করোনা সচেতনতা: নৃত্যমুদ্রায় অরনী

অরনী নৃত্যশিল্পী একটি ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নৃত্য করছেন, পটভূমিতে কাপড়ের পর্দা।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ
পৃথিবী তখন দ্বিধাথরথর। ‘আর্ট ফর আর্ট’স সেক’ নাকি ‘আর্ট ফর হিউম্যানিটি’? সেই উনিশ শতকে শুরু হওয়া বিতর্ক। আজও তা চলছে। কিন্তু, সে বিতর্কে আজ ভাটার টান। পৃথিবী আজ এক ‘মারণাস্ত্রে’ জর্জরিত। করোনা তার নাম। অদৃশ্য এই ভাইরাস আমাদের এমন খাদের কিনারে নিয়ে গেছে, যেখানে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ অপাক্তেয়। সেই শিল্পেরই আজ জয়গান, যা সমস্ত মানবিক সুকমারবোধজাত, যা আধারের গভীর থেকে উৎসারিত হয়ে দৃপ্তি ছড়িয়ে বলছে, ‘আমরা করব জয় একদিন’!
সেই বিজয়েরই এক অভিনব বার্তা ছড়িয়ে দিলেন নৃত্যশিল্পী অরনী ভক্ত। ভারতের গুজরাট প্রদেশের বিখ্যাত বরোদা মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের (এমএসইউ) নৃত্য বিভাগের ভরতনাট্যমের সম্মান শেষ পর্বের শিক্ষার্থী অরনী তার ধ্রুপদী নৃত্যের বিভিন্ন মুদ্রার মাধ্যমে করোনার বিরুদ্ধে চলমান সকল মানবিক লড়াইয়ের দিক নির্দেশনা সূচিত করেছেন। নৃত্যভাষায় তিনি উপস্থাপন করেছেন করোনা-প্রতিরোধের বিভিন্ন ব্যবহারিক দিককে।
বলা হয়ে থাকে, সংকটে প্রাণী আরও সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠে। পৃথিবীব্যাপী লকডাউনের মধ্যে ঘরে বসেই বহু মানুষ তাদের সেই সৃষ্টিশীলতার নিদর্শন রেখে চলেছে। সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলছে কারও লেখা, কারও গান, কারও নাচ কারওবা চিত্রাঙ্কন বা অন্যান্যশিল্পকর্ম। কিন্তু, অরনীর নৃত্যমুদ্রাটিকে অভিনবই বলতে হবে!
অনেকেই নাচছেন, সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে। কিন্তু, অরনীর অনন্যতা হলো, তিনি ভিডিওর মাধ্যমে নাচ পরিবেশন না করে বরং স্থিরচিত্রে নির্দেশিত নৃত্যভঙ্গির মাধ্যমে চলমান বিভিন্ন ক্রিয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বলাবাহুল্য, কাজটি দুর্লভ এবং অপেক্ষাকৃত জটিলও বটে। কিন্তু, ওই যে ঘোর সংকটকালে সৃষ্টিশীল মানুষের উত্থানপর্বের জয়ধ্বনি, অরনী যেন সেটারই বাস্তব প্রয়োগ ঘটালেন!
