দল ক্ষমতায় থাকলে তৃণমূলের অনেক কিছুই নাকি দেখা যায় না, অনুভব করা যায় না। আওয়ামী লীগের অবস্থাও যেন তাই হয়েছে। তৃণমূলে অনেককিছু ঘটে গেলেও একশ্রেণীর শীর্ষনেতারা সবকিছু আড়াল করে বলছেন বা ভাবছেন সময় আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। সঠিক সময়ে যখন পার্টির সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ প্রদান করবেন তখন সেই নির্দেশের বাইরে কেউ যেতে পারবেন না। সবাইকে একসাথে হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে। আর পার্টির নির্দেশের বাইরে যারা যাবেন তাদের নির্ঘাত পার্টি থেকে বহিষ্কার হতে হবে।
৩১ মার্চ গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন পার্টির বিরুদ্ধে বিগত দিনে যারা কাজ করেছে তাদেরকে ছাড় দেওয়া হবে না, শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন। এর আগের দিন ৩০ মার্চ ধানমণ্ডি কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর যে বৈঠক হয় সেখানে গভীরভাবে আলোচনা হয় আওয়ামী লীগের তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি। ৩১ মার্চ দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে ঐ বৈঠকে গভীরভাবে দলীয় কোন্দলের বিষয়টি আলোচনা উঠে আসে এবং সবাই এই আশংকা প্রকাশ করেছেন যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে দল তৃণমূলে ভীষণরকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আসলেই আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যগণ চরম সত্য বিষয়টি ভালোভাবেই ধরতে পেরেছেন। দেশের প্রায় সব জেলা, থানাতেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অর্ন্তদ্বন্দ চরম আকারে রূপ নিয়েছে। এই রূপ এতোটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে ভাই ভাইকে যেমন ছাড় দিতে রাজি নন, তেমনি বোনও ভাইকে ছাড় দিতে রাজি নন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। কক্সবাজার-৩ আসনের এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল। নানা ঘটনায় যিনি বিতর্কিত এবং আলোচিত। সামনে নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার বড় দাবিদার তিনি। কিন্তু এই আসনে এবার মনোনয়নের জন্যে ছাড় দিতে রাজি নন তারই আপন ভাই ও বোন। রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন সাইমুম সারওয়ার এমপির বড় ভাই সোহেল সরওয়ার কাজল। ছোট ভাই কমলকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি মনোনয়ন পাওয়ার জন্যে আটগাঁট বেধে নেমেছন। কিন্তু এই দুই ভাইকে আবার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তাদেরই আপন বোন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সারওয়ার কাবেরী। তিনিও দলীয় মনোনয়ন চান। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কোন্দল কতোটা গভীরে। যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, পিরোজপুর, বগুড়া, পাবনা, চট্টগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, খুলনা-এমন কোনো জায়গা নেই যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর দ্বন্দ্ব নেই। সময় এলে এই দ্বন্দ্ব আরো কঠিনতর হবে।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলটা এবার বিশাল রূপ গ্রহণ করে মূলত ইউনিয়ন পরিষদ এবং জেলা পরিষদের নির্বাচনকে ঘিরেই। এই দুই নির্বাচনেই কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করে একশ্রেণীর নেতারা। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে অনেকেই জেলা কমিটির নেতাদের বড় ধরনের টাকা দিয়ে মনোনয়ন লাভ করেন। অন্যদিকে এই টাকার খেলায় ছিটকে পড়েন ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। সেই ত্যাগী নেতাকর্মীরা আবার বিদ্রোহী প্রার্থী হলে নানান ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তৃণমূলে বিদ্রোহ যে কতোটা উত্তপ্ত হয়ে আছে তার কিছুটা প্রমাণ মেলে, জেলা পরিষদের নির্বাচনে। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরও বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান নৌকা প্রতীক পাওয়া ১৩ প্রার্থী। মোট ৩৯টি জেলার মধ্যে ১৩টিতে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। এ থেকেই বোঝা যায় ভেতরে কতোটা জ্বলছে আওয়ামী লীগ।

