ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ, যাকে ফ্যান্টাসি ক্রিকেট লিগও বলা হয়! এই লিগে যখন টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটের প্রসঙ্গ আসে, তখন ক্রিকেটগুরুরা একটা নাম কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না। নামটি ‘ক্রিস গেইল’।
২০১১ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালোরের হয়ে প্রথম মৌসুমের অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর গেইল নিশ্চিতভাবেই ফ্যান্টাসি লিগগুলোতে পছন্দের শীর্ষ হয়ে ওঠেন (যদিও পারফরম্যান্সের অনেক প্রমাণ তার আগেও রেখেছেন) এবং তাকে দলে নিয়ে কোনো ফ্রাঞ্চাইজিই খুব একটা ভুল প্রমাণিত হয়নি। নিজের মোহনীয় ব্যাটিংতাণ্ডব দিয়ে বিশ্বব্যাপী অগণিত অনুরাগী যেমন তৈরি করেছেন, তেমনি ক্রিকেট দর্শকরা আনন্দিত হচ্ছেন।
ক্রিকেটারদের ব্যাটেও নদীর জোয়ার-ভাটার মত একটা ব্যাপার থাকে। গত মৌসুমে আরসিবির হয়ে ৯ ম্যাচে মাত্র একটি হাফসেঞ্চুরি করেছিলেন। তাইতো দলটির হয়ে ৯১ ম্যাচে ৩৪২০ রান নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানস্কোরার হওয়ার পরও বেঙ্গালোর এ বছর তাকে ধরে রাখেনি।
জানুয়ারির নিলামে বেস প্রাইজের ২ কোটি রুপিতে গেইলকে দলে ভেড়ায় কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। সেটিও প্রথমধাপের নিলামে কেউ না কেনার পর। আইপিএল ২০১৮তে ফ্যান্টাসি লিগের অনুরাগীদের কাছে নিজেকে খুব এমনভাবে তুলে ধরছেন ক্যারিবীয় ব্যাটিংদানব, শর্টার ফরম্যাটে তাকে মনের গভীরে যেমনটা আবিষ্কার করেন দর্শক।
গেইলকে দলে নেয়ার আগেই নিলামে লোকেশ রাহুল, মায়াঙ্ক আগরেওয়াল এবং করুন নায়ারকে নিয়ে শক্তিশালী ওপেনিং পরিকল্পনা করে ফেলে পাঞ্জাব। সেই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ওপেনার অ্যারন ফিঞ্চ এবং ভারতের যুবরাজ সিংকে দলে টানে তারা। টি-টুয়েন্টির ‘গডফাদার’ গেইলকে সংযুক্ত করা ছিল তাদের ওপেনিংয়ের জন্য এক দারুণ ব্যাকআপ।
সবশেষ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ফাইনালে (বিপিএল) ঢাকার বিপক্ষে রংপুর রাইডার্সের হয়ে অপরাজিত ১৪৬ রান করেছিলেন গেইল। তার ইনিংসে হাঁকানো ১৮টি বিশাল ছক্কার মার ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা তিন বোলার সাকিব আল হাসান, সুনীল নারিন ও শহিদ আফ্রিদির বিপক্ষে। ওই টুর্নামেন্টে তিনি ১৭৬.৩৬ স্টাইকরেটে রান করেছিলেন ৪৮৫।
বিপিএলের আগে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে চার ফিফটিসহ ১১ ম্যাচে করেছিলেন ৩৭৬ রান। সুতরাং ‘বুড়ো ঘোড়ার ভেতরে এখনো জীবনী শক্তি আছে’ যেমন বলা যায়, কথাটি গেইলের ক্ষেত্রেও যেন খাটে।
আইপিএল এগারোতে পাঞ্জাবের হয়ে প্রথম দুটি ম্যাচ খেলেননি গেইল। কিন্তু তৃতীয় ম্যাচে সুযোগ পেয়েই যেন নিজেকে প্রমাণ করলেন। ৩৩ বলে খেললেন ৬৩ রানের ইনিংস। তার দলও জয় পেল অনায়াসে।
