কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিপীড়ন এবং হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা। শিক্ষক সংহতি সমাবেশে তারা বলেছেন, আন্দোলনে হামলাকারী এবং শিক্ষক লাঞ্ছনাকারীদের বিচার করতে হবে। গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তিও দাবি করেছেন তারা।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী নির্যাতন এবং শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষকদের এ সংহতি সমাবেশ আয়োজিত হয়।
সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৭০জন শিক্ষক অংশ নেন। এতে বিভিন্ন বিভাগের প্রায় পাঁচশ’র বেশি শিক্ষার্থী সংহতি জানান।
সমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কেন কোটা আন্দোলন হচ্ছে সেটা আমি বুঝতে পারছি না।’ বুঝতে পারতেন খুব সহজেই। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী যারা আন্দোলন করছে তাদের সাথে যদি একটা ঘণ্টা সময় দিতেন। কিংবা আপনি যদি শিক্ষকদের সাথেও কিছু সময় কথা বলতেন কিংবা তাদের লেখা কথাবার্তা যদি আপনি শোনার চেষ্টা করতেন। তাহলে নিশ্চয় বুঝতে পারতেন এই দাবিগুলো কত দিনের জমানো ক্ষোভ থেকে এসেছে।’
অনিশ্চয়তা দিনে দিনে বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারের যদি ন্যূনতম সংবেদনশীলতা থাকত, ছাত্ররা কেন এই আন্দোলন করছে তাহলে খুব সহজেই বুঝতে পারত। সরকারের ধারণা, ধমক দিয়ে চাপ দিয়ে অত্যাচার-নির্যাতন করলে ক্ষোভ-অসন্তোষটা চলে যাবে। কিন্তু সেটা তো যায় না। প্রতিবাদগুলো ভেতরে ভেতরে থেকে যায়। সেটারই প্রকাশ হয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনে।’
শিক্ষকরা বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উস্কানি দেয়া নয় বরং অভিভাবকের মতো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা।
ইতিহাস বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. আহমেদ কামাল বলেন, ‘আমি নেহায়েত বিবেকের তাড়নায় এখানে এসেছি। আমার শরীর খুব খারাপ, এই রোদের মধ্যে ডাক্তারের নিষেধ থাকা স্বত্ত্বেও আর সম্ভব হচ্ছিল না।’
‘এক ন্যায় সঙ্গত আন্দোলন, একটা গণতান্ত্রিক আন্দোলন, একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার পরেও তাদের মনে হয়েছে যে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে এই দাবিটা আদায় করা হচ্ছে। এবং সেই ক্ষোভে প্রধানমন্ত্রী পুরোটাই দিয়ে দিলেন। আমি তো দেই নাই, আমার কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে’; এই মনোভাব হচ্ছে জমিদারি মনোভাব। এই জমিদারি মনোভাব তখনই দেখা যায় যখন নাগরিকরা প্রজায় রূপান্তরিত হয়। আমরা আজকে প্রজা হয়ে গেছি, আমরা নাগরিক নাই। আমাদের সেই অধিকার নাই যে অধিকারের ফলে আমি সরকারকে, প্রধানমন্ত্রীকে, সরকারের এমপিকে প্রশ্ন করতে পারি।’
মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাসরীন ওয়াদুদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকে ছাত্রলীগের একটা তকমা দেয়া হয়েছিল যেটা নিয়ে আমি গর্ববোধ করতাম। এখন মনে হয় ছাত্রলীগ সত্যিকারের অর্থে একটা গালি। আমি মনে করেছিলাম শহীদ মিনারে আমিও যাব। কিন্তু আমার হাত-পা ভাঙা। তখন মনে হয়েছে যদি ওরা মারতে শুরু করে তাহলে আমি কি আমাকে সামলাতে পারব? কী রকম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা আছি আমরা চিন্তা করতে পারছি না।’
সংহতি সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হামলার বিচার করা, সরকারের কোটা সংস্কারের ঘোষণার প্রজ্ঞাপন জারি করা, ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সাতটি দাবি তুলে ধরেন।
শিক্ষকরা ভিসির বাড়িতে হামলার বিষয়টিও খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান। ‘নিপীড়নমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চাই’ শ্লোগানে সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে দ্বৈত প্রশাসন বা ছায়া প্রশাসন ব্যবস্থা দমনেরও আহ্বান জানান শিক্ষকরা।
সমাবেশ শেষ করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একটি মৌন মিছিল করেন। মিছিলটি অপরাজেয় বাংলা থেকে শুরু হয়ে কলা ভবনের পেছন ঘুরে মধুর ক্যান্টিন হয়ে আবার অপরাজেয় বাংলায় এসে শেষ হয়।







