দেশ ও দেশের বাইরে মাঠের লড়াইয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। কিন্তু মাঠের বাইরে ক্রিকেট ব্যবস্থাপনায় জটিলতা বাড়ছে দিন দিন। বিসিবির গঠনতন্ত্র নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে বিসিবির বর্তমান বোর্ডকে পরামর্শ দিয়েছেন সংস্থাটির সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী। আদালতের রায়ে স্বাধীনতা পাওয়ার পর ভবিষ্যতে ক্রিকেট বোর্ড সরকার ও রাজনীতির প্রভাবমুক্ত থাকবে নাকি প্রভাবযুক্ত থাকবে, সে ব্যাপারে বিসিবির অবস্থান জানতে চান তিনি।
সোমবার এজিএম ও ইজিএম করে বিসিবির গঠনতন্ত্রে সংশোধন আনতে যাচ্ছে বিসিবি। যে গঠনতন্ত্রে বোর্ড এজিএম করতে যাচ্ছে তাতে আদালত অবমাননা হবে বলে মনে করেন সাবের। রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রশাসন কোন পথে? এমন প্রশ্নকে সামনে রেখে মিডিয়া ব্রিফিং করেন সাবেক বিসিবি সভাপতি। ক্রিকেট বোর্ডকে সরকার ও রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করে শক্তিশালী একটি কাঠামোয় রূপদানের আহবান জানান তিনি।
বিসিবির গঠনতন্ত্র জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) কর্তৃক অবৈধভাবে সংশোধন, তার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট, এসব বিষয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নানা প্রসঙ্গে নিজের অনুযোগের কথা তুলে ধরেন সাবের।
শক্তিশালী ক্রিকেট প্রশাসন
আমার বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের যে সম্পৃক্ততা সেখানে কিন্তু আমি দুটো বিষয়কে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। একটা হচ্ছে আমাদের মাঠের পারফরম্যান্স, প্লেয়াররা কীভাবে পারফর্ম করছে, কতুটুকু পারফর্ম করছে। আরেকটা, মাঠের বাইরের ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা। আমি সবসময় মনে করি দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। যদি মাঠের পারফরম্যান্স ধরে রাখতে চাই, টেকসই করতে চাই, তাহলে মাঠের বাইরের পরিচালনাও খুব শক্তিশালী হতে হবে। এটা বলছি কারণ, বর্তমান বাংলাদেশ দলের যে সফলতা তাতে সকলেই আমরা আনন্দিত এবং এটা নিয়ে আমরা গর্ব করি। সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক মঞ্চে নিয়ে আসে ক্রিকেট। সেই কারণে এটা আরও বেশি জরুরি হয়ে যায় যে, আমরা অফ দ্য ফিল্ড বিষয় নিয়েও আলোচনা করি। যে কারণে আজকের বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রশাসন, যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন সময়ে বোর্ডকে চিঠি
বিভিন্ন সময় বর্তমান ক্রিকেট বোর্ডের সম্মানিত সভাপতি যিনি আছেন তাকে আমি চিঠি দিয়েছি। পত্রের মাধ্যমে তাকে বিভিন্ন বিষয় জানিয়েছি। ওটা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, যেগুলো আমি কখনও মিডিয়াতে প্রকাশ করিনি। আলোচনাও করিনি। কারণ এসব আলোচনা একদম ব্যক্তিগত থাকা উচিত। প্রাক্তন সভাপতির বর্তমান সভাপতির জন্য কোনও পরামর্শ থাকলে জানাতে পারেন। উদাহরণগুলো দিচ্ছি। যেমন, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড শ্রীনিবাসনের প্রস্তাবটা সমর্থন করল যে- ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া এ তিনটি শক্তি বিশ্ব ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ করবে; তখন বিসিবি সভাপতিকে চিঠি দিয়ে জোরালভাবে আপত্তি জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, এটা যদি বাংলাদেশ সমর্থন করে তাতে শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেট না, পুরো বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যই ক্ষতি হবে।
কয়েকদিন আগে ওনাকে আরেকটা চিঠি দিয়েছিলাম, সুশাসনের বিষয়ে। বিশেষ করে একজন বোলার যখন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দিল ৪ বলে ৯২ রান, তখন বলেছিলাম স্বাধীন একটা কমিশন করেন। রিটায়ার্ড জাস্টিস দিয়ে করেন। গঠনমূলক কাজ করতে বলেছিলাম। তারপর বলেছিলাম, এজিএম হচ্ছে না, এটা করা দরকার। শোনা যাচ্ছে একটা বা দুটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ক্লাবের কাউন্সিলর কিনে নিয়েছে। এটা যদি চলতে দেওয়া হয় তাতে নির্বাচন তো একটা প্রহসনই হবে। ওই কোনও চিঠি আমিও আপনাদের কাছে দেই নাই বা ক্রিকেট বোর্ড থেকেও আপনাদের দেওয়া হয়নি। কিন্তু সবশেষে যে চিঠি দিলাম, ১৫ সেপ্টেম্বর। সেটা আবার ওইখান (বিসিবি) থেকে কোনও একটা পত্রিকায় দেওয়া হয়েছে। যখন কোনও একটা পত্রে দেওয়া হয় উত্তর তো আশা করতে পারি।
