সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের শিশু সন্তানদের তাদের বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার নীতির কারণে একদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছিলো জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল। বুধবার এই সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে দেশটি।
মার্কিন প্রশাসনের একটি বিতর্কিত অভিবাসন নীতি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ উপায়ে প্রবেশ করেছে এরকম পরিবারগুলো থেকে বাবা-মা ও শিশুদের আলাদা করে দেয়া হচ্ছে।
গত ৬ সপ্তাহে আমেরিকার ‘জিরো টলারেন্স অভিবাসন নীতি’র কারণে দু’হাজারেরও বেশি শিশু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তাদের পিতা-মাতার কাছ থেকে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্যপদ ত্যাগ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সব রকমের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতিসংঘ সদরদপ্তরের এক কর্মকর্তা। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন প্রতিনিধি নিকি হেলে এবং সেক্রেটারি অব স্টেট মাইক পম্পিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন।
যদিও এমন সিদ্ধান্ত জানানোর সময়টা ভ্রু কুঁচকে দেওয়ার মতো, কিন্তু তা একেবারেই যে অপ্রত্যাশিত ছিলো এমন নয়। এক বছর আগেও নিকি হ্যালি জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিল সফরের সময় আলটিমেটাম দিয়েছিলেন; কাউন্সিল তার পছন্দ অনুযায়ী নিজেদের সংস্কার না করলে, যুক্তরাষ্ট্র নাম প্রত্যাহার করে নিতে পারে।
গত বছর নিকি হেলে সংস্থাটির ক্রমাগত ইসরাইলবিরোধী মনোভাবের সমালোচনা করে বলেছিলেন, এমন চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটিতে তার সদস্যপদ রাখার ব্যাপারে ভেবে দেখবে।
হ্যালির এই সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুইটি বিষয়: কাউন্সিলটি ইসরায়েলের উপর অতিরিক্ত ফোকাস দেয় এবং এই কাউন্সিলের কয়েকজন সদস্য দেশের মানবাধিকার রেকর্ড দুর্বল।
কিন্তু কাউন্সিলে থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার বদলে এবং দুর্বল মানবাধিকারের রেকর্ড থাকা দেশগুলোকে নিরস্ত রাখতে সচেষ্ট হওয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র কাউন্সিল থেকেই বেরিয়ে আসলো।
মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে বেরিয়ে আসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেন এই ক্ষেত্রে নিজেদের বৈশ্বিক নেতৃত্বই পরিত্যাগ করলো।
২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি তার বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য সমালোচিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল তার সদস্য দেশগুলোকে মানবাধিকার বিরোধী কার্যক্রমের পক্ষে অবস্থান নেয়া।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতি হ্যালির সমালোচনা, এই কাউন্সিলের বয়সের সমানই পুরোনো। কাউন্সিলটি গঠিত হয়েছিলো ২০০৫ সালে। জাতিসংঘে তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বেসেডর জন বল্টোন এতে বুশ প্রশাসনের যোগ না দেওয়ার জন্য সফল লবি করেছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র এতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন তাদের বিশ্বাস ছিলো কাউন্সিলের ভেতর থেকেই এর কার্যক্রম তারা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আর তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো ইসরায়েলকে রক্ষা।
পরবর্তী তথ্য-উপাত্ত সাক্ষ্য দেয়- কাউন্সিলে যোগ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় আরও কার্যকর হয়েছে।
কয়েক বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে কাউন্সিলের পররাষ্ট্র বিষয়ক গত বছরের একটি রিপোর্ট এমন প্রমাণই দেয়। রিপোর্টটিতে যুক্তরাষ্ট্র কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে এবং সদস্য না থাকার সময়টুকুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র কাউন্সিলের যোগ দেওয়ার পর থেকে ইসরায়েল বিষয়ক রিজোলিউশন অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে।
অন্য কথায়, যুক্তরাষ্ট্র কাউন্সিলের সক্রিয় অংশ থাকা অবস্থায়, কাউন্সিল ইসরায়েলের উপর থেকে তার ফোকাস কমিয়েছে এবং মানবাধিকার বিষয়ক রেকর্ডে সমস্যা থাকা অন্য দেশগুলোর উপর তাদের ফোকাস বাড়িয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তে আসা যায়- কাউন্সিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ এই কাউন্সিল আরও বেশি নেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ কাউন্সিলকে ডিসক্রেডিট করার উদ্দেশ্যেই। মূলত বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার জন্য এই কাউন্সিলের একটি ভালো রেকর্ড রয়েছে।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন বিষয়ক বিরোধই জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের একমাত্র কাজ নয়। এর ১২ বছরের কার্যক্রমে এই কাউন্সিল মানবাধিকার লঙ্ঘণের ঘটনায় তদন্ত এবং বৈশ্বিক আদর্শ নির্মাণের কাজে একটি ভালো রেকর্ড গড়ে তুলেছে।
২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত সমর্থনে মানবাধিকার কাউন্সিল একটি ঐতিহাসিক রেজুলিউশন পাস করে, যেখানে এলজিবিটি অধিকার আর মানবাধিকারকে সমান বলে উল্লেখ করা হয়।
গত বছরেই মানবাধিকার কাউন্সিল একটি নতুন বিশেষ মানবাধিকার ‘দূত’ অনুমোদন দেয় যার কাজ হবে এলজিবিটি বিষয়ক অধিকার বিষয়ে কাজ করা।
নিরাপত্তা পরিষদ যখন বড় শক্তির দ্বন্দ্বে কোন ব্যবস্থা নিতে পারে নাই সেখানে কাউন্সিল গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে একটি ভালো উদাহরণ সিরিয়া। সেখানে নিরাপত্তা পরিষদ কোন ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু মানবাধিকার কাউন্সিল ঠিকই সেখানকার মানবাধিকার লঙ্ঘণের তদন্ত করতে একটি কমিশন গঠন করেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘণ এবং অপরাধীদের শণাক্ত করে প্রতি ৬ মাসে এই কমিশন একটি নতুন রিপোর্ট প্রকাশ করে। তা অবশ্য হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে পারে নি। কিন্তু সিরিয়ার অপরাধের একটি জোরালো প্রমাণ রেখে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সিরিয়ায় যুদ্ধাপরাধের বিচারে ব্যবহৃত হতে পারে।
এতে আরও দেখায় নিরাপত্তা পরিষদের অকার্যকারিতা সত্ত্বেও বৈশ্বিক ইস্যুতে জাতিসংঘ একটি ভালো অবদান রাখতে পারে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে সরে আসার মার্কিন এই সিদ্ধান্তে মানবাধিকার সংস্থা নিন্দা জানিয়েছে। সেভ দ্যা চিলড্রেন, হিউম্যান রােইটস ক্যামপেইন, ফ্রিডম হাউজের মতো সংস্থা নিন্দা জানিয়েছে।এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেরও পরিপন্থী।
তবে যুক্তরাষ্টের বেরিয়ে আসার ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি জাতিসংঘ। বরং তারা দেশটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছে মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সময়ে সিদ্ধান্তটি নিতে যাচ্ছে যখন ট্রাম্প প্রশাসন নিজেরাই শিশু অভিবাসনকারীদের তাদের বাবা মা থেকে বিচ্ছিন্ন করার মতো গুরুতর মানবাধিকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত।







