মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের হারু ঘোষের কথা হয়তো মনে আছে আপনাদের। সেই যে হারু বটগাছে হেলান দিয়ে বজ্রপাতে নিহত হয়ে নিথর দাঁড়িয়ে ছিল। সে যদি বটগাছের গোড়ায় না দাঁড়িয়ে, ১০-১২ ফুট দূরে দাঁড়াত তাহলে হয়তো বজ্রপাতে মৃত্যু হতো না। ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতেই হারু গাছটির নিচে দাঁড়িয়েছিল। অনেকেই না জেনে ঝড়-বৃষ্টির সময় আশপাশে বাড়িঘর না পেলে বড় গাছের গুঁড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু এই আশ্রয় নেওয়াটিই মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেড়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৭ এই আট বছরে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৮০০-এর বেশি। এ গবেষণায় প্রথম সারির চারটি দৈনিকে প্রকাশিত বজ্রপাতে মারা যাওয়ার খবরকে একত্র করে দেখানো হয়েছে। আমার ধারণা, বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। বিবিসির দেওয়া তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২৫ মিলিয়ন বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতে মানুষ মারা যায় ৪০ থেকে ৫০ জন।
আমাদের দেশে প্রতি বছর কীসংখ্যক বজ্রপাত হয় তা রেকর্ড করার কোনো প্রযুক্তি নেই। ভারতীয় আবহাওয়া অফিসের রাডার থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২ হাজার ৪০০-এর মতো বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ২০৫, ২০১৬ সালে ২৪৫, ২০১৫ সালে ১৮৬, ২০১৪ সালে ২১০, ২০১৩ সালে ২৮৫, ২০১২ সালে ৩০১ ও ২০১১ সালে ১৭৯ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। আর নিহতের শতকরা ৯০ জনই কৃষক ও কৃষিশ্রমিক। যুগ যুগ ধরে বৈরী প্রকৃতি আর প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করা তৃণমূল কৃষকের অনিবার্য নিয়তি। পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাপন অনেক সুরক্ষিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের সাধারণ মানুষেরও জীবনযাপনের ধারা উন্নত হচ্ছে। এসেছে বিত্তবৈভব আর জীবনযাপনের বহুমুখী নিরাপত্তা। জীবনকে সহজ-সাবলীল করার অভিযান চলছে অনবরত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণনাশের হার কমে এসেছে উল্লেখযোগ্য রকম। এটি সম্ভব হয়েছে সুষ্ঠু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কারণে।
কৃষককে জীবন-জীবিকার তাগিদেই প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকতে হয়। প্রকৃতি যখন বিরূপ হয়ে ওঠে সেই শাস্তিও নীরবে ভোগ করতে হয় সরলপ্রাণ কৃষককে। অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়েই মানুষের পূর্বপ্রস্তুতির কিছু সুযোগ আছে, কোনো কোনো দুর্যোগে সে সুযোগও নেই। ভূমিকম্প আর বজ্রপাত এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ। বজ্রপাতে এ দেশে গত সাত বছরে মৃত্যুর হিসাবটি আগেই বলেছি, ভারতে এ হিসাবটি অনেক বড়। সেখানে বছরে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় প্রায় ২ হাজার মানুষের। সেখানেও বড় একটি অংশ কৃষক। বর্তমানে এ মৃত্যুহার বেড়েই চলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ তালগাছ কমে যাওয়া। আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনো বড় গাছের ওপর পড়ত। বজ্রপাত এক ধরনের বিদ্যুত্রশ্মি। তাই বজ্রপাতের ওই রশ্মি গাছ হয়ে মাটিতে চলে যেত। এতে মানুষের তেমন ক্ষতি হতো না।
