মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন হতে শুরু করে মাজারের খাদেম পর্যন্ত সকলেরই পেশাদারিত্ব রয়েছে। পেশাদারিত্ব রয়েছে মন্ত্রীর, সাংসদের, সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীর ও বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। বাসস্ট্যান্ডের যে শ্রমিক নেতা তারও পেশাদারিত্ব রয়েছে। পেশাদারিত্ব রয়েছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সেই সব কর্মকর্তা কর্মচারী যারা অজ্ঞাত মৃত লাশকে সমাহিত করার দায়িত্ব পালন করে। মন্দিরের পূজারী ঠাকুরদেরও পেশাদারিত্ব রয়েছে যাদের কাজ ঠাকুর ও ভগবানের বন্দনা করা। খ্রীষ্টান ধর্মীয় নেতা পোপেরও পেশাদারিত্বের নিশ্চয়তা রয়েছে। এ নিশ্চয়তা না পেলে কে পোপ হতে চাইবে? নিয়মিত বেতন ভাতা না পেলে কোন মসজিদের ইমাম সেই মসজিদে নামাজ পড়াবে?
বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় মসজিদের খতিব, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, প্রভৃতি কর্মকর্তা হওয়ার জন্য কত প্রতিযোগিতা ও তদবির দৃশ্যমান হয়। পেশাদারিত্বের নিশ্চয়তা না থাকলে কে দায়িত্ব নিতেন এসব পদের? কে বলতেন আমি বাংলাকে ভালবাসি তাই বাংলা ভাষার সেবার জন্যই আমি বাংলা একাডেমীর কর্মকর্তা হতে চাই। কে বলতেন, আমি গ্রন্থকে ভালবাসি তাই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মকর্তা হতে চাই। কে বলতেন, আমি ইসলামকে ভালবাসি তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব নিতে চাই। কে বলতেন, আমি শিল্পকলাকে ভালবাসি তাই এই প্রতিষ্ঠানের একটি পদে থাকতে চাই। কে বলতেন, আমি এ জাতির সকল মসজিদকে ভালবাসি তাই নিতে চাই জাতীয় মসজিদের খতিবের দায়িত্ব অথবা হতে চাই এর মুয়াজ্জিন। কে বলতেন, আমি জাতির মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চাই তাই হতে চাই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। পেশাদারিত্বের নিশ্চয়তা ও বাড়ি গাড়ির নিশ্চয়তা না পেলে কে নিতে চাইতেন এসব দায়িত্ব?
বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি প্রত্যাশীরা পোষ্টারে লিখে থাকে, আমাকে ভোট দিয়ে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন। এই জনসেবার কথা বলে নিজের সেবাটাকে পোক্ত করাই মূল ইচ্ছে নয় কি? নির্বাচিত হয়ে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নানা উন্নয়ন বরাদ্দের নয়ছয়ে।অারও পেয়ে থাকে সরকারী গাড়ি বাড়ির সুযোগ। বদলে যায় তাদের দিন। তাদের সঙ্গে থাকা এসিসট্যান্টরাই ফুলেফেঁপে পোক্ত কলা গাছ হয়ে যায়। জনসেবার ধরনটা তাদের এরকম যে নিজের সেবা করতে গিয়ে তাদের কিছু কিছু পরের সেবা হয়ে যায়।মূলত এই পরের সেবাগুলো নিজের সেবাকেই পোক্ততার দিকে নিয়ে যায়। ডাক্তার হাসপাতালে বসে ফ্রি রোগীদের চিকিৎসা করে। সরকারী অফিস সময়ের বাইরে রোগীদের নিকট হতে তারা ফি নেন। সরকার বেতন ভাতা ও আবাসনের সুযোগ না দিলে কোন ডাক্তার রোগী সেবা করতে সরকারী চেম্বারে বসতেন? রোগীরা ফি না দিলে কে প্রাইভেট চেম্বারে বসবেন রোগী সেবা করতে?
