দৃশ্যটি অপার্থিব। অনুভূতি অনির্বচনীয়। বিদায়ী বছরের মধ্য অঘ্রাণ। হালকা কুয়াশার আস্তরণ নাগরিক রাতের শরীরে। সড়কবাতির আলো অনেকটা ঘোলাটে হয়ে আছড়ে পড়ে সংযোগ সড়কে। পীচের পথে রঙ্গিণ পলিশীট বিছিয়ে তিনটি শিশু পড়ছে। অ আ ক খ। এ বি সি ডি।
সিরাজ, স্বপণ এবং ঝর্ণা। বয়স কত হবে তিনজনের? ছয় থেকে সাত। পথের পাশে কাঠের পলকা খুটি আর পলিথিনে ছাওয়া তাদের ঘর। বসে আছেন মাজেদা বেগম। ঝর্ণার মা। দূরে বসেও দেখে রাখছেন নিজের নাড়িছেড়া ধণসহ বাকীদেরও। ক্রাচে ভর করে দাড়িয়ে তিন শিশুর পড়ালেখা দেখছে তাদের চাইতে কিছুটা বড় বছর বারোর ফারজানা। ক্রাচে দাড়ানো ছোট মেয়েটির লম্বাটে ছায়ায় কর্কট সময়ের পরিহাস। ছায়ায় ফুঁটে ওঠে অসংখ্য গল্প। যে গল্পের নাম ‘কেয়ার অফ ফুটপাত’।
ফারজানার পড়া শেষ। চলে যেত সে ফুটপাতে ঘর তুলে থাকা দাদীর কাছে। যেতে পারে না। প্রতিদিনই এমন হয়। নিজের পড়া শেষ হয়ে গেলে চলে যাওয়ার সময় দাড়িয়ে পড়ে। মমতা ভরে দেখে ফুটপাতে পরিচয় হওয়া ছোট্ট ভাইবোনগুলোর পড়ালেখা। ভালো লাগে তার এ দৃশ্য। দেখতে দেখতে মায়া লাগে। রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত জাহিদ স্যার তাদের পড়াশোনা করান। অনেক গল্প বলেন। স্বপ্ন দেখান। পথের বিদ্যালয়। পয়সা লাগেনা। পড়তে খুব ভালো লাগে ওদের। প্রায় ৩০-৩৫ জন শিশু পড়ে পথের বিদ্যালয়ে। স্যার চলে গেলে ওরা চার জন অবশিষ্ট থাকে। বাকীরা চলে যায়। যার যার পথনিবাসে। স্বপন আর ঝর্ণা ডাক্তার হতে চায়। সিরাজ হতে চায় স্যার। স্বপন-সিরাজও ফুটপাতের ঘরে থাকে। জন্মের পর থেকে ওরা তাই দেখে আসছে।

অচেনা আগন্তুককে পাশে বসতে দেখে কিছুটা শঙ্কিত শিশুর দল। অবাকও হয়ত। ওদিকে ফুটপাতে সতর্ক মায়ের চোখ। স্যার কেন হতে চায় সিরাজ? কারণ স্যারেরা অনেক কিছু জানে। কত কি শেখায়! সেও নিজে ম্যালা কিছু শিখে অন্যদের শিখাতে চায়। এসব শিশুর মধ্যে লুকিয়ে আছে কি কোন আব্রাহাম লিংকন?
