ডাক্তার এড্রিক বেকার ভীন দেশের মানুষ। নিউজিল্যান্ডে জম্ম নেওয়া মানুষটির মনে বাংলাদেশের জন্য মায়া জম্ম নেয় সেই ১৯৭১ সালে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হায়েনাদের বর্বর হত্যাযজ্ঞ, ভারতগামী শরণার্থীর মিছিলের ছবি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই সব খবর ও ছবি তাঁর মনে দাগ কেটে যায়। তখন থেকেই সংকল্প করেন, যে করেই হোক এই দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন। তিনি তাই করেছেন।
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এড্রিক বেকার। বাংলাদেশে এসে প্রথমে মেহেরপুর মিশন হাসপাতালে দু’বছর ও পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ৮ মাস কাজ করেন।
অসহায় মানুষের জন্য নিবেদিত বেকার কোনো দিন চাননি বড় কোনো হাসপাতালের গন্ডিতে কেটে যাক তার জীবন। ৭১’সালের মনের মাঝে গেথে থাকা ছবিগুলোই তাকে ভীষণভাবে নাড়া দিতো। সবসময় ছটফট করতেন নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে তাদের জন্য কিছু করার। আর সে চিন্তা থেকেই চলে আসেন টাঙ্গাইলের মধুপুর পাহাড়ি গড় এলাকায়। যোগ দেন গড় এলাকার থানারবাইদ গ্রামের চার্চ অব বাংলাদেশের একটি ক্লিনিকে।
যোগদানের অল্প দিনেই গারো জণপদের মানুষ খুঁজে পান তাদের সত্যিকারে দেবতাকে। তাদের দেবতা তাদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন গরীবের হাসপাতাল। আর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পিতা সকলের কাছেই দেবতার পূজনীয় নাম হয়ে যায় ডাক্তার ভাই।
ডাক্তার ভাই আর বেঁচে নেই। গারো মানুষদের ভালোবেসে একটানা ৩৬ বছর চিকিৎসা সেবা দিয়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর তার প্রতিষ্ঠিত গরীবের হাসপাতালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতালের পাশেই তাদের দেবতাকে সমাহিত করা হয়েছে।
মৃত্যুর অল্পকিছু দিন আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন তাঁর শেষ ইচ্ছের কথা। তিনি বলেছিলেন ‘প্রতি বছর দেশের কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছেন। আমি প্রতীক্ষায় আছি সেই দিনের অপেক্ষায়, যেদিন এদের মধ্যে থেকে অন্তত একজন ডাক্তার চলে আসবেন আমাদের এ গরিবের হাসপাতালে। নিজেকে নিয়োজিত করবেন গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবায়।’
জীবিত অবস্থায় আধুনিক সমাজে যতোটুকু না আলোচনায় ছিলেন মৃত্যুর পর হয়েছে তার উল্টো। বিস্তর লেখালেখি হয়েছে তাকে এবং তাঁর কর্মময় জীবন নিয়ে। গরীবের হাসপাতালকে টিকিয়ে রাখার জন্যও মিলেছে হাজারো প্রতিশ্রুতি। কিন্তু যে শঙ্কায় নিমর্জিত থেকে বেকার তার শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন তা আজো পূরণ হয়নি! তারপরেও চলছে গরীবের হাসপাতাল। কেমন চলছে সেই হাসপাতাল ?
কাইলাকুড়ী গ্রামে চার একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালে মাটির ছোট ছোট ২৩টি ঘরের হাসপাতালে ডায়াবেটিক, শিশু, ডায়রিয়াসহ ৭টি বিভাগে ৪০ জন রোগী ভর্তির ব্যবস্থা আছে। এছাড়া প্রতিদিনই আউটডোরে শতাধিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ডাক্তার বেকারের মৃত্যুর পর এই হাসপাতাল নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন হাসপাতালের ৯৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। পরে তারা বেকারের নির্দেশনা মোতাবেক এখনো হাসপাতালের হাল ধরে আছেন।
বর্তমানে হাসপাতাল চলছে ডাক্তার বেকারের স্মৃতি নিয়ে। প্রতিদিনই দরিদ্র রোগীরা আসছে আর তারা প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে। নতুন রোগীদের জন্য ২০ টাকা আর পুরাতনদের জন্য ১০টাকা করে ফি নেওয়া হচ্ছে। তার আদর্শের অনুসারীরা মনে করেন, বেকারের অভাব কখনোই পূরণ হবে না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় রোগ প্রতিরোধে করনীয় বিষয়ে রোগীদের প্রাথমিক ধারনা দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উপর বেশি জোর দিচ্ছেন তারা।
কাইলাকড়ী গ্রামের সুমেত আরা বলেন, আমরা কিভাবে কঠিন ও জটিল রোগ থেকে বাঁচতে পারি সেসব আমরা এই হাসপাতাল থেকে জানতে পারি। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা তা আমাদের বাড়ীতে ব্যবহার করি। আর এতে করে আমরা অনেক ভালো আছি।
কাইলাকড়ী স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী সুজিত রাং সা বলেন, ডাক্তার বেকারের তিনটি শেষ ইচ্ছার মধ্যে দুইটি পূরণ হয়েছে। এই হাসপাতালটি টিকিয়ে রাখাই ছিলো তাঁর শেষ ইচ্ছা। তাই প্রতিষ্ঠানটির সেবা অব্যহত রাখতে সরকারের সহযোগিতা চাইলেন এই কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে কোনো সমস্যার কথা জানায়নি। যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের কোনো সহযোগিতা চায়, তাহলে জেলা প্রশাসন অবশ্যই তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেব।