দিন কয়েক আগে ঢাকার ধামরাইয়ের ফরিঙ্গা গ্রামে গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ওই গ্রামের মানুষের কাছে বজ্রপাত এক আতঙ্ক। শুনলাম এখানে অনেক কৃষকই প্রাণ হারিয়েছেন বজ্রপাতে। প্রাণ হারিয়েছে মাঠে থাকা গবাদি পশুও। কথা হয় পিয়ার আলী নামের এক কৃষকের সঙ্গে। তিনি জানান, তার ভাই ইমান আলীর মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে ইমান আলীসহ চারজন একসঙ্গে একই ছাতার নিচে ছিলেন। তিনজন আহত হলেও মৃত্যু হয় ইমান আলীর। বিষয়টি অনেকের কাছে রহস্যজনক মনে হতে পারে। চারজন একসঙ্গে থাকলে সেখান থেকে একজনের মৃত্যু হয় কীভাবে? কারণটি ব্যাখ্যা করেন স্থানীয় যুবক প্রকৌশলী মো. মনির হোসেন। তিনি বলেন, ছাতাটি ছিল ইমান আলীর হাতে। ছাতাটির হাতল ছিল ধাতব নির্মিত। আর ইমান আলী ছিলেন খালি পায়ে। যার কারণে বিদ্যুৎ তার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে মৃত্যু হয় ইমান আলীর।

বজ্রপাতে স্বজন হারানোর কষ্ট শুধু পিয়ার আলীর নয়; শামসুল আলম, ইয়াকুব আলী, শরিফুন্নেছাসহ আরও অনেকের। তারা জানালেন বজ্রপাতে মারা যাওয়া স্বজনের মৃতদেহ কবর দেওয়ার পর তাদের পোহাতে হয় আরেক যন্ত্রণা। বজ্রপাতে মারা যাওয়া মানুষের লাশ নাকি চুরি হয়ে যায়। লাশ চুরি ঠেকাতে রীতিমতো রাত জেগে পাহারা দিতে হয়। কৃষক ও সাধারণ মানুষের এসব দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতে শুনতে পৌঁছে যাই বিস্তীর্ণ সবুজ কৃষি খেতে। সেখানে তরুণ প্রকৌশলী মো. মনির হোসেন ফরিঙ্গা গ্রামে বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থাপনার একটি কার্যক্রম শুরু করেছেন। এ নিয়ে চলছে তার নানা গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মূলত ফরিঙ্গা গ্রামে গিয়েছিলাম তার কর্মকাণ্ড দেখতে। পাশাপাশি বজ্রপাত বিষয়ে কৃষক কতটুকু সচেতন, এ ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করাও ছিল উদ্দেশ্য। গিয়ে দেখি একদল কৃষকের সামনে বজ্রপাতে প্রাণ সুরক্ষার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে এই পর্যবেক্ষণ বা ব্যবহারিক কিছু বিষয় জানা-বোঝার আয়োজন করেছেন তরুণ প্রকৌশলনী মো. মনির হোসেন। তিনি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বজ্রপাতের বিষয়টি কৃষকদের মধ্যে তুলে ধরেন। বিস্তীর্ণ জমিতে কৃষক যখন কাজ করেন তখন সাধারণত সেখানে কৃষকই থাকেন সবচেয়ে বেশি উচ্চতার (যদি আশপাশে তার উচ্চতা থেকে বড় কোনো গাছ-গাছালি বা ঘরবাড়ির কাঠামো না থাকে); আর কৃষকের হাতে থাকে কাস্তে বা ধাতব যন্ত্রপাতি। এ কারণে কৃষক বজ্রপাতে মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন। বজ্রপাত থেকে কৃষককে সুরক্ষা দিতে মনির হোসেন নিজেই বজ্রপাত নিরোধক একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। ৩০ ফুট লম্বা বাঁশের ওপর লোহার দণ্ড বা পাত স্থাপন করে তার ওপর একটি সিলভারের থালা বা ঢাকনার মতো কিছু একটা বসিয়েছেন। সেখান থেকে একটি অ্যালুমিনিয়াম তার সংযোগ হিসেবে টেনে এনে মাটিতে একটি রডের সঙ্গে পুঁতে দিয়েছেন। অর্থাৎ আর্থিং করে দেওয়া হয়েছে।
মনির জানালেন তারটি তামার হলে ভালো হতো। কিন্তু তামার তারের দাম বেশি আর এটি চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অ্যালুমিনিয়ামের তার ব্যবহার করার পরামর্শ দেন তিনি। ৩০ ফুট লম্বা বাঁশের এই আর্থিং সংযোগ ৩০ ফুট এলাকার মধ্যে অবস্থানকারীদের বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে বলে জানিয়েছেন প্রকৌশলী মনির হোসেন। প্রকৌশলী মনির তার স্থাপিত আর্থিং ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা তা বিদু্যুৎ সুরক্ষার মাত্রা মেপে দেখালেন। জানালেন, ১০ ওহমের নিচে আর্থিং হলেই কৃষক নিরাপদ। কৃষক মাঠের যেখানে কাজ করবেন সেখানে কাজ শেষ করে অন্য যেখানে কাজ করবেন সেখানে এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেতে পারবেন। এলাকার কৃষকসহ জনসাধারণের কাছে বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার এ বিষয়গুলো বেশ গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। তারাও মাঠে অনায়াসেই এমন আয়োজন করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন।

