের কাছে! নিয়ম-নীতি-আইন-সব তুচ্ছ। স্বেচ্ছাচারিতা, হাত-পা-শরীর ক্ষতবিক্ষত হওয়া আর মৃত্যুই যেন শেষ কথা! এটাই কি আমাদের একমাত্র ভবিতব্য? কোথায় নিদান? কোথায় এই দুর্ঘটনা ঠেকানোর উদ্যোগ? সরকার কি কিছুই করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে?
১৯৮৯ সালে দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু মতিঝিলের আনন্দ ভবন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। ১৯৯১ সালে তার স্ত্রী রওশন আরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২৫ বছর পর ২০১৪ সালের ২০ জুলাই সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর পরিবারকে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে রায় দেন আপিল বিভাগ। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কাউকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে রায় ঘোষণা দেশে এটিই প্রথম। ভাবা হয়েছিল, আদালতের এই রায়ের পর পরিস্থিতি বদলাবে। সরকার উদ্যোগী হবে। চালকরা সতর্ক হবে! কিন্তু কোথায় কি?
আইনকেও এখন ঠুঁটোজগন্নাথ বানিয়ে রাখা হয়েছে। আর তা ছাড়া সবাই তো আর মামলা লড়ে না, ক্ষতিপূরণও পায় না। আর ক্ষতিপূরণ পেলেই বা কি? টাকা-পয়সা দিয়ে কি জীবনের ক্ষতিপূরণ হয়?
প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বেপরোয়া গতির মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষজনকে। এবং নিরাপত্তার প্রাথমিক শর্তগুলো উপেক্ষা করাতেও কত যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে তা বলে শেষ করা যাবে না।বেশ কিছুদিন ধরেই ঢাকা শহর ও শহরতলিতে এমনকী গ্রাম মফস্বলেও এক শ্রেণির বাইকের আমদানি হয়েছে যার আরোহীরা হেলমেট সিগন্যাল আইনকানুন পুলিশ—কিছুরই তোয়াক্কা করে না। বিদ্যুৎগতিতে বাইক চালিয়ে দিনরাতের শহর তোলপাড় করেই তাদের আনন্দ। ঘটনার পর ঘটনা ঘটছে, মৃত্যুর পর মৃত্যু—কিন্তু মহানগরীতে বিদ্যুৎগতি বাইকের উৎপাত কমছে না! শুধু বাইকই নয়, সব যানই এখন দূরন্ত গতিতে ছুটে চলতে চায়। যেন উলকার গতিতে ছুটে চলাটাই জীবন, মৃত্যু কোনও ব্যাপারই নয়!
ভাবখানা এমনই। আর এভাবেই আচ্ছন্ন আমাদের সমাজ, পরিবহন চালকরা। সেই ছোটবেলায় পড়েছিলাম, গতিই জীবন স্থিতিই মৃত্যু। তাই চরৈবেতি চরৈবেতি। সেই মন্ত্রেই যেন দীক্ষা নিয়েছে আজকের সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার নারীপুরুষ! উদ্দাম উল্লাসময় গতির দীক্ষা! অবশ্যই সকলে নয় কিন্তু অনেকেই। তবে, চরৈবেতি মানে তো আজ কেবল এগিয়ে চলা নয়, সবাইকে টপকে, সব রেকর্ড তছনছ করে জীবন বাজি রেখে প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে ছুটে চলা! আর সেই গতির আনন্দে মাতোয়ারা নেশায় বুঁদ জীবনগুলো তাৎক্ষণিক আবেগের আতিশয্যে রটেকগতির উন্মাদনায় ভুলেই যাচ্ছে—বাইকের চাকা দুটোকে অভিজ্ঞজনেরা কেন বলেন ‘শয়তানের চাকা’, কেন রাস্তায় গাড়ি চালাতে এত বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে সরকার। আসলে, সব যেন কেমন বেপরোয়া, বেহিসেবি, লাউড হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সে রাজনীতিই হোক কী জীবনযাপন—সর্বত্র সবসময় একটা যেন হইহই-চইচই হুল্লোড়-হুড়োহুড়ির প্রবণতা। আর কী আশ্চর্য, এই প্রবণতার এমনসব নির্মম নিষ্ঠুর পরিণতি দেখেও বেখেয়াল জনতা। বেখেয়াল কর্তৃপক্ষ! দেখেশুনে মনে হয়, ভাবনা-চিন্তার কোনও অবসরই যেন আর অবশিষ্ট নেই আমাদের জীবনে!
কিন্তু, গতির উন্মাদনায় এভাবে আর কত প্রাণ খোয়াব আমরা? কত মানুষের, কত প্রতিভার এমন অপমৃত্যু দেখব? আইন আছে, পুলিশ আছে। তা সত্ত্বেও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে যেন সব কেমন ঢিলেঢালা, অগোছালো! একটা দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন একটু কড়াকড়ি, তারপর যে-কে-সেই।
পরিস্থিতি যদি এমন হয় তাহলে সরকারের শত চেষ্টাতেও কি সড়ক দুর্ঘটনা রোখা যাবে? কোনো রকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, কিংবা আকণ্ঠ পান করে গাড়ি চালানো, বাইক চালানো এখন অনেকের কাছে একটা ফ্যাশনের মতো! তার জেরে যে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে এবং হচ্ছেও—সেটা কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনছে না। আর মুশকিলটা হল, এই উচ্ছৃঙ্খল উৎকট আবেগের বলি কেবল তারাই হচ্ছে না, হচ্ছেন অনেক ক্ষেত্রেই পথ-চলতি সাধারণ মানুষজনও!
সত্যি বলতে কী, দুরন্ত বাইক আর তিরগতি গাড়ি এখন কেবল ঢাকা নয় গোটার দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থার সামনে মূর্তিমান বিপদের মতো হয়ে উঠেছে। এদের সামলাতে ট্রাফিক পুলিশ হিমশিম। তাঁদের অসহায়তাটা সহজেই অনুমেয়। অসহায় তারা ব্যক্তিগত লোভের কাছেও। বেপরোয়া চালকদের কাছ থেকে ‘টুপাইস’ কামানোর ধান্দা তাদের অনেক ক্ষেত্রেই ‘কাকতাড়ুয়া’র ভূমিকায় পর্যবসিত করেছে।
বিশেষজ্ঞজনেরা তাই বলছেন, ট্রাফিকের এই অসহায়তা দূর করতে চাই আরও কড়া আইন এবং নজরদারি। চাই ‘লোভ’ সম্বরণের ম্যাকনিজম। সঙ্গে বেপরোয়া চালকদের জন্য আরও মোটা অঙ্কের জরিমানা। শুধু তাই নয়, মহানগরে শহরে মফস্বলে গাড়ি চলাচলে নিয়ন্ত্রণে চাই আরও বিধিনিষেধ। না হলে, বেপরোয়া গতির বেহিসেবি তাণ্ডব থেকে মানুষের জীবন বাঁচানো অদূর ভবিষ্যতে কঠিনতর হয়ে উঠবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







