সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনীদের জন্য যে ৩০ শতাংশ কোটা আছে, প্রধানমন্ত্রী তা বহাল রাখার কথা জানালেও এতে আশাহত নন কোটার বাইরে থাকা চাকরিপ্রার্থীরা।
তারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে গেলেও কোটা সংস্কারের বিপক্ষে নয়। কারণ কোটা সংস্কার হবে না এ ধরনের কোন কথা প্রধানমন্ত্রী বলেননি। কোটার প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা থেকে তা পূরণ করার নির্দেশনা ইতিবাচক এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রাথমিক জয় বলে মনে করছেন তারা।
এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে বড় ধরনের কোন বাধা আসেনি। প্রদর্শন করা হয়নি ভয়-ভীতি। এমনকি এ আন্দোলন থেকে সরে যেতেও বলা হয়নি তাদের। সেজন্য সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের দৃঢ় বিশ্বাস ভবিষ্যতে তাদের সকল দাবি মেনে নেওয়া হবে।
সবার সমান অধিকার নিশ্চিতকরণে গনতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের যৌক্তিক আন্দোলন চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্তে অটল চাকরিপ্রার্থীরা। এ আন্দোলনের মুখে সম্প্রতি কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদে মেধাতালিকা থেকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। যা তাদের ৫ দফা দাবির পঞ্চম দাবি। ঠিক একইভাবে তারা আশাবাদি তাদের বাকি চার দফা দাবিও মেনে নেবে সরকার।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আমাদের যৌক্তিক আন্দোলন চলছে এবং চলবে। এখনো পর্যন্ত সরকার আমাদের এ অন্দোলনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেনি। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করি, প্রায় তিন শতাংশ মানুষের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটার কোন যৌক্তিকতা নেই। আমরা চাই এই ৫৬ শতাংশ কোটা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হোক।
মুক্তিযোদ্ধো কোটা নিয়ে আমাদের কোন অভিযোগ নেই উল্লেখ করে এ শিক্ষার্থী বলেন: ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনীদের জন্য যে ৩০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রয়েছে সেখানে দেখা যায় অধিকাংশ সময় কোটায় উপযুক্ত লোক পাওয়া যায় না। এমনকি তাদের জন্য যে বিশেষ নিয়োগ দেয়া হয় সেখানেও সেই সংখ্যক প্রার্থী না পাওয়ায় শূন্য পড়ে থাকে পদ।’ এজন্য মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল ধরনের কোটা সংস্কারের দাবি এ শিক্ষার্থীর।
এছাড়া প্রতিবন্ধী কোটাসহ নারী ও ত্রুটিপূর্ণ জেলা কোটা নিয়ে তীব্র ক্ষাভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা। তাদের দাবি, প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ কোটা বরাদ্দ থাকলেও তারা প্রথম শ্রেণির চাকরি করছেন হাতে গোনা কয়েকজন। আর তাদের মধ্যে যারা তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণির চাকরি পাচ্ছেন তাও অনেক টাকার বিনিময়ে নিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারীরা এখন অনেক এগিয়ে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রেজওয়ান বলেন: এখন দেখা যায় ফলাফল সহ সবকিছুতেই এগিয়ে নারীরা। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো বিভাগে ছেলে শিক্ষার্থীর চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশি। চাকরি ক্ষেত্রেও এখন দেখা যাচ্ছে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে মেয়েরা।
এমনকি কোটা সংস্কার অান্দোলনে মেয়েরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে এ শিক্ষার্থী বলেন: মেয়েরাও এখন আর কোটা চায় না। তারাও চায় এ প্রথার সংস্কার করা হোক।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি কোটার অযৌক্তিকতা তুলে ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক চাকরিপ্রার্থী বলেন: তাদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা থাকলেও কখনোই সেই পরিমাণ চাকরিপ্রার্থী পাওয়া যায় না কোটা পূরণের জন্য। সেক্ষেত্রে ওই পদগুলোও শূন্যই পড়ে থাকে।
বিষয়টি নিয়ে কোটা ব্যবস্থার তীব্র বিরোধীতা করে আসা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান চ্যানেল অাই অনলাইনকে বলেন: কোটা পৃথিবীর কোথাও কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। সময়ের প্রয়োজনে এটা অবশ্যই পরিবর্তনশীল। শুধু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম।
‘‘বাংলাদেশে বর্তমানে ২৫৮ ধরণের কোটা চালু রয়েছে যা ভীষণ জটিল ও নিয়োগের ক্ষেত্রে সময় ক্ষেপনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি সরকারের কাছে কোটা ব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন দিয়েছি বহু বছর আগে। তবে বিষয়টি এখনো আমলে নেয়া হয়নি। আমি চাই সরকার এ প্রতিবেদনটি দেখে নতুনভাবে কোটার বিষয়ে বিবেচনা করুক।’’
১৯৭২ সালে চালু হওয়া কোটা ব্যবস্থা ৪৬ বছর ধরে চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন: ‘এত বছর ধরে কোটা ব্যবস্থা চালু রেখে কী লাভ হয়েছে বা কী ক্ষতি হয়েছে তার কোনো হিসাব-নিকাশ রাখা হয়নি।’
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রয়েছে। এর বাইরে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর জন্য ১০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ কোটা রয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে কোটা সংস্কারের দাবিতে জোরালো আন্দোলন চলছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, কোটা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হোক।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জনগণ অগ্রসর হবার পর কোটা ব্যবস্থার আর প্রয়োজন নেই। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর কোটার মূল্যায়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তারা। আদৌ কোটা প্রয়োজন কী না। তবে সাধারণ চাকরি প্রার্থীদের দাবি কোটা ব্যবস্থা বাতিল নয়, এর সংস্কার।