প্রকৌশলী মনির হোসেনের বজ্রনিরোধক এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলি অ্যাকশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়ার কনসালট্যান্ট ড. মো. শামীম হাসান ভূঁইয়ার সঙ্গে। তাকে মনির হোসেনের প্রজেক্টের কার্যক্রমের ভিডিওচিত্র সবিস্তার দেখাই। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। সাধারণ কৃষকের কথা ভেবে মনির হোসেন যে এ রকম একটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন এজন্য সাধুবাদ জানান শামীম হাসান। তিনি বলেন, একটু পরিমার্জন করলে মনির হোসেনের ব্যবস্থাপনাটি কিছুটা কাজে আসবে। তবে কৃষকের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তিনি জানান, বিজলির সময় গুনে বোঝা যায় বজ্রপাত কৃষকের দিকে আসছে কিনা। প্রথম বিজলি থেকে পরবর্তী বিজলির সময় যদি ক্রমেই কমতে থাকে তবে বুঝতে হবে বজ্রপাত ক্রমে কৃষকের দিকেই ধেয়ে আসছে। তাকে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মাঠে কাজ করতে যাওয়ার সময় কাঠ বা প্লাস্টিকের টোল সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত। বজ্রপাতের সময় সেই কাঠ বা প্লাস্টিকের টোলে নিচু হয়ে বসতে হবে। পায়ে রাবারের জুতা থাকাটা নিরাপদ। আর যদি প্রথম বিজলি থেকে পরবর্তী বিজলির সময় ক্রমে বাড়তে থাকে তবে বুঝতে হবে বজ্রপাত ক্রমে কৃষকের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। মনির হোসেনের এই ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গেও।
তিনি বলেন, মনির হোসেনের এ উদ্যোগ অনেকটাই বিজ্ঞানসম্মত। তবে এ দিয়ে পুরোপুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। তিনিও কৃষককে বজ্রপাতের বিষয়ে সচেতন হতে বলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ৩০ঃ৩০ ফরমুলার কথা উল্লেখ করেন। বিজলি দেখার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে যদি শব্দ শোনা যায় তবে বুঝতে হবে কাছে কোথাও বজ্রপাত হচ্ছে। তখন অবশ্যই কৃষককে নিরাপদ ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে এবং শেষ বজ্রের শব্দের পর থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত তাকে নিরাপদ আশ্রয়েই অবস্থান করতে হবে। বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিলে অবশ্যই গাছের গোড়া থেকে ১০-১২ ফুট দূরে অবস্থান করতে হবে।
বজ্রপাতের মতো আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সামষ্টিকভাবে সুরক্ষিত রাখার প্রযুক্তি এখনো পৃথিবীতে আসেনি। বজ্রপাত ক্ষতির কারণ হলেও এর বেশ উপকারী দিকও রয়েছে। বিজ্ঞান বলে, মাটিতে নাইট্রোজেন বা পুরোভাবে প্রোটিনের উৎস হলো বজ্রপাত ও বৃষ্টির দ্বারা তৈরি নাইট্রিক অ্যাসিড। বহু জীববিজ্ঞানীর মতে, প্রথম প্রোটোপ্লাজম সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে বজ্রপাতের অবদান। তাই বজ্রপাতের আশীর্বাদটুকু নিতে আমাদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা পাওয়ার কৌশলগুলো শিখিয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে ফাঁকা মাঠে কাজ করা কৃষকের জন্য বজ্রপাত দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ। সে কারণে অবশ্যই জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ ছয় মাস আকাশে মেঘের অবস্থা বুঝে কৃষকের উচিত হবে আবাদি খেতে কাজ করার আগে বজ্রপাত সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা।
একটু সচেতন হলেই বৈরী আবহাওয়ায়ও প্রাণহানির মতো ঝুঁকি কৃষক অনেকটাই এড়াতে পারবেন। বজ্রপাত সুরক্ষার জন্য সামগ্রিকভাবে কার্যকর একটি সুরক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা উচিত সংশ্লিষ্টদের। এ ক্ষেত্রে তরুণ প্রকৌশলীর প্রাথমিক উদ্যোগটি প্রশংসার দাবি রাখে। তবে বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে কৃষকের জন্য সহজ হয় এমন একটি পদ্ধতি বাতলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রতিনিয়তই জলবায়ু পাল্টে যাওয়া এই সময়ে যতটা সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রত্যেক কৃষকের দায়িত্ব।