মাজেদা বেগম পরের বাড়িতে কাজ করেন। ২৭-২৮ বছর বয়স হবে। কিন্তু দেখে আরো বেশি মনে হয়। নিরন্তর কায়িক শ্রম আর দারিদ্র্য বুড়িয়ে দিয়েছে শরীর। তিস্তা পাড়ের লালমনিরহাট আদিতমারীতে বাড়ি। তিন বোন। ছোট থাকতে বাবা মারা যায়। মা ক্ষেতে কষ্ট করে ভিক্ষা করে তাদের বড় করেছে। পড়াশোনা খুব একটা হয়ে ওঠেনি তাই। ৬ ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা। ভালোবেসে খালাত ভাইকে বিয়ে। বিয়ের বয়স ১৬ হয়ে গেছে। মানে ১২ বছরে বিয়ে হয়েছিল। বুঝতে পারেন এখন অনেক বড় ভুল হয়েছিল। তাই নিজের দুই মেয়ের একজনেরও অল্প বয়সে বিয়ে দিতে চাননা। নিজের জীবন ফুরিয়ে আসছে প্রায় কিন্তু অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে কি ওদের জীবন শেষ করে দেওয়া যায়? এখন আফসোস করেন উপলব্ধিটা যদি আরো আগে হত! চার বছর ধরে ফুটপাতের জীবন। এর আগে স্বামী গ্রামে কাজ করত। কিন্তু সে আয়ে পোষায়না। জমি জিরাত নিজের না হলে কি চলে? গত তিন-চার মাস ধরে পুলিশ আর ঝামেলা করে না। তখন দিনের বেলা ভেঙ্গ দিত ঘর। রাতে আবার ঘর ওঠাতে হত। কোনদিন না ওঠাতে পারলে সেদিন খোলা আকাশের নীচে পাশের পার্কে ছোট ঝর্ণাসহ প্রায় নির্ঘুম রাত। বৃষ্টি এলে চলত দৌড়ে আশ্রয়ের খোঁজ। আলাপনে উপস্থিত জহর আলী। বয়স ৩২-৩৩। মাজেদার স্বামী। জহর মানে যে বিষ, জানেন তিনি। নামটি রেখেছিল তার মা। দাদীর এই বিষয়টি জানে ঝর্ণা। তিন বছর আগে দাদী পৃথিবী ছেড়েছে। কিন্তু দাদীর বুকে ওম পোহানো আদর এখনও মনে পড়ে ছোট্ট ঝর্ণার।
পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় জহর মিয়া। বাবা অনেক চেয়েছে সে পড়াশোনা করুক। কিন্তু পড়েননি। এখন বোঝেন কত ভুল করেছেন! গ্রামে ১০ শতক জমি কিনেছেন। বড় মেয়ে জহুরা তার শ্বশুড়ি মানে মেয়ের নানুর কাছে থাকে। মেয়েকে প্রতিমাসে ৫০০০ টাকা পাঠাতে হয়। রিকশা সারাইয়ের কাজ করে পাওয়া টাকা বড় মেয়ে আর পথের সংসার চালাতে চলে যায়। আর মাজেদা বাড়ি বাড়ি কাজ করে যা আয় করে সেটা পুরোটা সঞ্চয়। এখন স্বপ্ন আর ২ বছর থেকে জমানো টাকা দিয়ে কিছু ধানী জমি কিনে তারপর গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন। বউ আর ২ মেয়েকে নিয়ে কেয়ার অব ফুটপাত ছেড়ে সুস্থিরতায় ঝুঁকবেন। তাদের পথের ঘরের ছবি তুলতে চাইলে জানান, এগলা ফটুক তুলি কি হইব?
আদিতমারীর গল্পতো ফুরিয়ে আসে। এদিকে বারো বছরের ফারজানা তার দাদীর কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তার বাবা গাজীপুরে গার্মেন্টসে কাজ করে। তবে দাদীকে নিয়ে সে এখানে কেন? বাবা তার মেয়েকে বা মাকে দেখতে আসেনা? প্রশ্নের উত্তর কিই বা দেবে ছোট্ট মেয়েটি। এ প্রশ্ন যে তারও! সে হাটতে থাকে। ক্রাচে ভর করে মেয়িটির ছায়াও হাঁটতে থাকে। ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে ছায়া। আর সরে যেতে থাকে না জানতে পারা গল্পগুলো।








