ক্ষমতার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে আবির্ভূত বিএনপি আজ ক্ষমতাহারা। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট না হলে কি এই দলে কেউ আসতো তখন? অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তখন ক্ষমতায় চলে গেল জিয়াউর রহমান৷ গঠন করলো জাগদল ও জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট৷ এই ফ্রন্টে অন্তর্ভূক্ত হলো কিছু বাম, কিছু ডান, কিছু রাজাকার৷
জিয়া প্রেসিডেন্ট না থাকলে কোনো দল যেত জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে? অথচ জিয়া নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিল৷ তবু তার দলে ও ফ্রন্টে নেতৃত্বের কাতারে চলে গেল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা৷ কারান্তরীন বামপন্থীরা দলে দলে কারামুক্ত হয়ে বিএনপিতে যোগ দিতে লাগলো৷ ক্ষমতাকে জায়েজ করতে হ্যাঁ না ভোট দিল৷ শতভাগের কাছাকাছি হ্যাঁ ভোট নিয়ে জিয়া তার ক্ষমতাগ্রহণকে বৈধ করল৷ ক্ষমতায় না থাকলে কি এত হ্যাঁ ভোট তিনি পেতেন? মুক্তিযোদ্ধা প্রেসিডেন্টের প্রধানমন্ত্রী হল বাম রাজাকার মশিউর রহমান যাদু মিয়া ও ডান রাজাকার শাহ আজিজুর রহমান৷ বাম, ডান, রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা সকলের সমন্বিত ক্ষমতামৈত্রীতে গঠিত হল তার মন্ত্রিসভা ও জাতীয় সংসদ৷
বিভিন্ন দলছুট সুবিধাভোগীদের নিয়ে শুরু হল বিএনপির যাত্রা৷ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান তাই এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিজের পক্ষে নিতে রাষ্ট্রীয় সংবিধান হতে তারা ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিল৷ পাকিস্তান, সৌদী আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থন ও আমেরিকাসহ পুঁজিবাদী বিশ্বের সমর্থন পেতে সংবিধানের ৪ মূলনীতির এক নীতি সমাজতন্ত্রও বাদ দিয়ে দিল৷ জিয়া এখানেই থেমে থাকলো না নিজের বিশেষত্ব প্রতিষ্ঠায় ৪ মূলনীতির এক নীতি বাঙালী জাতীয়তাবাদ বাদ দিয়ে সংযোজন করলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ৷ অথচ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধটি হয়েছিল এই ৪ মূলনীতির ভিত্তিতেই৷ জিয়াও এই যুদ্ধের একজন যোদ্ধা ছিলেন৷
এককথায় নিজের পক্ষকে শক্তিশালী করতে বাম, ডান, মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার সর্বস্তরের মানুষকেই বেছে নিলেন তিনি৷ এদেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার তিনিই শুরু করেন৷নিজে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া স্বত্তেও মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান জয় বাংলাকে বিসর্জন দিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ৷ কেন ১৯৭১ সালে কি তিনি জয়বাংলা বলেননি? তখন কোন মুক্তিযোদ্ধা কি জয়বাংলা না বলেছে? কে পাকিস্তানপন্থী আর কে বাংলাদেশপন্থী তা চিহ্নিত হত জয়বাংলা শ্লোগানের মধ্য দিয়েই৷ জয়বাংলা বললেই পাকবাহিনী তাকে গুলি করতো৷ অথচ ক্ষমতায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান বেমালুম জয়বাংলা ভুলে গিয়ে জিন্দাবাদ বলতে লাগলেন৷ তার আমলে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনীরা বড় আদরে পোষিত ছিল৷ বড় আদরে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারেরা৷ ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার কাজটা তিনিই শুরু করে গেলেন৷ তারই ধারাবাহিকতায় এরশাদও তা চালিয়ে গেলেন৷ জিয়া সংবিধান হতে কাটলেন ধর্মনিরপেক্ষতা৷
এরশাদ আরও এগিয়ে গিয়ে করলেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম৷ এখন সেটা সংবিধান হতে উঠাতে গেলেই ইসলাম গেল ইসলাম গেলো বলে তেড়ে আসে ইসলামপন্থী বিভিন্ন সংগঠন৷ আওয়ামী লীগ বারবার ক্ষমতায় এসেও এই ভয়ে সংবিধানের সাংঘর্ষিকতা দূর করে সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রণয়নে সাহসী উদ্যোগ নিতে পারলোনা৷
