অরুন্ধতী রায় যে বাংলাদেশে এসেছেন এবং তিনি যে একটা বক্তৃতা দেবেন—সেই খবরটি তার ব্যাপারে আগ্রহী, কিছু অ্যাকাডেমিশিয়ান এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বাইরে কারো জানা ছিল না। কিন্তু গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পী-সাহিত্যিক ও অধিকারকর্মীদের বিভিন্ন মঞ্চ ছাড়িয়ে অরুন্ধতী রায়ের আগমনের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি গ্রামের হাটবাজারের চায়ের দোকানেও অরুন্ধতী আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ান। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া।
অরুন্ধতী রায় নিঃসন্দেহে একজন খ্যাতিমান লেখক ও অধিকারকর্মী। বিশেষ করে ভারতের মতো একটি বিশাল দেশের শক্তিশালী সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বেশ আলোচিতও। কিন্তু প্রশ্ন হলো তার বাংলাদেশে আগমন এবং বক্তৃতা দেয়ার বিষয়টিকে সরকার কেন নিছকই অ্যাকাডেমিক ব্যাপার হিসেবে গণ্য করতে পারলো না? কেন তার পূর্ব নির্ধারিত স্থানে অনুষ্ঠান বাতিল করে পরিস্থিতি গরম করে দেয়া হলো? মূলত ‘পুলিশ অরুন্ধতী রায়কে কথা বলতে দিচ্ছে না’—এই সংবাদ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে এবং বস্তুত এরপরই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী জানতে পারে যে, অরুন্ধতী রায় নামে একজন লেখক ও অধিকারকর্মী বাংলাদেশে এসেছেন কিন্তু সরকার তাকে কথা বলতে দিচ্ছে না।
এই ঘটনার পর স্বভাবতই যারা এই প্রথম অরুন্ধতী রায়ের নাম শুনলেন, তারাও গুগলে অনুসন্ধান শুরু করেন। বিপুল সংখ্যক মানুষ অরুন্ধতীর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং তিনি কী এমন বলতেন বা বলতে পারেন, তারও আন্দাজ করতে থাকেন। অর্থাৎ এই ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অরুন্ধতীর ব্র্যান্ড ভ্যালু আরও বাড়িয়েছে। পক্ষান্তরের দেশে ও দেশের বাইরে এরকম একটি বার্তা চলে গেছে যে, বাংলাদেশে কথা বলা যায় না বা সে দেশের সরকার মানুষকে কথা বলতে দেয় না। অর্থাৎ অরুন্ধতীর পজিটিভ ব্র্যান্ডিংয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের নেগেটিভ ব্র্যান্ডিংটাও হয়ে গেলো। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই অতি উৎসাহী কাজটা কারা করলেন বা কাদের প্ররোচনা ও নির্দেশে করলেন?
অরুন্ধতী কী এমন বলতেন যাতে খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রও আতঙ্কিত বোধ করলো? ভারতের এই বুদ্ধিজীবী কি সম্প্রতি কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের সমালোচনা করতেন বা এমন কিছু বলতেন যাতে ভারত সরকার বাংলাদেশের ওপর এই মর্মে চাপ প্রয়োগ করতো যে, বাংলাদেশের মাটিতে গিয়ে তিনি কী করে এমন কথা বললেন বা বলতে পারলেন? অরুন্ধতীকে কথা বলতে দেয়া হবে না – এই সিদ্ধান্তটি রাষ্ট্রের কোন পর্যায় থেকে এসেছে? এই সিদ্ধান্ত কি আদৌ রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসেছে নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেরাই ডিফেন্সিভ খেলতে গিয়ে বলটা সমালোচকদের কোর্টে ঠেলে দিলো? অরুন্ধতী কী এমন বলতেন বা তিনি যা বলতেন, তাতে রাষ্ট্রে বিপ্লব হয়ে যেতো? তার কথা শুনে কি মানুষ সরকার পতনের আন্দোলনে রাস্তায় নেমে যেতো?