এজিএমের বৈধতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন
বিসিবি থেকে পাওয়া পত্রের প্রেক্ষাপট আপনাদের জানাতে চাচ্ছি। বিসিবি থেকে ১০ সেপ্টেম্বর, কাউন্সিলর হিসেবে চিঠিটা দেওয়া হল। জবাবে আমার অবস্থান ছিল এমন- এখন সুপ্রিমকোর্ট হাইকোর্টের জাজমেন্ট বহাল রাখল এবং সেই হাইকোর্টের জাজমেন্টে কী ছিল, হাইকোর্টের জাজমেন্টে কিন্তু কোন গঠনতন্ত্রে নির্বাচন হবে এটা নিয়ে কোনও কিছু ছিল না। ছিল, এনএসসি সংশোধনী যে গঠনতন্ত্র অনুমোদন করল বা এনএসসি যে সংশোধনী দিল সেটিও বৈধ নয়। সেটিই কিন্তু ছিল রিটের মূল বিষয়। পরবর্তীতে সুপ্রিমকোর্টে আপহেল্ড করা হল। এখন যে গঠনতন্ত্রকে হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্ট বলছেন এটার কোনও বৈধতা নেই, সেটার অধীনে যদি কোনও প্রক্রিয়া হয়, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। এটা জানিয়েছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি আর কাউন্সিলর হওয়ার যোগ্য না, যে গঠনতন্ত্রে কাউন্সিলর হয়েছি সেটিই অবৈধ। আমি ওই চিঠিতে কোনও অধিকারের কথা বলিনি। বলেছি আমার নামটা ওখান থেকে সরিয়ে নিতে চাই। কেননা নতুন জাজমেন্টের আলোকে আমি আর কাউন্সিলর থাকতে পারি না। যদি বলা হয় গঠনতন্ত্র অবৈধ। তার অধীনে যে কাজগুলো হয়, সেটার কিন্তু বৈধতা থাকতে হয়। এই প্রশ্নটা করেই বোর্ডকে চিঠি দিলাম। চিঠির যদি জবাব পেতাম, তারা যদি বলত এটা বৈধ, তাহলে এজিএমে অংশ নেওয়ার বিষয়টা ভাবতাম।
বিসিবির কাছে দুই প্রশ্ন
মূল জায়গাটা যদি ফোকাস করতে চাই এখানে দুটি প্রশ্ন আমার, বর্তমান যে বোর্ড আছে তারা কী মনে করেন হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টের রায়ের আলোকে বর্তমানে ওনারা যে গঠনতন্ত্র নিয়ে কাজ করছে সেই গঠনতন্ত্র বৈধ? কোনও কমিটি নিয়ে কথা বলছি না, কথা বলছি গঠনতন্ত্র নিয়ে। এখানে একটা পরিষ্কার জবাব থাকতে হবে যে, এটি বৈধ এবং এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। কিন্তু আদালতের রায় অনুযায়ী এটা বৈধ না। সুপ্রিম কোর্ট থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যেটার ভিত্তিতে নির্বাচন হয়, শুনানি যখন নিষ্পত্তি হবে সেটার নিষ্পত্তি যেভাবে হবে সেটার উপরে নির্ভর করবে নির্বাচন কিংবা বোর্ডের বৈধতা। সেখান থেকে আরেকটা প্রশ্ন চলে আসে। যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যার জন্য আলোচনা হওয়াটা খুব জরুরি। সেটা হল, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কীভাবে পরিচালিত হবে।
২০০০ সালের এজিএমের দৃষ্টান্ত
২০০০ সালে কক্সবাজারে যে এজিএম হয়েছিল, সেখানে এখানে যারা আছেন (সংবাদকর্মী) অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেই এজিএমে আমাদের প্রস্তাবনা ছিল ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতিকে নির্বাচিত হতে হবে। আমার অবস্থান ধারাবাহিকভাবে যেটা ছিল সেটা, সরকার বা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ একটা ফেডারেশনে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। যদি সেই ফেডারেশনকে তারা আর্থিকভাবে সহায়তা দেয়। তাহলে অবশ্যই সরকারের পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু করার থাকতে পারে। তবে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে যেখানে সরকারের কাছ থেকে কিছু নিচ্ছে না বোর্ড, নিজস্ব অর্থায়নে চলছে, সেখানে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকা উচিত না। এটাই আমার মৌলিক প্রশ্ন।