গত বছরের ২০ মে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভার কথা নিশ্চয় সবার মনে আছে। সেই সভাতেও কিন্তু তৃণমূল নেতারা বলেছিলেন আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায় দ্বন্দ্বের আগুনে পুড়ছে। সেই দ্বন্দ্ব সামাল দেওয়া না গেলে আগামী নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাশার বাইরে চলে যেতে পারে। এ কারণে অনেক নেতাই সেসময় বলেছিলেন দলে শৃঙ্খলা তৈরি করুন সবার আগে। সেই সভায় ময়মনসিংহ জেলার সভাপতি জহিরুল হক খোকা বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের রন্ধ্রে, রন্ধ্রে খোন্দকার মোশতাক ঢুকে গেছে। নেত্রী আপনি বার বার এসব মাফ করে দেন। ফলে অপরাধীরা সাহস সঞ্চয় করে। আর মাফ করবেন না।’ তিনি আরো বলেছিলেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে দেখেছি অশুভ প্রতিযোগিতা। আমাদের একদল আপনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছি, আরেক দল আপনাকে পেছনের দিকে টানছে। আমাদের ভেতরে বেশিরভাগ বিরোধ আদর্শের নয়, ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বের। এসব বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে হবে। তিনি আরো বলেছিলেন, আগামী নির্বাচনে জাতীয়ভাবে কাজ কর্মই শুধু জনগণ বিবেচনা করবে না, বিবেচনা করবে স্থানীয় ভাবে এমপিরা কি করছেন, সেই প্রশ্ন আসবে? সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’
তৃণমূলে আওয়ামী লীগের অবস্থা কতোটা দ্বন্দ্বময় হয়ে উঠেছে তার সাম্প্রতিক উদাহরণ যশোরের কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের স্থানীয় এমপি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের অভিযোগ আনা। ২৮ মার্চ যশোর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতারা। লিখিত বক্তব্যে তারা অভিযোগ এনে বলেন, ২০১৪ সালের পর থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা দলীয় নেতা কর্মীদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন চালাচ্ছেন। তাঁর প্ররোচনায় উপজেলাতে একটি ‘গামছা বাহিনী’ নামে একটি বিশেষ বাহিনীও গড়ে উঠেছে।
সবারই জানার কথা ইসমাত আরা কখনই রাজনীতিবিদ ছিলেন না। আওয়ামী লীগের সাবেক প্রয়াত সফল শিক্ষামন্ত্রী এইচএসকে সাদেকের সহধর্মিণী থেকে তিনি রাজনীতিতে স্থলাভিষিক্ত হয়ে মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। কিন্তু সত্যটা হলো তিনি এলাকার রাজনীতিতে ঐক্যের বদলে দ্বন্দ্বটাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে কারণে স্থানীয় নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন না করে পারেননি। বাস্তবতা হলো এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। বরং উনার মতো একজন ব্যক্তিত্ব মন্ত্রী হওয়ার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের আরো শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল। অবশ্য যশোরের শুধু কেশবপুর, সবকটি সংসদীয় আসনেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল চাঙ্গা হয়ে আছে।

এদিকে অনেক জায়গাতেই আবার প্রতিষ্ঠিত, জাতীয় পর্যায়ের বর্ষীয়ান নেতাদের সাথে বনিবনা হচ্ছে না তরুণ নেতৃত্বের। ফলে প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে তরুণ নেতৃত্বদের হয়রানি করার অভিযোগ উঠছে। ভোলা সদর-১ আসনে জেলা কমিটির সদস্য, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা সদাহাস্যজ্জ্বল, বন্ধুবৎসল হেমায়েত উদ্দীন কোনো ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে গেলেই বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। কয়েকদিন আগে তাঁর পক্ষের তরুণরা শহরে পোস্টার লাগাতে গেলে পুলিশ তাদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। আওয়ামী লীগের এক বর্ষীয়ান নেতা কোনোভাবেই হেমায়েত সহ্য করতে পারছেন না। ঝিনাইদহের শৈলকূপাতে আব্দুল হাই এমপি নমিনেশন পেলেই সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নায়েব আলী জোয়ার্দ্দাররা যে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবেন না এতে কোনো সন্দেহ নেই। বেশিরভাগ জায়গাতেই মূল দ্বন্দ্বটা তৈরি হয়েছে এমপিদের একনায়কতন্ত্রের কারণেই। এমপিদের অসহিষ্ণু আচরণ, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের ফেলে হাইব্রিডদের প্রশ্রয় দেওয়া, দলীয় কার্যক্রমে সময় না দেওয়া, সরকারি অনুদানের যাচ্ছেতাই ব্যবহারে তৃণমূল আওয়ামী লীগ যেন আগুনে পুড়ছে।
শুধু কেশবপুর, ভোলা সদর বা রামু বলে কথা নয়, বেশিরভাগ উপজেলার এই একই অবস্থা। সভাপতির সাথে সাধারণ সম্পাদকের বনিবনা নেই। নেতাদের থেকে ত্যাগী কর্মীরা দূরে। অঙ্গ সংগঠনগুলো চলছে ইচ্ছেমতো। মাঠ পর্যায়ে দলের ভালো কোনো কর্মসূচি নেই। আরেকটি শ্রেণী কোনো কিছুর মধ্যেই নেই। সংগঠন পেছালো না এগোলো এনিয়ে তাদের ভাবনা দুর্ভাবনা কিছুই নেই। তারা মত্ত ঠিকাদারি, ভাগবাটোয়ারা, কমিশন, নিয়োগ বাণিজ্য, তদবির-এসব নিয়ে।
আগামী ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সন্দেহ নেই এবারের মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বড় বেগ পেতে হবে। কারণ এবার বিদ্রোহীরা কাউকে ছাড় দেবে বলে মনে হয় না। বেশিরভাগ জেলাতেই বিদ্রোহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তৃণমূলের কোন্দল দ্বন্দ্ব মেটানো অতোটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। তৃণমূল সামাল দিতে না পারলে তার মাশুল টানতে হবে আওয়ামী লীগকেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।








