মূল্যবোধের অবক্ষয়ে বখে যাওয়া কিশোর-তরুণরা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে মনোবিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন। ১৪ বছরের কিশোর আদনান কবির হত্যাকাণ্ডে অনেকগুলো বিষয় পর্যালোচনা করে তারা বলেছেন, যে প্রযুক্তি কিশোরদেরকে আরো উদার, আরো মানবিক এবং আরো বিশ্বনাগরিক করতে পারতো ভুল ব্যবহারে তারা তার নেতিবাচক দিকটা বেছে নিয়ে এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটিয়ে ফেলছে।
কিশোরদের বখে যাওয়া রোধে করণীয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রাথমিক প্রতিরোধ পরিবার পর্যায় থেকে নিতে হবে; দ্বিতীয় প্রতিরোধ দায়িত্ব বিদ্যালয় এবং সমাজের।
আদনান হত্যাকাণ্ডের পেছনে বেশ কয়েকটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। উঠে এসেছে উত্তরায় সক্রিয় কিশোরদের বেশ কয়েকটি গ্যাং এবং ফেসবুক গ্রুপের নাম। এসব গ্রুপের লিডারদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আর সদস্যরা অষ্টম থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। এরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপকর্মে জড়িত।
শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) উত্তরার ১৭ নম্বর সেক্টরের একটি সড়কে আদনান কবিরকে ধাওয়া করে কুপিয়ে হত্যা করে কয়েকজন কিশোর। সে উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিল।
নিহত আদনানের বাবা কবির হোসেন উত্তরার কিশোরদের বেশ কয়েকটি গ্যাংয়ের কথা জানিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে কেউ কোন বিষয়ে শিক্ষককে যদি নালিশ করে থাকে তাহলে এসব গ্যাং সদস্যরা স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে কিংবা স্কুলের বাইরে ওই শিক্ষার্থীকে মেরেছে, জখম করেছে– এমন ঘটনা অনেক।
তিনি আরো জানান, উত্তরায় এরকম সাত থেকে আটটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এরা প্রতিনিয়ত অন্য শিক্ষার্থীদেরকে নিজেদের দলে ভিড়তে উৎসাহ যোগায়। উত্তরার অনেক বাবা-মা এখন ব্যাপারগুলো টের পেয়ে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে উত্তরা ছাড়ছে।
১৮ বয়সের নীচে কিশোরদের বখে যাওয়ার কারণ হিসেবে মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপ-গ্রুপ কালচার ও ইন্টারনেটভিত্তিক নেতিবাচক কমিউনিটি গড়ে উঠা এবং এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশের মিডিয়া আগ্রাসনকে দায়ী করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: মূ্ল্যবোধ আমাদের কিশোররা পরিবার থেকে যেমন পাচ্ছে না তেমনি বিদ্যালয় থেকেও পাচ্ছে না। আমাদের কিশোরদের মনে খুব সহজেই ঢুকে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশের মিডিয়া। সেখানে যেভাবে ক্রাইম ফিকশনগুলো দেখানো হচ্ছে, অস্ত্র দেখানো হচ্ছে তা সহজেই লুফে নিচ্ছে কিশোররা।
‘এই বয়সে অনুকরণটা প্রিয় থাকে,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের দুরত্ব। ‘ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক নিয়ে আমাদের কিশোররা হাইলি ইনডিভিজ্যুয়ালিস্টিকও হয়ে যাচ্ছে।’
কিশোরদের খেলার মাঠের অভাবের কথা জানিয়ে এহসান হাবীব বলেন: ঢাকা শহর এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। আমাদের কিশোরদের অবসর কাটানোর জন্য কোন খেলার মাঠের ব্যবস্থা নেই। অতিরিক্ত জনগোষ্ঠী আর নগরায়নের ফলে কমিউনিটির মনিটরিং ব্যবস্থা কমে যাচ্ছে। কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে সহজেই একজন অপরাধী অপরাধ করে পালিয়ে যাচ্ছে।
কিশোরদের জন্য রাষ্টের করণীয় নিয়ে তিনি বলেন: রাষ্ট্র চাইলে কিশোরদের জন্য অনেককিছুই করতে পারে। রাষ্ট্রের অনেক প্রকল্প রয়েছে যা প্রয়োজন নেই, ওইসব জায়গাগুলোতে কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ করে দেওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের এ অধ্যাপকের কথার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ঝুনু শামসুন নাহার।
তিনি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সঙ্গে যোগ করেছেন পারিবারিক অস্থিরতার কথা। ‘ঢাকা শহরে অধিকাংশ সন্তানের বাবা-মা চাকুরীজীবি। বাবা-মা চাইলেও দেখতে পারছে না তাদের সন্তান কী করছে, কাদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। আমাদের কিশোরদের বখে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ধৈর্যের অভাব। খুব অল্প জিনিসের জন্য তারা হত্যাকাণ্ডের মতো কাজ বেছে নিচ্ছে।’
অধ্যাপক ঝুনু শামসুন নাহার বলেন: আমদের কিশোররা অধিকাংশই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের ব্যস্ত রাখছে। রাতের বেলা তারা জাগছে, সারা দিন ঘুমাচ্ছে। পরিবার ভুলে নিজেদের ব্যস্ত রাখছে ভারচুয়াল জগতে।
কিশোরদের এমন অবস্থা থেকে বের করে আনতে করণীয় সম্পর্কে দু’জনই বলেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে কিশোরদের নিয়ে সচেতনতা পরিবারের মধ্য থেকে আসতে হবে। পরের পর্যায়ে বিদ্যালয় ও সমাজের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, কিশোররা মারাত্মক অপরাধের সঙ্গে যাতে জড়িত হতে না পারে সামাজিকভাবে এবং গণমাধ্যমে এমন প্রচার ও বিজ্ঞাপন এবং শিক্ষণীয় অনুষ্ঠান প্রচার করতে হবে।
‘সর্বোপরি কিশোরদের স্বার্থেই ওভালঅল কমিউনিটি-বেসড ইন্টারভেশন চালু করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ঝুনু শামসুন নাহার বলেন: দেশের আইন-কানুন সম্পর্কেও কিশোরদের জানাতে হবে। অন্যের জন্য ভালো কিছু করা শেখাতে হবে। স্কুলের সিলেবাসে এমন কিছু জিনিস যোগ করতে হবে যাতে কিশোররা হিংস্র না হয়ে অন্যের প্রতি নমনীয় ও সংবেদনশীল হতে পারে।