করোনা-কালে উত্থিত বিভিন্ন টার্মের ব্যবহারিক প্রয়োগ ও অপরিহার্য কাজের ভঙ্গি ভরতনাট্যমের ধ্রুপদী নৃত্যমুদ্রায় কী রকমের হতে পারে, ২৬টি ছবির মাধ্যমে অরনী তা দেখিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া মানুষকে, তার ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। সেগুলো খুব ভূঁয়সী প্রশংসাও পেয়েছে। এই ২৬টি ছবিতে নৃত্যমুদ্রাগুলো যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, ইংরেজিতে সেগুলোর হুবুহু বঙ্গানুবাদ করে দেওয়া হলো পাঠকদের উদ্দেশ্যে:
প্রথম ভাগ:
১. আমাদের বিশ্ব ২. আমরা সবাই… ৩. সমস্যাক্রান্ত ৪. বিশ্ব মহামারীতে উদ্বিগ্ন ৫. এর নাম কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস ৬. যা মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে. ৭. আমরা ভেঙে পড়ছি ৮. সংঘবদ্ধভাবে ৯. আমরা লড়াই করতে পারি ১০. করোনার বিরুদ্ধে
দ্বিতীয় ভাগ:
১১. ঘরে থাকুন (দুটি স্থিরচিত্র) ১২. বিধিমতো হাত ধোন (ছয়টি স্থিরচিত্র) ১৩. পরিচ্ছন্ন থাকুন, নিরাপদ থাকুন
তৃতীয় ভাগ:
১৪. নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন ১৫. হৃদয়ের গভীর থেকে বিশ্বাস করুন ১৬. একদিন ১৭. কোন না কোন ১৮. বিস্ময়কর ঘটনা ঘটবেই ১৯. আমরা ২০. জয়ী হব
অর্থাৎ, পাঠসূত্রগুলো মেলালে এই নৃত্যশিল্পী বোঝাতে চেয়েছেন যে, ‘আমাদের এই বিশ্বে এখন আমরা সবাই কোভিড-১৯ বা করোনো ভাইরাসের কারণে সমস্যাক্রান্ত এবং আমরা ভেঙে পড়ছি। কিন্তু, সংঘবদ্ধভাবে আমরা করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি।’ (প্রথম ভাগের১০টি স্থিরচিত্র পর্যন্ত) কিন্তু লড়াইটা হবে কীভাবে? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন, ঠিক সেগুলোই অরনী প্রকাশ করেছেন এভাবে (দ্বিতীয় ভাগের দশম থেকে দ্বাদশ ছবি পর্যন্ত, মোট ৯টি নৃত্যভঙ্গিমা আছে এই তিন ছবিতে), ‘ঘরে থাকুন, বিধিমতো হাত ধোন, পরিচ্ছন্ন থাকুন, নিরাপদ থাকুন।’ আর বাকি ছবিগুলোতে (তৃতীয় তথা শেষভাগের ৭টি ছবিতে) রয়েছে আত্মবিশ্বাস ও বিজয়ের জয়গান, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং সেই বিশ্বাসটা করুন হৃদয়ের গভীর থেকে। কোন একদিন বিস্ময়কর সকাল আসবেই। আমরা করব জয় একদিন।’
এছাড়া, করোনাকালের লকডাউনে অরনী ভক্তর নৃত্যচর্চার সৃষ্টিশীল প্রকাশ শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নেই। মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় ও নৃত্য বিভাগের পরিবেশনায় করোনার বিরুদ্ধে জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি‘হাম হোঙ্গে কামিয়াব’ (আমরা করব জয়) গানটির নৃত্য-ভিডিওটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া ফেলেছে।
অরনীসহ মোট ২৯ জনের অংশগ্রহণে নির্মিত ও ড. দিব্যা পটেল নির্দেশিত এই আত্মবিশ্বাস জাগানিয়া গানটির বিভিন্ন চরণের সঙ্গে নিজ ঘরে নেচে, নিজেদের মতো ভিডিও করে পরে সেগুলো সংযুক্ত ও সম্পাদিত করে প্রচারিত হতেই নেটিজেনরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। ঠিক একইভাবে, আরেকটি ভিডিও বিশ্ববিদ্যালয়টির ভরতনাট্যম নৃত্য বিভাগের প্রধান ড. শ্রুতি ভাগেলার নির্দেশনায় নির্মিত হয়েছে। অরুনী জানিয়েছেন, সেটিতেও অংশগ্রহণ করেছেন তিনি।
২০১৭ সাল থেকে বরোদায় অবস্থানরত, ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয় আইসিসিআরের বৃত্তিধারী অরনী ভক্ত নৃত্যশিল্পী হিসেবে গুজরাটের বিভিন্ন মঞ্চে ইতোমধ্যেই সাড়া ফেলেছেন। এবার, এমন বৈশ্বিক মহাসংকটকালে অভিনব এই কাজটির মাধ্যমে অনন্য সৃষ্টিশীলতায় আবারও প্রতিভার প্রমাণ দিলেন এই উদীয়মান ধ্রুপদী ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী!