ধারণা করা যায়, অরুন্ধতীর ব্যাপারে এবার সরকারের মূল অস্বস্তির কারণ তার হোস্ট বা আমন্ত্রণকারীরা। গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান আন্দোলনে উসকানি দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার এবং বেশ কিছুদিন কারাবরণকারী প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের আমন্ত্রণে এসেছিলেন অরুন্ধতী রায়। ফলে তিনি বক্তৃতায় বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গে যে কথা বলবেন এবং সেখানে সঙ্গত কারণেই সেখানে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা থাকবে—এরকম একটি ধারণা হয়তো সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছিল। আবার বাকস্বাধীনতা নিয়ে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ সরকারের সমালোচনা করলেও অরুন্ধতী রায়ের মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষের সমালোচনার ধার অনেক বেশি বলেই হয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে বক্তৃতার অনুমতি দিয়েও আবার সেটি প্রত্যাহার করে। যদিও নানা নাটকীয়তার পরে মাইডাস সেন্টারে তার অনুষ্ঠান হয়।
দেখা যাক, সেখানে অরুন্ধতী কী বলেছেন? আলোকচিত্রী শহীদুল আলমের সাথে কথোপকথনে তিনি বলেন, নদীকে কেন্দ্র করে বাঁধ কিংবা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে তিনি বিশ্বাসী নন। তার মতে, নদীকে ভাগ করা যায় না। বড় বড় বাঁধ নির্মাণের পেছনে ফ্যাসিবাদ আর জাতীয়তাবাদী চেতনা লুকানো থাকে বলেও তিনি উল্লেখ করেন (প্রথম আলো, ৬ মার্চ ২০১৯)। অক্সফামের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে অরুন্ধতী বলেন, ভারতে ৫০ কোটি লোকের সম্পদ পুঞ্জীভূত ৯ জন লোকের কাছে। তাই উন্নয়নের কথা এলে লোকজন জানতে চায়, কার জন্য উন্নয়ন (বাংলা ট্রিবিউন, ৫ মার্চ ২০১৯)। অরুন্ধতী আরও বলেছেন, শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। তাছাড়া উপমহাদেশে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে যাওয়ার পেছনে তিনি অন্ধ ধর্মবিশ্বাস আর অর্থনীতির ভ্রান্ত ধারণাকেই দায়ী করেন (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৫ মার্চ ২০১৯)।
এখন প্রশ্ন হলো, অরুন্ধতী রায়ের মতো একজন লেখক ও অধিকারকর্মী এতটুকু কথা তো বলবেনই এবং এই কথাগুলো তো আমরা সাধারণ লেখক ও সাংবাদিকরাও নানা সময়ে বলি। উন্নয়নের নামে যে কিছু লোক ধনী হয়, উন্নয়নের নামে নদীকে হত্যা করা হয়, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পেছনে অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস দায়ী—এসব কথায় নতুন কী আছে? এই কথাগুলোর অ্যাকাডেমিক মূল্যও আছে। তাই যদি হয়, তাহলে অরুন্ধতীর বক্তৃতায় বাধা দিয়ে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার ভাবমূর্তি নষ্ট করলো? এটা কি আত্মঘাতী নয়?
ধরা যাক, অরুন্ধতী রায় আরও কড়া ভাষায় কথা বললেন। ধরা যাক তিনি সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিয়েই কথা বললেন, তাতেই বা কী এমন ঘটে যেতো? তিনি একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট কিছু লোকের সামনে একটা বক্তৃতা এবং কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয় চলে যেতেন, কোনো কোনো সংবাদপত্র তার বিস্তারিত ছাপতো, কেউ কেউ ভেতরের পাতায় দুই কলামে ছাপতো। এটা নিয়ে খুব বেশি মানুষ আগ্রহী হতো বলেও মনে হয় না। কিন্তু বাধা দেয়ার ফলে ছোট একটি ঘটনাও বিশাল হয়ে উঠলো এবং অরুন্ধতী রায়ের লাভ-ক্ষতি যাই হোক না কেন, ক্ষতিটা যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এবং আরও পরিস্কার করে বললে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিই নষ্ট হলো। অরুন্ধতীর এই অনুষ্ঠান বাতিলের প্রসঙ্গে ভারতের ‘এই সময়’ পত্রিকার শিরোনাম: ‘পদ্মাপারে তোলপাড়, অরুন্ধতী রায়ের অনুষ্ঠান বাতিলে অসহিষ্ণু বাংলাদেশের ছবি’ । প্রতিবেশী রাষ্ট্রের একটি সংবাদপত্র বাংলাদেশকে যে ‘অসহিষ্ণু’ বলার সাহস পেলো, সেই সুযোগটি আমরা তাদের কেন দিলাম?
আমাদের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাদের এটা উপলব্ধি করা দরকার যে, কাউকে কথা বলতে দিলে সে যা বলবে, বলতে না দিলে সে বলবে বা বলতে চাইবে তার চেয়ে অনেক বেশি। নদীকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিলে তার চেহারা একরকম, কিন্তু বাধা দিলে সে রুদ্ররূপ ধারণ করে। এই সহজ সূত্রটি আমাদের মনে রাখা দরকার।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