সেটার ভিত্তিতে আমি তখনও বলেছিলাম, যখন (২০১৩ সালে) নির্বাচন থেকে সরে আসলাম সেখানে কথাগুলো বলেছি, সরকারের হস্তক্ষেপ থাকছে, যে প্রক্রিয়ায় হচ্ছে (গত নির্বাচন) সেটা ঠিক না। সুতরাং এখানে ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থানটা কী, তারা কী চায়? বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসনে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকবে নাকি মুক্ত থাকবে, নাকি স্বাধীন থাকবে। ওই প্রশ্নটা কিন্তু আমরা ২০০০ সালে সভাপতি নির্বাচনের সময়টাতে বলেছিলাম। আগে বাকি সবাই নির্বাচিত হত, সভাপতি মনোনীত হত। অন্যথায় সরকারি প্রভাব চলে আসে ক্রিকেট পরিচালনায়।
আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট
আইনি যে লড়াইটা চলল এটার দিকে যদি তাকাই, এটাতে ক্রিকেট বোর্ডের অবস্থান কী ছিল সেটা তো সবাইকে বুঝতে হবে। হাইকোর্ট বলল, গঠনতন্ত্র যেটা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) করেছে সেটা বৈধ না। কেননা এনএসসির সংশোধনী দেওয়ার এখতিয়ার নেই। তার মানে হাইকোর্ট বলছে এখানে কোনও সরকারি প্রভাব থাকবে না। ক্রিকেট বোর্ড স্বাধীনভাবে, স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হবে। বিসিবি ও এনএসসি এটার বিরুদ্ধে আপিল করল। এটা বোঝায়, বোর্ডের অবস্থান হচ্ছে ক্রিকেট বোর্ড স্বাধীনভাবে চলবে না। ক্রিকেট পরিচালিত হবে এবং এনএসসির হস্তক্ষেপ থাকবে। এটাই সবচেয়ে মৌলিক জায়গা।
সেজন্য প্রশ্ন, আমরা কী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডর ব্যবস্থাপনা সরকারি প্রভাবমুক্ত, রাজনীতি থেকে আলাদা, সেভাবে চাই? নাকি সরকারি প্রভাবযুক্ত ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসন চাই? হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে যখন আপিল করল বিসিবি ও এনএসসি, তখন সরকারি প্রভাবের জায়গা আরও জোরাল হল। বিসিবি নিজেরাই চাইল গঠনতন্ত্র সংশোধনের অধিকার এনএসসির থাকুক।
তার মানে কী প্রভাব থাকবে? সেটা আবার ওনারা সুপ্রিমকোর্টের উপরেও চ্যালেঞ্জ করল, যে সরকারি প্রভাব থাকবে। যখন রায় আসল সরকারি প্রভাব থাকবে না, তখন বোর্ডের বক্তব্য- এটা একটা যুগান্তকারী রায়, এটা ক্রিকেটের উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই জায়গাগুলো পরিষ্কার করতে হবে। বলা হল, আপিল তো খারিজ হয়ে গেছে। আসলে আপিল তো করেছে ক্রিকেট বোর্ড। খারিজ হলে ক্রিকেট বোর্ডের আপিল খারিজ হয়েছে। অন্য কারও আপিল তো খারিজ হয়নি।
সরকারের প্রভাবমুক্ত বোর্ড নাকি প্রভাবযুক্ত বোর্ড?
স্পষ্ট করা দরকার ওনারা কী চান, প্রভাবমুক্ত না প্রভাবযুক্ত প্রশাসন? দুটো জায়গা পরিষ্কার হওয়াটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাতে বোঝা যাবে ক্রিকেট বোর্ড কীভাবে পরিচালিত হবে। তারা যদি চায় সরকারের প্রভাব রাখবে, এটা কিন্তু হওয়া উচিত না। সেটা আমরা বলেছি ২০০০ সালেই।
সবশেষে ২০০৯ সালে আইসিসি বলল, ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসনে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকতে পারবে না। এটা শুধু আইসিসির কথা না, ফিফাও কিন্তু এই নীতি অনেক আগে থেকে অনুসরণ করে। স্পোর্টিং ফেডারেশনে সরকারি প্রভাব কাজ করবে না, রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে। এটা যদি তারা মানে তাহলে তারা আপিল কেন করল? হাইকোর্টের যে রিট, সেটা ছিল ক্রিকেট বোর্ডের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করার। ওই রিট কে চ্যালেঞ্জ করল? সুপ্রিমকোর্টের রিটের বিরোধিতা কে করল? ক্রিকেট বোর্ড ও এনএসসি করল। মৌলিক জায়গাটা যদি স্পষ্ট না হয়, যা কিছু করেন না কেন এগোতে পারবেন না।
এজিএমে অংশ না নেওয়ার পেছনে
চিঠির যদি জবাব পেতাম, তারা যদি বলত এটা বৈধ, তাহলে আমি এজিএমে অংশ নেওয়ার বিষয়টা ভাবতাম। আমি একজন সংসদ সদস্য। আমরা আইন তৈরি করি, প্রণয়ন করি। আইনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা একটু বেশিই হওয়া উচিত। এমন একটা এজিএম বা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবো না, যেটাতে পরবর্তীতে একটা কনটেন্ট অব কোর্টের ঝুঁকি সৃষ্টি হয় এবং সেটাই হচ্ছে। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। সাধারণ জ্ঞান দিয়ে বুঝি, যে গঠনতন্ত্রকে অবৈধ বলা হচ্ছে সেই গঠনতন্ত্রের অধীনে বা সেই গঠনতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় যদি কোনও প্রক্রিয়া হয়; তাহলে সেটা আমার দৃষ্টিতে আদালতের অবমাননা।







