ঈদকে কেন্দ্র করে শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে ১০ জুনের মধ্যে সব তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করার নির্দেশনা থাকলেও তা মানেননি বেশ কিছু মালিক। ফলে নির্ধারিত সময়ে বেতন না পেয়ে কিছু কিছু এলাকায় বিক্ষোভ এবং সড়ক অবরোধ শুরু করেছে শ্রমিকেরা।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, কথা দিয়েও কথা রাখেননি কিছু মালিক। ফলে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে শ্রমিকেরা। নির্ধারিত সময়ের পর তিন দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত বেতন পায়নি কিছু কারখানার শ্রমিক। এই অবস্থায় ১৪ জুন বোনাস দেয়া হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে তাদের মধ্যে।
অবশ্য বেতন না দেয়ার তালিকায় থাকা কারখানা সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে জানান তারা।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সংগঠন-বিজিএমইএ জানিয়েছে, সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। হাতে গোনা ক’টি কারখানায় সমস্যা থাকতে পারে। সেগুলো আজ-কালের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে।
বকেয়া বেতনের দাবিতে বুধবার নারায়ণগঞ্জের রিতীকা ফ্যাশন ওয়্যার লি, ঢাকার শান্তিনগরের বে টেক্সটাইল ও গোরানের কনফিড্যান্স টেক্সটাইলের কয়েক’শ শ্রমিক বিক্ষোভ করেছে। আগের দিন মঙ্গলবার গাজীপুরের শ্রীপুরে প্যারাডাইস গ্রুপের ‘প্যারাডাইস ইলেকট্রনিকস’ ও ওয়েস্টারিয়া টেক্সটাইল কারখানার প্রায় ৮ শতাধিক শ্রমিক ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে।
এরআগে রোববার বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামেন বোর্ডবাজারের ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শ্রমিকরা। এছাড়াও শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোর আরো বেশকিছু কারখানায় বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে গত ৫ দিনে। এর মধ্যে বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছন গাজীপুরের ইয়ায়মান টেক্সটাইল কারখানার প্রায় ২ হাজার শ্রমিক।

এ বিষয়ে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, কত শতাংশ কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেয়া হয়েছে তা এখনও আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। কারণ আজও কয়েকটি কারখানায় বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। এরমধ্যে নারায়নগঞ্জের রিতীকা ফ্যাশন ওয়্যার লি, ঢাকার শান্তিনগরের বে টেক্সটাইল ও গোরানের কনফিড্যান্স টেক্সটাইল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ড্রাগন সোয়েটার ৩ মাস ধরে বেতন দিচ্ছে শ্রমিকদের।
তিনি বলেন, বেতন হয়তো অনেকে দিয়েছে। কিন্তু বোনাস নিয়ে শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা হতে পারে। কারণ ১৪ জুন বোনাস দেয়ার কথা। ওই দিন এবং তার পরের দিন ১৫ জুন তো শ্রমিকেরা গ্রামে ফিরে যাবে। তাহলে লাখ লাখ শ্রমিকের বোনাস দেবে কিভাবে?
‘যেহেতু ১০ তারিখে বেতন পরিশোধ করার কথা থাকলেও ১৩ তারিখ পর্যন্ত সব কারখানায় বেতন দেয়নি। তাহলে এক দিনের মধ্যেই যে বোনাস দেয়া হবে বলে মনে হয় না। শেষ সময়ে হয়তো শ্রমিকদের সাথে ধোকাবাজি করা হতে পারে।’
ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স (ইউএফজিডব্লিউ) এর সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমার জানা মতে প্রায় ৯৫ শতাংশ কারখানায় বেতন দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বোনাস দেয়ার কথা রয়েছে। আশাকরি সময়মত কারখানা মালিকেরা এটাও দিয়ে দিবেন।
তবে দুই-চারটি কারখানায় সমস্যা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু পোশাক শিল্প অনেক বড় খাত সেই হিসাবে কিছু সমস্যা কারখানায় জটিলতা আছে। যেমন কোনা বাড়ির এটিএস অ্যাপারেলের প্রায় ৩৫০ শ্রমিকের বেতন দিতে পারেনি কারখানা মালিক। দুই-একমাস আগে থেকেই এই কারখানায় সমস্যা ছিল। তবে আগামীদিনের মধ্যে সব কারখানার শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।

বিজিএমইএ বলছে, ঘোষিত সময়ে ৯০ শতাংশের বেশি কারখানায় শ্রমিকদের বেতন দেয়া হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায় সমস্যা থাকতে পারে। অচিরেই তা সমাধান হয়ে যাবে। আর ১৪ জুনের মধ্যেই বোনাস পরিশোধ করা হবে।
জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাছির চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সরকার নির্ধারিত তারিখের মধ্যে কারখানার মালিকরা বেতন পরিশোধ করেছে। আগামীকাল বোনাস পরিশোধ করা হয়ে।
তিনি বলেন, হয়ত হাতে গোনা কটি কারখানার সমস্যা থাকতে পারে। আশাকরি তারাও বেতন পরিশোধ করে দিবে।
মে মাসের শুরুতে ঈদের আগে শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন।
এমন আশঙ্কার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব কারখানার তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরও আলাদা তালিকা পাঠিয়েছে তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন-বিজিএমইএ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে।
এরপর ঈদ সামনে রেখে যাতে শ্রমিকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় সেজন্য গত ৩১ মে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে শিল্পদ্যোক্তারা ১০ জুন বেতন ও ১৪ জুন বোনাস দেয়ার অঙ্গিকার করেছিলেন।
বাংলাদেশের শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে— আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা।
শিল্প পুলিশের হিসাবমতে, এসব অঞ্চলে শিল্প-কারখানা রয়েছে মোট ৭ হাজার ৭৮টি। এর মধ্যে পোশাক খাতের কারখানার সংখ্যা ৩ হাজার ২৮৮ ও অন্যান্য খাতের কারখানা ৩ হাজার ৭৯০।