সমালোচকরা হয়ত তখন বলেছেন, ‘ওকে, তার জন্য এটা ভালই। তবে এটা তো একটা ম্যাচ মাত্র। কিন্তু তিনি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন না।’
কিন্ত গেইল সমালোচকদের বুঝিয়ে দিলেন, তার ট্যাঙ্কে এখনো অনেক গ্যাস জমা আছে। ১৯ এপ্রিল মোহালি ম্যাচ। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে সিজন এগারোতে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন গেইল। ৩৯ বছরের ক্যারিবীয় পিঞ্চহিটার ৬৩ বলে খেলেন অপরাজিত ১০৪ রানের ইনিংস।
এটা ছিল আইপিএলে গেইলের ৬ষ্ঠ এবং সব মিলিয়ে টি-টুয়েন্টিতে ২১তম সেঞ্চুরি। দলের জয়ের সঙ্গে এই ইনিংস যেন গেইলের পুরনো চেহারাকে ঘুরিয়ে আয়নামুখী করে ধরল।
পরে ম্যাচসেরার পুরস্কার নিতে এসে গেইল ধন্যবাদ জানান টিম ডিরেক্টর বীরেন্দ্র শেবাগকে। তার আইপিএল ‘বাঁচিয়ে’ দেয়ার জন্যই ভারতীয় সাবেক ওপেনারকে এই ধন্যবাদ। বলেন, ‘আমার আইপিএল বাঁচিয়ে দেয়ার জন্য বীরেন্দ্র শেবাগকে ধন্যবাদ জানাই (নিলামে শেবাগই গেইলকে কেনার প্রস্তাব করেন)।’
সংবাদ সম্মেলনে চাওড়া হাসি দিয়ে গেইলের সংযোজন ছিল, ‘অনেকে বলেন আমার অনেক কিছু প্রমাণের আছে। আমি এখানে এসেছি শুধু আমার নামের প্রতি সুবিচার করতে।’
সানরাইজার্সের বিপক্ষে সেঞ্চুরির সময় গেইল সামলেছেন টি-টুয়েন্টির একনম্বর বোলারকে। আফগানিস্তানের লেগস্পিনার রশিদ খানকে রীতিমত চুরমার করেন। পরপর চার বলে চারটি ছক্কাও মারেন তিনি।
সানরাইজার্স ম্যাচের পর পাঞ্জাবকে হ্যাটট্রিক জয় এনে দেন গেইল। কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে ৩৮ বলে ৬২ রান করে দলকে ৯ উইকেটের জয় এনে দেন। তিন ম্যাচে গেইলের রান এখন ২২৯। স্ট্রাইকরেট ১৭০.৮৯। সেই সঙ্গে চলতি মৌসুমে টুর্নামেন্টের সর্বাধিক ছক্কার সংখ্যাও তার।
গেইলের ব্যাটিং দক্ষতার প্রতি মনোনিবেশ করার জন্য ক্রিকেট দর্শকরা আবারও সমবেত হয়েছেন এবং পাঁচটি ম্যাচের চারটিতে জিতে আইপিএলের পয়েন্ট তালিকা দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে পাঞ্জাব। তাদের শিরোপা স্বপ্নের পাখায়ও হাওয়া লেগেছে। এজন্য ধন্যবাদ সেই একজনকে, যিনি কিনা এই আইপিএল এগারোতে ব্যাট করার সুযোগই প্রায় হারিয়েছিলেন।
গেইলের সাম্প্রতিক ব্যাটিংশৈলী দেখে বিশ্বের অন্যান্য ফ্রাঞ্চাইজিগুলোর (যারা গেইল কিনেছেন বা কিনবেন) চেয়ারে বসা কর্মকর্তারা আড়মোড়া ভেঙে একহাতে পাঞ্জাব কর্মকর্তাদের এবং অন্য হাতে গেইলকে স্যালুট দিচ্ছেন, ‘সালাম ইউনিভার্স বস, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের গডফাদার’।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার স্পোর্টস এডিটর জেমি অলটারের লেখার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর







