র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র্যাব) গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদকে জীবন থেকে ছিনিয়ে নিলো মৃত্যু। মৃত্যু তাকে ছিনিয়ে নিলেও লে. কর্নেল আজাদ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন। দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সিলেটের শিববাড়ি এলাকার জঙ্গি আস্তানায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নিয়ে শনিবার সন্ধ্যার পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্রিফিং করা হয়। ব্রিফিং শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট পরই ব্রিফিংস্থলের কাছে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হন ৬ জন, আহত প্রায় ৫০। তাদের মধ্যে আহত আজাদকে প্রথমে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা দেয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সেই রাতেই বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তাকে ঢাকায় এনে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোববার রাতে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। সেখানে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। পরে ২৯ মার্চ সিঙ্গাপুর থেকে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আবার সিএমএইচে রাখা হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় তার। এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন কর্মকর্তার মৃত্যু দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সেটা বলাই বাহুল্য। দেশের জন্য স্পর্শকাতর অনেক বিষয় নিয়েই কাজ করতেন তিনি। র্যাবের মতো এলিট ফোর্সের গোয়েন্দা প্রধান অতি গোপনীয় বিষয় নিয়ে অবহিত থাকবেন সেটাও স্বাভাবিক। কাজের খাতিরে তিনি বাহিনীর তথা দেশের অনেক কর্মপরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। দেশের নিরাপত্তা অক্ষুন্ন রাখতে, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস তথা অপরাধের মূলোৎপাটনে লে. কর্নেল আজাদের মেধা-মননও আমাদের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন বলেই সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় তাকেও উপস্থিত থাকতে হয়েছে। রাজধানীতে বসে অধস্তনদের নির্দেশনা দিয়ে তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অকালে হারানো কী আমাদের কপালের লিখন হয়ে থাকবে! নাকি আমরা ঘুরে দাঁড়াতে শিখবো, রুখে দাড়াবো! এই যে একের পর এক ব্যঙের ছাতার মতো জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, তাদের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে! একেক অভিযানে আমাদের আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে ঝাপিয়ে পড়ছেন। সফলভাবে তারা জঙ্গিদের আটক করছেন। উল্লেখযোগ্য বড় অভিযানে বেশ কয়েকজন জঙ্গি নেতার মৃত্যু হয়েছে। এসব অভিযান চালাতে গিয়েই নিহত হয়েছেন আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যরা। লে. কর্নেল আজাদ ছাড়াও গত শনিবার সিলেটের শিববাড়িতে বোমা বিষ্ফোরণের ওই ঘটনাতেই নিহত হন পুলিশ পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম। সেই বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরেক পুলিশ কর্মকর্তা চৌধুরী মোহাম্মদ আবু কয়সার দিপু। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের নিক্ষেপ করা বোমায় সিনিয়র সহকারী কমিশনার রবিউল করিম ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন খান নিহত হন। গত বছরের ৭ জুলাই সকালে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদ-উল-ফিতরের নামাজে নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালনকালে জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন কনস্টেবল আনছারুল হক ও জহিরুল ইসলাম। আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কেবল আইন-শৃংখলা বাহিনী দিয়েই দেশ থেকে জঙ্গি মূল উৎপাটন সম্ভব? জঙ্গিবাদ তো একটা চেতনা। নিজেকে, সমাজকে, রাষ্ট্রকে ভুল পথে চালানোর; ব্যর্থ করে দেয়ার চেতনা। বিভ্রান্ত তরুণ সমাজের কেউ কেউ এ পথে পা বাড়াচ্ছে। এই তরুণদের সঠিক পথে আনার দায়িত্ব কেবল আইন-শৃংখলা বাহিনীর না। একা রাষ্ট্রেরও না। জঙ্গিবাদ ছেড়ে এলে তাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটনে দরকার সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা, জনপ্রতিরোধ। এটাই এখন সময়ের দাবি।