সকল কাজেরই পেশাদারিত্ব প্রয়োজন কাজের গতিবৃদ্ধির স্বার্থেই। পেশাদারিত্ব বিহীন কোন কাজই অধিকতর সমৃদ্ধির দিকে যেতে পারেনা। সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে নানা স্তুতিকথা শোনা যায়। সাহিত্যই সমাজ সভ্যতাকে যে সামনের দিকে নিয়ে যায় ও প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে সময়কে চিত্রিত করে রাখে এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। যে সমাজ ও দেশে কোন সাহিত্যসৃষ্টি নেই সে সমাজ সভ্য সমাজ দাবীদার হতে পারেনা। অথচ যুগে যুগে সাহিত্য কর্মীদের চরম দূরবস্থার কথা শোনা যায়। শোনা যায় জীবদ্দশায় অনাদরে অবহেলায় থেকে মরে যাওয়া ও মরার পরে তার সাহিত্যের কদর প্রাপ্তি। বিশ্ববিখ্যাত লেখক ডানিয়েল ডিপো একটি হোটেলের সামনে মরে পড়ে থেকেছিলেন। তিনি হোটেল মালিকের কাছে খাবার চেয়ে খেয়েছিলেন। হোটেলওয়ালা তাকে অনাহারী ভিক্ষুক ভেবে খাবার দিয়েছিল। ডিপো সেই খাবার খেয়েই মারা যান। এরপর তার লেখা বই রবিনসন ক্রুসো বিশ্ববিখ্যাত হয়। কিন্তু ডানিয়েল ডিপোর এতে কি আসে যায়? তিনিতো তার বইয়ের এই বিখ্যাত হওয়ার খবর শুনে আনন্দ পাওয়ার যোগ্যতাও হারিয়েছেন। এটাকে লেখকের মূল্যায়ন বলা কতটা সঙ্গত? যা লেখকের বোধেই নেই!
থিওডর রেইনকিং নামের একজন লেখককে বইখেকো লেখক বলা হয়। তিনি উমাইয়া শাসনামলে গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বই লিখে রাজার রোষানলে পড়েন। রাজা তাকে বলেন এই বই লেখার অপরাধে তোমাকে আমার কাছে মাফ চাইতে হবে অথবা আমার সামনেই তোমার বই তোমাকে খেতে হবে। লেখক তখন স্যুপের সাথে মিশিয়ে তার বইটি গিলে খেয়ে ফেলেছিলেন। আর আজ সেই লেখক নেই কিন্তু দুনিয়া জুড়ে গণতন্ত্রের জয়জয়কার। যে সাহিত্য ছাড়া কোন সমাজ টিকে থাকতে অথবা সামনে যেতে পারেনা সেই সাহিত্যের স্রষ্টারাই জীবদ্দশায় থাকে উপেক্ষিত। বাগানের ফুল গাছ ফুল ফোটায়। সেই ফুল হতে মধু আহরন করে মৌমাছি। যারা চাক ভেঙ্গে মধু খায় তারা কি ফুল গাছটির কথা কখনও ভাবে?
সাহিত্য কর্মীরা যেন উপযাচক হয়েই সাহিত্য সাধনা করে। তারা লিখে লেখা পত্রিকায় দেন। ছাপা হলে অনেক ক্ষেত্রেই অনেকে পায়না কোন লেখার সম্মানী। অনেক ক্ষেত্রে নিজের লেখা নিজেকেই কিনে পড়তে হয়। বই আকারে বের করলে তার বই তাকেই আগাম কিনতে হয় প্রকাশকের নিকট হতে। পৃথিবীর সব শ্রেনীই তাদের শ্রম অন্যের নিকট বিক্রি করে। আশ্চর্যের বিষয় হল সাহিত্যের লেখকরা তাদের শ্রম বিক্রি করে অন্যের কাছে নয় নিজের কাছে। আরও একটি বিষয় হল অনেক দেশেই ক্রিড়া বিষয়ক মন্ত্রনালয় রয়েছে কিন্তু সাহিত্য বিষয়ক মন্ত্রনালয় নেই। কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য ক্রিড়ার ভূমিকা বেশী না সাহিত্যের ভূমিকা বেশি? খেলোয়াড়রা ক্রিকেট খেলে অথবা ফুটবল খেলে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করে। কিন্তু তারা যে আর্থিক ও বাড়ি গাড়ির সুবিধা পায়। এগুলো না পেলে কোন খেলোয়াড় দেশের সুনাম বৃদ্ধির জন্য খেলবে? বলা যেতে পারে সাহিত্য মন্ত্রনালয়ের প্রয়োজন কি সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ইতো রয়েছে। একথা ক্রিড়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে না কি?
