১৩ মার্চ ২০১৭ খ্রি. সোমবার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক দিবস। নবীন একটি সাজানো গোছানো পরিবারের উপর প্রথম বড়সড় এক আঘাতের স্মৃতি মনে করার দিন। এই দিনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সজীব প্রাণে এক দুঃখগাঁথা এসে ভিড় জমায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিন এবং বুয়েটের কিছু বন্ধু মিলে ঠিক করে সবুজের প্রান্তরে ঘুরে বেড়াবে, উন্মুক্ত আকাশ দেখতে দেখতে ওদের মনের আকাশের তুলনা করবে, সত্যায়ন করবে বিশালতার। সমুদ্রের মতো মন নিয়ে আকাশ ছোঁয়ার অঙ্গীকারে সমুদ্রস্নানেই যাবার প্রচণ্ড ইচ্ছে যখন ওদের মনের মধ্যে তখন এদের যাত্রা স্থির হয় নিকটবর্তী সমুদ্র জলে একাকার ম্যানগ্রোভের ঐ বনে।
১ যুগ আগের কথা। ২০০৪ সালের ১৩ মার্চ।
কটকা নামক স্থানে আমাদের সোনার ছেলেমেয়েদের জীবনঘণ্টার কাঁটা আটকে যায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৯ জন এবং বুয়েটের ২ জনসহ মোট ১১ জন ছাত্র-ছাত্রী সমুদ্র গর্ভে নিমজ্জিত হয়ে যায়। সলিল সমাধি হয় তাদের। কি নিঃস্পৃহ বেদনায় আচ্ছাদিত হয় সমস্ত আকাশ! কি অদ্ভুত এক মহাট্র্যাজেডি নেমে আসে বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে সমস্ত দেশ জুড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৯ জন ছাত্র যারা এ দুর্ঘটনায় মারা যান তারা হলেন আরনাজ রিফাত রূপা, মোঃ মাহমুদুর রহমান, মাকসুমুল আজিজ মোস্তাজী, আব্দুল্লাহ হেল বাকী, কাজী মুয়ীদ বিন ওয়ালী, মোঃ কাওসার আহমেদ খান, মুনাদিল রায়হান বিন মাহবুব, মোঃ আশরাফুজ্জামান, মোঃ তৌহিদুল এনাম। আর বুয়েটের দু’জন ছাত্রের নাম সামিউল ও শাকিল। মূলত এই জন্যই প্রতিবছর এ দিনটিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
যারা মারা গেলো তাদের মধ্যে যার নাম তোহা সে ভালো গিটার বাজাতে পারতো। ভরাট কণ্ঠের মিশুক এই ছেলেটি যে কারো মন জয় করে নিতো তার বিনয় দিয়ে। ঢাকার বদরুন্নেসা কলেজ থেকে পাস করে খুলনায় পড়তে আসা রূপার শখ ছিলো রান্না করার। দারুণ লিখতে পারতো যে ছেলেটি তার নাম- অপু আর সর্বদা মুখে হাসি লেগে থাকা ছেলেটির নাম নিপুন। আমাদের যে ৯ জন মারা গেলো তাদের সবাই ক্যাম্পাসে খুব জনপ্রিয় ছিলো তাদের কর্মে, ব্যবহারে এবং তাদের নানান কুশীলতায়। এদের চলে যাওয়া তাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবেই দেখা হয়। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে আসার পর প্রায়ই এই জায়গায় আটকে যাই এসে। এখানে যেন আমাদের অনেক কিছু পাওয়া না পাওয়ার হিসেবে আটকে যায়। আমাদের প্রাণের হাসি যেন এখানে এসে থেমে যেতে চায়। আমি আস্তে আস্তে এদের সবার কথাই জানতে চেয়েছি এবং এখানকার আমাদের ছেলেমেয়েরা খুবই আগ্রহ নিয়েই সবকিছু বলতে পেরেছে।
গত কয়েকদিন ধরেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। ক্যাম্পাসে কটকা নামে যে স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে যেখানের আশেপাশে প্রায় আধা কিলোমিটার পর্যন্ত জায়গায় গাছগুলোতেও কালো কাপড়ে মোড়ানো হয়েছে। রাস্তায় আঁকা হয়েছে শোকের আবহে সাদাকালো আলপনা- যে আলপনায় লেখা হয়েছে দুঃখগাঁথা। আজ সকাল ১০টায় কালোব্যাজ ধারণ করে শোক র্যালিতে অংশ নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ ডিসিপ্লিনের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী। স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে গভীর ভালবাসায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকে সবাই অগ্রজদের শান্তি কামনায়। সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও তথ্য-চিত্র প্রদর্শন করে বারংবার স্মরণ করার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়। এইভাবেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় গভীর ভালবাসায় এইসব স্মৃতি ধারণ করে রাখে। একসাথে এতগুলো তাজা প্রাণ আর কখনোই যেন হারিয়ে না যায় সেই প্রার্থনা সবার। আমাদের দুঃখবোধের কমতি নেই, আমাদের আবেগ অঝর ধারায় কান্নায় শেষ হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই তার হারিয়ে যাওয়া সোনার ছেলেদের ভুলবে না। যারা চলে গেছে তাদের আমরা মনে রাখতে চাই তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতিকে আলিঙ্গন করে। শোক কাটিয়ে এগিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়।
জিইয়ে ধরে রাখবে শত স্মৃতি বিশ্বাসে রেখে- তোমাদের চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