জিয়া বলতেন, উই মেইক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট৷ হ্যাঁ সত্যিই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে কঠিন করে যেতে পেরেছেন৷ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি বারবার ক্ষমতায় গিয়েও মুক্তিযুদ্ধের চার মূল নীতিকে যথার্থভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না৷ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধন বাতিল হলেও সরকার জামাতের রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করতে পারছে না৷ দলটিকে বিএনপি এখনও তার জোটে রেখেছে৷ জামাত তাদের দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় নির্বাচন না করতে পারলে কী হবে?তারা বিএনপির ধানের শীষ মার্কা নিয়ে ঠিকই নির্বাচন করে যাচ্ছে৷ যে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ৯ বছর আন্দোলন করেছে আওয়ামী লীগ৷ অতঃপর সর্বদলীয় গণঅভ্যুত্থানে তার পতন ঘটানো হয়৷ আওয়ামী লীগ ক্ষমতার রাজনীতির কৌশলগত প্রশ্নে এরশাদকে তার সঙ্গে রাখতে বাধ্য হয়েছে৷ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরেও তারা তার রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাতিল করতে পারলো না৷ যে হেফাজত ঢাকার শাপলা চত্বরে জড়ো হয়েছিল ধর্মীয় উন্মাদনায় সরকারকে ফেলে দিতে, সেদিন বিএনপি ও তার ২০ দল হেফাজতের পাশে রাজপথে নামার নির্দেশনা দিয়েছিল৷ আওয়ামী লীগের সাথে থেকেও সেদিন জাতীয় পার্টি(এরশাদ) হেফাজতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল৷ এমনই কঠিন সাংঘর্ষিক অবস্থানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সরকার দল আওয়ামী লীগকেও৷
আওয়ামী লীগ সরকারের নানা কর্মকাণ্ডে মানুষ আজ ত্যক্ত বিরক্ত হয়েও কিন্তু বিকল্প হিসাবে বিএনপিকে মেনে নিতে পারছে না৷ কেন পারছে না? তারা জয়বাংলার বিপক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে৷ তারা ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে৷ জামাতী নেতাদের ফাঁসি হলেও জামাত সঙ্গ ত্যাগের বিরুদ্ধে৷ বাংলাদেশের বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে যারা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে নেই যারা সরকারের সমালোচনায় লিপ্ত৷ তারাও কিন্তু বিএনপির পক্ষে যাচ্ছে না৷ কারণ বিএনপিই সংবিধান হতে সমাজতন্ত্রকে উঠিয়ে দিয়েছে৷ আর বামেদের মূল আদর্শই সমাজতন্ত্র৷ এভাবে জিয়া যেমন গোটা রাজনীতিকেও কঠিন ও জটিল করেছেন তেমনই নিজের হাতে গড়া দল বিএনপিকেও এক কঠিনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন৷ জনজীবনের নানা সমস্যা নিয়ে তারা কোন কর্মসূচিও দিতে পারছে না৷ সিটি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে তারা হরতাল দিলো৷ কিন্তু তা পালিত হলো না৷ গাড়িঘোড়া,দোকানপাট ও অফিস আদালত সব স্বাভাবিকভাবেই চললো৷
দলটির চেয়ারপার্সন কারাগারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিল আরেক দণ্ডিত ও ফেরারী আসামী তারেক রহমানকে৷ বিএনপির তাত্ত্বিক খ্যাত জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রকাশ্যেই বলছেন, তারেক রহমানের রাজনীতি বাদ দিয়ে পড়াশোনা করা উচিত৷ এমন একজন অনভিজ্ঞ ও ফেরারী ব্যক্তিকেই কেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বানাতে হল? একটি দল কতটা নেতৃত্বশূন্য হলে এমনটি হতে পারে? আগাগোড়া স্ববিরোধী অবস্থানের মধ্য দিয়ে চলছে দলটি৷ ক্ষমতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ঘরানার নেতাদের নিয়ে গঠিত দলটি আজ ক্ষমতার কাছেই হেরে গেল৷ দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও জনজীবনের নানা সমস্যা নিয়ে কোন কর্মসূচী না দিতে পারার দায়ও কি ক্ষমতারই? পৃথিবীর কোন সরকার বিরোধী দলকে কর্মসূচী দিতে উদ্বুদ্ধ করে? সরকারী নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই কি এসব কর্মসূচী দিতে হয় না? বিএনপি কেন এমনটি করতে পারছে না এর দায় কি কেবলই সরকারের? বিএনপির নয়?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