একসময় যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের অধীনে ছিল রেল মন্ত্রনালয়। রেলকে পৃথক করায় রেলের কি উন্নতি হয়নি? আর এতে করে রেলকে কি গুরুত্ব দেয়া হয়নি? যে সাহিত্য ছাড়া সমাজ সভ্যতা অচল। উন্নত সাহিত্যই যেখানে উন্নত জাতি গঠনের পূর্ব শর্ত।সেখানে সাহিত্য মূল্যায়িত হবে আর সাহিত্যিক অবমূল্যায়িত হবে এটা কী ধরনের রীতি হল? ফুল বাগানের মালি কেবলই ফুলের দিকে চেয়ে থাকবে গাছের দিকে নয় তা কি ঠিক? ফুলকে ভালবাসলে আগে গাছকে ভালবাসাই সঙ্গত নয় কি? গাছ ছাড়া কি কোথাও ফুল ফোটে? ফুলের দিকে চেয়ে থাকলে ফুলের পরিচর্যা হয় না গাছের গোড়ায় পানি ঢাললে, মাটি কুপিয়ে নরম করে দিলে ও সার দিলে ফুলের পরিচর্যা হয়? গরু ছাগলে যাতে ফুলগাছটিকে নষ্ট না করে সেটা দেখাশোনাও মালির দায়িত্ব নয় কি?তাই সাহিত্য সেবার পূর্বশর্ত কেবল সাহিত্যের মূল্যায়ন নয় সাহিত্যিককে আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা প্রদান।
সাহিত্য পাতা প্রকাশ করে সাহিত্যসেবী বিশেষন পেতে অধিকাংশ সংবাদ পত্রই সাহিত্য সাময়িকীর পাতা বের করে থাকে।এগুলোর জন্য একজন বেতনভোগী সাহিত্য সম্পাদকও নিয়োগ দেয় তারা। কিন্তু এসব পাতায় যাদের লেখা ছাপা হয় তাদের সকলকে অনেকসময় সম্মানী দেয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। গোটা কয়েক খ্যাতিমান ও সাহিত্য-সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ জনরাই সম্মানী পেয়ে থাকেন বলে শোনা যায়। রোগ শোক, দারিদ্র ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা যেন সাহিত্য কর্মীদের নিত্যসঙ্গী। এভাবে মরে গেলে আবার অনেককে মরণোত্তর পুরস্কার দেয়া হয়। এই পুরস্কারে সাহিত্যিকের কিবা আসে যায়? তিনিতো জানতেও পারেন না যে তিনি একটি পুরস্কার পেলেন। এরকম ঘুমের মধ্যে সালাম দেয়ার রীতি হাস্যকর নয় কি?
সুকান্ত একটি কবিতায় বলেছেন: “আমি যেন সেই হতভাগ্য বাতিওয়ালা/ ঘরে ঘরে আলো ছড়িয়ে যাই / অার নিজের ঘরেই থাকে অন্ধকার মালা।” তবে কি অন্ধকারই সাহিত্য কর্মীদের নিয়তি? প্রশ্নটা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতিই রইল।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








